এপ্রিলের কম গরম চরম আবহাওয়ার ইঙ্গিত
- চলতি এপ্রিলে স্বাভাবিকের চেয়ে গরম কম
- বৃষ্টিপাত হয়েছে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি
- ১০ বছর পর পর প্রকৃতিতে আসে এমন পরিবর্তন
- ২০২৪ সালের এপ্রিল মাস জুড়ে ছিল তাপপ্রবাহ

গ্রাফিক্স: আগামীর সময়
এপ্রিলকে বলা হয় বছরের উষ্ণতম মাস। মাসটির গড় তাপমাত্রা বছরের অন্য যেকোনো মাসের চেয়ে বেশি। তবে গেল বছরের এপ্রিল ছিল না তার সেই স্বাভাবিক চরিত্রে। চলতি বছরেও দেখা যাচ্ছে একই চিত্র। দেশের কোথাও নামছে আষাঢ়ের বৃষ্টি, কোথাও শরতের মতো ঝকঝকে আকাশ। কোথাও আবার কাঠফাটা রোদ। অথচ ২০২৪ সালের পুরো এপ্রিল মাস জুড়েই ছিল তাপপ্রবাহ। মানুষ চাতক পাখির মতো অপেক্ষায় ছিল এক ফোঁটা বৃষ্টির জন্য। সেই রুক্ষ আবহাওয়ার পর মাত্র দুই বছরেই এপ্রিলে ভিন্ন চিত্র কেন?
আবহাওয়াবিদদের যুক্তি, আবহাওয়ার প্যাটার্ন পরিবর্তনের কারণেই এমন পরিস্থিতি। আলোচ্য সময়ে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টিপাত হওয়ায় অন্য বছরগুলোর তুলনায় অনুভূত হয়েছে কম গরম। আবহাওয়ার ধরন বদলের এ প্রবণতা চরম আবহাওয়ার ইঙ্গিত বলেও হুঁশিয়ারি তাদের। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এপ্রিলের শুরুতেই দেখা গেছে তীব্র তাপপ্রবাহ; কিন্তু এবার মাসটির প্রথমভাগেই হয়েছে কয়েক দফা বৃষ্টি। এ কারণে চলতি এপ্রিলে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টিপাত হওয়ায় অনুভূত হয়েছে কম গরম।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, বজ্রসহ বৃষ্টির কারণে তাপমাত্রা সাময়িকভাবে কমে যায় ২ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এবার এপ্রিলে হয়েছে সেটাই। আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক জানালেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক বজ্রসহ বৃষ্টির ফলে কমেছে তাপমাত্রা। আবুল কালাম মল্লিকের ব্যাখ্যা, মেঘের কারণে সূর্যের তাপ কম পৌঁছানো এবং বৃষ্টির পানির প্রভাবে হ্রাস পাচ্ছে তাপমাত্রা। এতে রাতের আবহাওয়া কিছুটা স্বস্তিদায়ক হয়েছে এবং অনেক জায়গায় তাপমাত্রা নেমেছে ২১ থেকে ২৬ ডিগ্রির মধ্যে।
অবশ্য, এপ্রিল ও মে মাসে এমন আবহাওয়া পরিবর্তন স্বাভাবিক বলেও জানালেন তিনি। তার ভাষ্য, এই সময় কখনো তীব্র গরম, আবার হঠাৎ বৃষ্টি— এটাই মৌসুমের বৈশিষ্ট্য। বৃষ্টির পর তাপমাত্রা কমলেও তা ধীরে ধীরে আবার বাড়তে শুরু করে।
এবার এপ্রিলে আবহাওয়ার যে চিত্র সেটা অস্বাভাবিক নয় উল্লেখ করে আরেক আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ জানালেন, ১০ বছর পর পর প্রকৃতিতে এমন পরিবর্তন আসে, সেটা আবহাওয়ার প্যাটার্ন। বজলুর রশিদের দাবি, সম্প্রতি বছরগুলোর মধ্যে ২০২৪ সালের এপ্রিল ছিল উষ্ণতম। এটা শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের সবচেয়ে উষ্ণ বছরগুলোর একটি ছিল ওই বছরের এপ্রিল। দক্ষিণ এশিয়া থেকে শুরু করে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো দেখেছিল আবহাওয়ার চরম রূপ। ওই সময় প্রায় টানা ৩০ থেকে ৩৫ দিনের মতো দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ ছিল বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে।
বজলুর রশিদের ভাষ্য, এটা শুধু গ্লোবাল ফ্যাক্টর নয়, কাজ করেছে লোকাল ফেনোমেনাও। নভেম্বরের পর থেকে মার্চের শুরু পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হয়নি, ফলে তৈরি হয়েছে ড্রাই কন্ডিশন। বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি জানালেন, এখন যে বৃষ্টি হচ্ছে, এটা হয়তো থাকবে আরও দু-এক দিন। এরপর আবার আবহাওয়া শুষ্ক হবে, বাড়বে তাপমাত্রা।
জুনের শুরুতে মৌসুমি বায়ু ঢোকার আগে আবার তাপমাত্রা বাড়তে পারে জানিয়ে এই বিশেষজ্ঞ বললেন, এখন মনসুন (মৌসুমি বায়ু) আগের মতো নির্দিষ্ট সময়ে আসে না, অনেক ক্ষেত্রেই আসে দেরিতে।
আবার বৃষ্টিপাতের ধরনও বদলেছে— অল্প সময় হচ্ছে বেশি বৃষ্টিপাত। এই আবহাওয়াবিদের উদ্বেগ, এখন বর্ষাকালেও তাপপ্রবাহ দেখা যাচ্ছে, যেটা আগে কম ছিল। বৃষ্টি না থাকলে তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়, আবার অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টি হয়। তার ভাষ্য, এটা চরম আবহাওয়ার ইঙ্গিত।
প্রকৃতির এমন ভিন্নতার কারণের ব্যাখ্যায় তিনি বলছেন, এখানে গ্লোবাল এবং লোকাল-দুই ধরনের ফ্যাক্টরই দায়ী। শীতকালে আমরা দেখেছি সূর্যালোক কমে যাচ্ছে, কুয়াশা বাড়ছে— এগুলোর পেছনে প্রভাব আছে দূষণের। এগুলো এক-দুই বছরের ভিত্তিতে বলা যাবে না। লং টার্মে দেখলে বোঝা যাবে, পরিবর্তন আসছে আবহাওয়ার প্যাটার্নে।



