৬০ শতাংশ লেভেলক্রসিং অরক্ষিত, দুর্ঘটনায় বড় কর্তাদের কেন ‘দায়’ নেই

এবারের ঈদযাত্রাই যে কারও জন্য শেষ যাত্রা হয়ে উঠবে—কেউ তা ভাবেনি। প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা হওয়ার অপেক্ষা, ভোর হলেই ঘরে ফেরার স্বপ্ন—সবই ছিল এক রাত দূরে। কিন্তু সেই রাত আর ভোরে পৌঁছায়নি; গভীর অন্ধকারই হয়ে উঠেছে চূড়ান্ত পরিণতি।
গত শনিবার দিবাগত গভীর রাতে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী ‘ঢাকা মেইল’ এবং চুয়াডাঙ্গা থেকে লক্ষ্মীপুরগামী মামুন স্পেশাল পরিবহনের একটি বাসের পথ মিলে যায় কুমিল্লার পদুয়ার বাজার লেভেলক্রসিংয়ে। রেললাইন পার হওয়ার সময় সজোরে বাসটিকে ধাক্কা দেয় ট্রেনটি, টেনে নিয়ে যায় প্রায় এক মাইল দূর পর্যন্ত। ততক্ষণে দুমড়ে-মুচড়ে যায় বাসটি। কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে নিভে যায় অন্তত ১২টি প্রাণ—যাদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে। ঈদের আনন্দযাত্রা এভাবেই রূপ নেয় এক নির্মম মৃত্যুযাত্রায়।
রেলের লেভেলক্রয়িংয়ে এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনা নতুন নয়। ২০২৩ সালের ২৩ অক্টোবর কিশোরগঞ্জের ভৈরব রেলস্টেশনের আউটার পয়েন্টে ঢাকাগামী এগারসিন্দুর এক্সপ্রেসের সঙ্গে একটি মালবাহী ট্রেনের সংঘর্ষে ১৯ জনের মৃত্যু হয়। আহত হন অন্তত ৫০ জন। একই বছর ১৬ এপ্রিল কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে সোনার বাংলা এক্সপ্রেস পেছন থেকে পণ্যবাহী একটি ট্রেনকে ধাক্কায় আহত হন অন্তত ৫০ জন। যদিও এই দুর্ঘটনায় হয়নি কারো মৃত্যু ।
আগের বছর অর্থাৎ ২০২২ সালের ২৯ জুলাই চট্টগ্রামের মিরসরাই বড়তাকিয়া রেলস্টেশনের কাছে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী মহানগর প্রভাতী ট্রেন পর্যটকবাহী একটি মাইক্রোবাসকে ধাক্কা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই ১১ জন মারা যান। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও দুই জনের মৃত্যু হয়। ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় মন্দবাগ স্টেশনে সংঘর্ষ হয় চট্টগ্রামগামী উদয়ন এক্সপ্রেস ও ঢাকাগামী তূর্ণা নিশিতার। এতে ১৬ যাত্রী প্রাণ হারান।
এই সবগুলোই ছিল আলোচিত দুর্ঘটনা। গত বছরে রেল মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, গত ১০ বছরে লেভেলক্রসিংয়ে মারা গেছে ২৬৩ জন। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাব মতে, ২০১৯ সাল থেকে ২৪ সাল পর্যন্ত রেল দুর্ঘটনায় এক হাজার ২৬৯ জন। রেলওয়ে পুলিশের তথ্যমতে, গত ১০ বছরে রেল দুর্ঘটনায় মারা গেছে ৯ হাজার ২৩৭ জন। কিন্তু দুর্ঘটনা কমাতে স্থায়ী কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, কোনো দুর্ঘটনা আলোচিত হলেই প্রাথমিকভাবে দায় সারা একটি তদন্ত কমিটি করা হয়। সেই কমিটি কী তদন্ত করে— ফল কী হয়, তদন্তের ভিত্তিতে কোন কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়-সেগুলো কিছুই বাস্তবে দৃশ্যমান হয় না। প্রথাগতভাবে শুরুতেই লেভেলক্রসিংয়ের দায়িত্বে থাকা গেটম্যানকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয় এবং পরবর্তীতে তাতেই শাস্তি দেওয়া হয়। কিন্তু নিম্নপদের কর্মীদের দায় ছাড়া রেলওয়ে কখনও বড় পদের কোনো কর্মকর্তার দায় খুঁজে পায় না। এমনকি তদন্ত পরবর্তী উচ্চপদের কোনো কর্মকর্তা শাস্তি পেয়েছে এমন নজিরও দেখা যায়নি।
