ঢাকায় ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কতটা?

অ্যানোফিলিস মশা। সংগৃহীত ছবি
ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান। ক্যামেরুন সফর থেকে ফিরে আসার পর জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে আফ্রিকার দেশটিতে। তার মৃত্যুর পর বেড়েছে উদ্বেগ। মশার ব্যাপক প্রজননের ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত রাজধানী ঢাকায় ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আছে কি-না, সেই প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব দেশে ম্যালেরিয়া রোগ এখনো আছে, তার মধ্যে ক্যামেরুন একটি এবং সেখানকার ভ্যারিয়েন্টও অত্যন্ত শক্তিশালী। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, ক্যামেরুন বা ম্যালেরিয়া আছে এমন কোনো দেশ থেকে আক্রান্ত হয়ে দেশে আসার পর কাউকে অ্যানোফিলিস জাতীয় মশা কামড় দিলে ওই জীবাণু ছড়াতে পারে কি-না। একই সাথে রাজধানী ঢাকায় অ্যানোফিলিস জাতীয় মশা আছে কি-না এবং থাকলে তা ম্যালেরিয়া জীবাণুবাহী কি-না। অর্থাৎ সবমিলিয়ে ঢাকায় ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আসলে কতটা আছে বা আদৌ আছে কি-না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক মো. হালিমুর রশীদ বলছেন, ‘ঢাকা থেকে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি মোটেও নেই। অন্য জায়গা থেকে আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় আসতে পারেন কেউ। কিন্তু ঢাকায় এ আশঙ্কা নেই।’
কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কবিরুল বাশার অবশ্য বলছেন, ঢাকায় অ্যানোফিলিস জাতীয় মশা আছে, কিন্তু সেই মশার ম্যালেরিয়া রোগ ছড়ানোর ক্ষমতা বা ম্যালেরিয়া জীবাণু হার কেমন তা নিয়ে গবেষণা দরকার।
ঢাকায় অ্যানোফিলিস মশা আছে?
২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ম্যালেরিয়া পুরোপুরিভাবে নির্মূলের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। যদিও সেটি অর্জন করা সম্ভব হবে কি-না এরই মধ্যে উঠেছে সেই প্রশ্নও। এর আগে ঢাকায় শতাধিক হটস্পট নির্ধারণ করে সেগুলোতে বিশেষ কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা হয়েছিল। যদিও সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে ধরা পড়ছে অ্যানোফিলিস জাতীয় মশার অস্তিত্ব।
মশাবাহিত রোগের মধ্যে অন্যতম হলো ম্যালেরিয়া এবং এই রোগের জীবাণু ছড়ায় স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বাংলাদেশের তিন পার্বত্য জেলা এবং সীমান্তবর্তী ১৩টি জেলা ম্যালেরিয়া-প্রবণ।
কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার জানিয়েছেন, ‘চলতি মাসেই জরিপে ঢাকার উত্তরা, মিরপুর ও গুলশানে তিনটি প্রজাতির অ্যানোফিলিস মশা পেয়েছেন তারা। তার ভাষ্য, ‘২০২৩-২৪ সাল থেকে জরিপগুলোতে ছয় প্রজাতির অ্যানোফিলিস মশার অস্তিত্ব পেয়ে আসছি আমরা। শুধু তাই নয়, ঢাকা ও বিভিন্ন শহরে অ্যানোফিলিস মশার ছয়টি প্রজাতির অস্তিত্ব মিলেছে, বেশি পাওয়া যাচ্ছে ঢাকায় উত্তরায়,’ বলছিলেন তিনি।
এর আগে গত বছর এপ্রিলে প্রথম ম্যালেরিয়াবাহী এই ধরনের মশার অস্তিত্ব পাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। দেশে ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব রোধে পদক্ষেপ নেওয়ার দুই দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সেবারই প্রথম এই ধরনের মশার তথ্য দেওয়া হয়েছিল। অধ্যাপক কবিরুল বাশার অবশ্য বলছেন, ‘অ্যানোফিলিস জাতীয় মশা শহরে থাকলেই যে মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হবে তা নয়। সেই মশার ম্যালেরিয়া প্যারাসাইট থাকতে হবে। সেটি আছে কি-না, অর্থাৎ সেই মশার ম্যালেরিয়া রোগ ছড়ানোর ক্ষমতা বা ম্যালেরিয়ায় জীবাণু হার কেমন তা পরীক্ষা করা দরকার।’
