যেখানে থেমে থাকার কথা ছিল, সেখানেই পথ তৈরি করেছেন নারীরা

ভোরের আলো ঠিকমতো ছড়ানোর আগেই বিমানবন্দরের রানওয়েতে প্রস্তুত একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ। ককপিটে বসে শান্ত কণ্ঠে নির্দেশ দিচ্ছিলেন পাইলট। কয়েক মিনিট পর বিমানটি আকাশে উঠবে। যাত্রীরা ভাবতেও পারেননি, সেই পাইলট একজন নারী। অথচ মাত্র কয়েক দশক আগেও এই দৃশ্য ছিল অকল্পনীয়। বিমানের যান্ত্রিক ককপিট নয়, নারীদের স্বাভাবিক স্থান বলে বিবেচিত হতো রান্নাঘর কিংবা সন্তান পালনের ঘর। যেখানে পুরুষেরা সিদ্ধান্ত নিতেন, নির্দেশ দিতেন, আর নারীরা শুধু গ্রহণ করতেন। কিন্তু সময়ের স্রোতে সেই সীমারেখা ধীরে ধীরে মুছে দিয়েছে নারীরা। শিক্ষা, দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাসের শক্তিতে নারীরা আজ বিমানের ককপিট থেকে শুরু করে সমুদ্রের জাহাজ, পুলিশের খাকি পোশাক থেকে ফায়ার সার্ভিসসহ প্রতিটি জায়গায় তাদের দক্ষতার ছাপ রেখে চলেছেন। তাদের এই পথচলা শুধু একটি পেশায় প্রবেশের গল্প নয়, এটি সামাজিক রীতির দেয়াল ভাঙার এক অবিরাম সংগ্রামের কাহিনী।
আকাশে নারীর আত্মবিশ্বাসী উড়ান
বিমান চালনার ইতিহাসে প্রথম দিকে নারী পাইলটদের সংখ্যা ছিল নগণ্য। ১৯৭০ সালেও বিশ্বের অধিকাংশ এয়ারলাইন্স নারী পাইলট নিয়োগ দিত না। কারণ তাদের কাছে নারীরা ‘শারীরিক ও মানসিকভাবে’ এ কাজের অনুপযুক্ত ছিল। বাংলাদেশের আকাশেও সেই বৈষম্যের ছাপ ছিল। কিন্তু ১৯৮০-এর দশক থেকে ধীরে ধীরে ছবি বদলাতে থাকে। বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স থেকে শুরু করে বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলোতেও নারী পাইলট রয়েছেন। শুধু পাইলট নয়, বিমানের ইঞ্জিনিয়ার, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার—সব জায়গাতেই নারীদের পদচারণা।
এই ক্ষেত্রে পথিকৃৎ হিসেবে উল্লেখ করা হয় ক্যাপ্টেন কাসৈয়দা কানিজ ফাতেমা রোকসানার নাম। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী বাণিজ্যিক পাইলট হিসেবে পরিচিত। তার সাফল্য পরবর্তী প্রজন্মের অনেক তরুণীকে বিমান চালনার পেশায় আগ্রহী করে তুলেছে।
বিমান সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে নারী পাইলটের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। যদিও সংখ্যাটি এখনও খুব বেশি নয়, তবুও নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই পেশার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নারীর দৃশ্যমান উপস্থিতি
বাংলাদেশ পুলিশে নারীদের অংশগ্রহণও গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে নারী পুলিশ সদস্যরা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, অপরাধ তদন্ত, ভিআইপি নিরাপত্তা, এমনকি আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনেও দায়িত্ব পালন করছেন।
বাংলাদেশে নারী পুলিশের ইতিহাস শুরু হয় ১৯৭৪ সালে। সেই সময় মাত্র কয়েকজন নারী সদস্য এই বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। তবে বিসিএসের মাধ্যমে প্রথম নারী পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে ১৯৮৬ সালে যোগ দেন ফাতেমা বেগম। তিনি বাংলাদেশ পুলিশের প্রথম নারী ডিআইজি (অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক) ছিলেন। এর আগে ১৯৭৬ সালে প্রথম নারী কনস্টেবল ও সাব-ইন্সপেক্টর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে নিয়োগ পান।
বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশে নারী সদস্যের সংখ্যা কয়েক হাজারে পৌঁছেছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনেও বাংলাদেশের নারী পুলিশ সদস্যরা প্রশংসিত ভূমিকা রাখছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে।
পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, নারী সদস্যদের উপস্থিতি বিশেষ করে নারী ও শিশু সংক্রান্ত অপরাধ তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অনেক ভুক্তভোগী নারী পুলিশ সদস্যদের কাছে নিজেদের সমস্যার কথা তুলনামূলকভাবে সহজে প্রকাশ করতে পারেন।
ফায়ার সার্ভিসে নারী
ফায়ার সার্ভিসের কাজ মানেই বিপদসংকুল পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া। অগ্নিকাণ্ড, ভবন ধস, সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ—সব ক্ষেত্রেই দ্রুত সিদ্ধান্ত ও সাহসিকতার প্রয়োজন হয়।
এই চ্যালেঞ্জিং পেশায়ও এখন নারীরা যুক্ত হচ্ছেন। ২০২৩ সালে প্রথম নারী ফায়ার ফাইটার নিয়োগ দেওয়া হয়। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সে নারী সদস্যদের অন্তর্ভুক্তি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন একটি দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারী ফায়ার ফাইটাররা উদ্ধার অভিযান, জরুরি সেবা এবং দুর্ঘটনা মোকাবিলায় সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। যদিও এই পেশায় নারীর সংখ্যা এখনও সীমিত, তবুও তাদের উপস্থিতি ভবিষ্যতে আরও বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে নারী জাহাজচালক
সমুদ্রপথে জাহাজ পরিচালনা বা মেরিন পেশা দীর্ঘদিন ধরেই পুরুষদের দখলে ছিল। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা, কঠোর শারীরিক পরিশ্রম এবং দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে দূরে থাকার কারণে অনেকেই মনে করতেন নারীরা এই পেশায় আগ্রহী হবেন না। কিন্তু আজ সেই ধারণা পাল্টে গেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও নারী নাবিক তৈরি হচ্ছে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি থেকে প্রথমবারের মতো ছয়জন নারী প্রশিক্ষণ শেষ করে বের হন। তারা এখন বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজে কাজ করছেন।
ক্যাডেট থেকে শুরু করে ডেক অফিসার—নানা পদে তারা সমুদ্রযাত্রা করছেন। এটি শুধু একটি পেশায় প্রবেশ নয়, বরং নতুন প্রজন্মের নারীদের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন। যারা সমুদ্রের বিশালতাকে ভয় না পেয়ে তাকে জয় করে নিতে চান।
পাহাড়ি অভিযানে নারী গাইড
বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চল এবং পাহাড়ি পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে একসময় গাইড হিসেবে প্রায় সবাই ছিলেন পুরুষ। দুর্গম পাহাড়ি পথ, দীর্ঘ ট্রেকিং এবং কঠিন আবহাওয়া এই পেশাকে অনেকটাই চ্যালেঞ্জিং করে তোলে।
কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় নারী গাইডদের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। তারা পর্যটকদের নিরাপদে পাহাড়ি পথে নিয়ে যাচ্ছেন এবং স্থানীয় সংস্কৃতি ও প্রকৃতি সম্পর্কে তথ্য দিচ্ছেন।
পর্যটন খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নারী গাইডদের অংশগ্রহণ পর্যটন শিল্পে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। অনেক নারী পর্যটকও নারী গাইডদের সঙ্গে ভ্রমণে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
পথ চলা অব্যাহত
পাইলট, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, জাহাজচালক, পাহাড়ি গাইড—প্রতিটি পেশায় নারীরা যে সফলতার সঙ্গে কাজ করছেন, তা প্রমাণ করে দক্ষতা ও যোগ্যতার সঙ্গে লিঙ্গের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে এখনও অনেক পথ বাকি। অনেক জায়গায় বৈষম্য রয়ে গেছে, পুরুষ সহকর্মীদের মনোভাব বা সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে নারীদের নিজেদের দ্বিগুণ প্রমাণ করতে হয়। তবুও তাদের এই পথচলা নতুন প্রজন্মের জন্য পথ দেখাচ্ছে।
এটি কেবল পেশাগত পরিবর্তন নয়; এটি সামাজিক মানসিকতারও পরিবর্তনের প্রতীক। সুযোগ ও সমান অধিকার পেলে নারীরা যে কোনো ক্ষেত্রেই সফল হতে পারেন।