এবারও এর ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে না, দুর্ঘটনার পরপর রেলওয়ে থেকে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই লেভেলক্রসিংয়ে দ্বায়িত্বে থাকা দুই গেটম্যানকে সঙ্গে সঙ্গে তাদের অনুপস্থিতিতেই বহিষ্কার করা হয়েছে। পরবর্তীতে তাদের নামে দায়ের করা হয়েছে মামলাও।
রেলওয়ের ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কুমিলার বিভিন্ন পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে প্রতিবেদকের কথা হয়েছে। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুর্ঘটনার আগে ঢাকা মেইল নামের ট্রেনটি ক্রসিংয়ে আসার খবরটি গেটম্যানের কাছে পৌঁছানো যায়নি। পূর্ববর্তী অর্থাৎ লালমাই স্টেশন থেকে ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার খবরটি জানাতে পাদুয়া বাজার গেটম্যানকে ফোন দেওয়া হয়। কিন্তু গেটম্যানকে ফোনে পাওয়া যায়নি। তবে ট্রেন আসার খবর তারা পেয়েছিলেন কিনা সেটি তদন্তে বেরিয়ে আসবে।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামছুল হক বলছেন, বর্তমান সরকারের সময় এটাই বড় রেল দুর্ঘটনা। এখন দেখার বিষয় তদন্তে কোনো পরিবর্তন আসে কিনা। শুধু মাত্র নিম্নপদের কর্মীদের শাস্তি দিয়ে দুর্ঘটনা বন্ধ করা যাবে না। যারা কয়েক মাস বেতন পায় না, শাস্তি তাদেরই পেতে হয়। বড় কর্মকর্তাদের যেন কোনো দায়ই থাকে না। পৃথিবীর উন্নত কোনো দেশে এমন দুর্ঘটনা হলে কয়েকজন দায়িত্বশীল বড় পদের কর্মকর্তা এতক্ষণ পদত্যাগ করত।
এদিকে গেট অনুযায়ী গেটম্যানের সংকট রয়েছে। আবার বৈধ গেটে বা যেগুলো রেলওয়ের নিজেদের স্থাপিত গেইট শুধু সেগুলোতেই রেল থেকে গেটম্যান দেওয়া হয়। আর যেসব গেটের জন্য রেলওয়ে অনুমতি দিয়েছে কিন্তু নিজেরা প্রয়োজনে স্থাপন করেনি সেগুলোর গেটম্যান দেওয়ার দায়িত্ব রেলওয়ে নেয় না। কিন্তু যেগুলো পুরোপুরি অবৈধ বা যেসব গেটের খোঁজ আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত নেই-সেসব লেভেলক্রসিংয়ে গেটম্যানের খোঁজ অজানা।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সূত্রের তথ্য বলছে, সারা দেশে তিন হাজার কিলোমিটার রেলপথে নথিভুক্ত ক্রসিং আছে তিন হাজার ৩৯৮টি। এর মধ্যে এক হাজার ৩৬১টি ক্রসিংয়ের অবৈধ। বাকিগুলো বৈধ। তবে বৈধ-অবৈধ ক্রসিংয়ের মধ্যে অরক্ষিত দুই হাজার ৫৪টি। অবৈধ ক্রসিংয়ের বেশির ভাগই স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি) ও ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) রাস্তা। আবার বৈধ গেটগুলোতে ছয় হাজার গেটম্যান প্রয়োজন, বর্তমানে আছে দেড় হাজারের মতো।
এক প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন জানালেন, তদন্ত চলছে এখনই কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না। তবে কোনো দুর্ঘটনাই কাম্য নয়। দায় যারই থাকুক অনেকগুলো মানুষের প্রাণ গেছে। এটা কষ্টের। আর অনুমতি ছাড়া কেউ যেন গেট তৈরি না করে সেটা আমরা সব সময় বলে আসছি। যারা নিজ দায়িত্বে গেট তৈরির অনুমতি নিয়েছে সেটা রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তার দায়িত্বও তাদের।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) তথ্য বলছে, দেশের মোট অবৈধ লেভেলক্রসিংয়ের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ ও এলজিইডির রাস্তা রয়েছে ৪২৭টি, সড়ক ও জনপথ বিভাগের ২৪টি।