উদ্বেগের ভিত্তি কতটা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্য জায়গা থেকে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে কেউ এলে জীবাণুটি অ্যানোফিলিস জাতীয় মশার মাধ্যমে ছড়াতে পারে অন্যদের শরীরে। সংক্রমিত অ্যানোফিলিস জাতীয় স্ত্রী মশার কামড়ে শুরু হয় ম্যালেরিয়া। পরে ম্যালেরিয়ার জীবাণু লালার মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে এবং যকৃতে পৌঁছে। সেখানে তারা পরিপক্ব হয় এবং বংশ বৃদ্ধি করে। অ্যানোফিলিস মশা যখন অন্য কাউকে কামড়ায়, তখন তার রক্তে ম্যালেরিয়ার জীবাণু ছড়ায় এবং আক্রান্ত হয় সেও। মূলত সন্ধ্যা থেকে ভোরের মধ্যে কামড়ায় এ মশা।
তবে ঢাকায় এই ঝুঁকি কতটা আছে তা নিয়ে কোনো গবেষণা নেই। বরং ম্যালেরিয়া রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা আছে এমন অনেক শহরে ঢাকা থেকে লোকজনের যাতায়াত থাকায় ‘আরবান ম্যালেরিয়া’র আশঙ্কা আছে কারও কারও মধ্যে।
‘বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলসহ কিছু জায়গায় এখনো আছে ম্যালেরিয়া। আবার এশিয়া ও আফ্রিকার যেসব দেশে ম্যালেরিয়ায় এখনো অনেক মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, সেসব জায়গায় এদেশ থেকে মানুষের যাতায়াত আছে। সে কারণেই ঢাকার ঝুঁকি কতটা তা নিরূপণ করা দরকার,’ বলছিলেন কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক মো. হালিমুর রশীদ জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত ঢাকায় ম্যালেরিয়ার জীবাণুবাহী মশার অস্তিত্ব থাকার তথ্য পাওয়া যায়নি এবং সে কারণে ঢাকায় কারও ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই বলে মনে করছেন তারা।
অনেক মানুষ মারা যাওয়ার কারণে ১৯৯০ সালে ম্যালেরিয়াকে জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে ঘোষণা করে এটি নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগী হয়েছিল সরকার। জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিভিন্ন উদ্যোগের কারণে ২০০৮ সাল থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্তের হার কমেছে ৮৫ শতাংশ।
তবে বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া নির্মূলে জাতীয় কৌশলগত পরিকল্পনা ২০২১-২৫ তে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশে এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে ম্যালেরিয়া। ২০২০ সালের বিশ্ব ম্যালেরিয়া রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া এখনো স্থানীয়ভাবে বিদ্যমান।’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলছেন, ম্যালেরিয়া উপদ্রুত এলাকায় না গেলে এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে না এবং সে কারণেই ঢাকায় ম্যালেরিয়া সংক্রমণ নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই।’
ম্যালেরিয়ার লক্ষণ কী?
চিকিৎসকদের মতে, এই রোগের প্রধান লক্ষণ কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসা। জ্বর হতে পারে ১০৫-১০৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত। তবে অনেক সময় জ্বর আসা-যাওয়া করে নিয়মিত ও নির্দিষ্ট বিরতিতে, যেমন, একদিন পর পর জ্বর এসে তা দীর্ঘ হতে পারে তিন-চার ঘণ্টা পর্যন্ত। এরপর ঘাম দিয়ে কমে যায় জ্বর।
এছাড়া অন্যান্য লক্ষণের মধ্যে রয়েছে : মাঝারি থেকে তীব্র কাঁপুনি বা শীত শীত, মাথা ধরা, অনিদ্রা, ক্ষুধামন্দা, কোষ্ঠকাঠিন্য, বমি বমি ভাব ও বমি, হজমে সমস্যা, অত্যধিক ঘাম হওয়া, খিচুনি, পিপাসা কম লাগা, ক্লান্তি বা অবসাদ অনুভব, মাংসপেশি বা তলপেটে ব্যথা ও রক্তশূন্যতা।



