সংকট এড়াতে ভারত থেকে জ্বালানি আমদানিতে জোর
- মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের বাড়তি সতর্কতা
- ৩ লাখ মেট্রিক টন আমদানি নিশ্চিত করতে চায় বাংলাদেশ
- উত্তরাঞ্চলের চাহিদা মেটাতে নৌ-পথ এড়িয়ে সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে পাইপলাইনে

এআই নির্মিত ছবি
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজারে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সম্ভাব্য সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে ৩ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানির আমদানির ওপর জোর দিচ্ছে সরকার।
যদিও উল্লিখিত জ্বালানি তেলের পরিমাণ চুক্তির চেয়ে ৭৫ হাজার মেট্রিক টন বেশি। জ্বালানি তেল আমদানির বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি ঢাকাস্থ ভারতীয় হাই কমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মার সঙ্গে আলোচনা করেছেন বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। ওই আলোচনায় ভারতের হাই কমিশনারও ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন এ তথ্য জানা গেছে সংশ্লিষ্ট সূত্রে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, বাংলাদেশে তেল সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়ে ভারত সরকারকে অনানুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ করা হয়েছে। বিকল্প উৎস হিসেবে আফ্রিকা ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল আমদানির বিষয়েও কাজ চলছে। মার্চে কোনো সরবরাহ সংকট নেই। এপ্রিল ও মে মাসের পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার।
সূত্র মতে, সম্প্রতি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত করেন ভারতের হাইকমিশনার। ওই আলোচনায় জ্বালানি তেলের বিষয়টি কয়েকটি প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে। সেখানে বিদ্যমান চুক্তির আওতায় নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেড (এনআরএল) ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতি মাসে চারটি পার্সেল (প্রতিটি ৫ হাজার মেট্রিক টন) করে মোট প্রায় ২০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল সরবরাহের অনুরোধ জানানো হয়।
ওই বৈঠকের পর বেশ কিছু অগ্রগতিও হয়েছে। উল্লিখিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ভারতের আসামের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে সরাসরি দিনাজপুরের পার্বতীপুরের রেলহেড ডিপোতে পৌঁছেছে ৫ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল। গত ১০ মার্চ সোমবার বিকাল থেকে পাইপলাইনে তেল সরবরাহ শুরু হয়ে বুধবার তা সম্পন্ন হয়। পার্বতীপুর রেলহেড ডিপোর তত্ত্বাবধায়ক মো. আহসান হাবিব চৌধুরী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে জানুয়ারিতে একটি পার্সেলে আরও ৫ হাজার মেট্রিক টন সরবরাহ করেছে ভারত।
জানা গেছে, জ্বালানি তেল আমদানির লক্ষ্যে ২০১৭ সালের ২২ অক্টোবর বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) সঙ্গে ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেড (এনআরএল) ১৫ বছর মেয়াদী চুক্তি হয়। এ চুক্তির আওতায় ২০২৬ সালে ১ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল সরবরাহের কথা। এরমধ্যে ফার্মের পরিমাণ ১ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন এবং চাহিদার ভিত্তিতে অতিরিক্ত ৬০ হাজার মেট্রিক টন আমদানির সুযোগ রয়েছে। তবে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এই ছয় মাসে ৯০ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেলে আসার কথা। এ চুক্তির আওতায় প্রতি ব্যারেলের মূল্য নির্ধারিত প্রিমিয়াম ৫ দশমিক ৫০ মার্কিন ডলার নেবে ভারত।
সূত্র আরও জানায়, বিদ্যমান চুক্তির আওতায় ১ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টনের মধ্যে পাইপলাইনের মাধ্যমে যে অতিরিক্ত ৬০ হাজার মেট্রিক টন অপশনাল রয়েছে সে পরিমাণ তেল সরবরাহের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে ভারতকে।
এদিকে উত্তরবঙ্গ অঞ্চলের জ্বালানি চাহিদা দ্রুত ও কার্যকরভাবে পূরণ করতে ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে সরাসরি পার্বতীপুর ডিপোতে জ্বালানি তেল আনার ওপর জোর দিয়েছে বাংলাদেশ। কারণ, চট্টগ্রাম হতে পার্বতীপুর ডিপোতে জ্বালানি তেল পরিবহনের তুলনায় পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ ব্যবস্থা সময় ও ব্যয় উভয় দিক থেকেই অধিক সাশ্রয়ী। ফলে বিদ্যমান সংকটময় পরিস্থিতিতে এ ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এতে বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হবে।
জানা গেছে, বিদ্যমান চুক্তির আওতায় ২০২৫ সালে ১ লাখ ২৪ হাজার ২১৬ মেট্রিক টন, ২০২৪ সালে ২৮ হাজার ২০৪ মেট্রিক টন এবং ২০২৩ সালে জ্বালানি তেল আমদানি করা হয় ৩৫ হাজার ৭১৮ মেট্রিক টন।
এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত বিদ্যুত ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, এই সঙ্কট মোকাবিলায় প্রতি মাসে ২০ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেল আমদানি ও সরবরাহের সূচি বজায় রেখে নিয়মিতভাবে পার্সেল গ্রহণের বিষয়ে সমন্বয় জোরদার করা হয়েছে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান এনআরএলের সঙ্গে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, ২০২০ সালে বিপিসির সঙ্গে ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়া ওয়েল কর্পোরেশন লিমিটেড (আইওসিএল) বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন হয়। প্রতিষ্ঠানটি ওই বছর থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহ শুরু করলেও ২০২২ সালে সরকার টু সরকার (জি-টু-জি) সরবরাহকারী হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এই সময়ে জি টু জি ভিত্তিতে ১ লাখ ৫ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি সরবরাহের কথা থাকলেও সম্প্রতি ভারতে কাছে ১ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন সরবরাহের অনুরোধ করা হয়েছে। প্রতিটি ৩০ হাজার মেট্রিক টন হিসেবে ৪টি ডিজেল পার্সেল সরবরাহের কথা বলা হয়।
অবশ্য আইওসিএল সমুদ্রপথে জাহাজের মাধ্যমে জ্বালানি তেল সরবরাহ করে থাকে বাংলাদেশে। এ প্রতিষ্ঠানটি ২০২৫ সালে ডিজেল ১ লাখ ২২ হাজার ৫৩২ মেট্রিক টন ও জেট ফুয়েল সরবরাহ করেছে ১০ হাজার ৪০৫ টন। ২০২৪ সালে ডিজেট, জেট ফুয়েল, ফার্নেস ওয়েল ও অকটেন মিলে ৩ লাখ ৫১ হাজার ১১৭ মেট্রিক টন এবং ২০২৩ সালে জ্বালানি সরবরাহের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৮৪ হাজার ১১৮ টন।

