আগামীর সময়

‘সফল’ টিকাদান কর্মসূচির মধ্যেই হাম বেড়েছে ৭৫ গুণ

  • ছয়টি কারণ চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা
  • সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি
‘সফল’ টিকাদান কর্মসূচির মধ্যেই হাম বেড়েছে ৭৫ গুণ

গ্রাফিক্স: আগামীর সময়

বহু বছরের সফল জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) চলমান সত্ত্বেও সারাদেশে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে হাম। এবারের প্রাদুর্ভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে নানা মহলে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু একটি রোগের বিস্তার নয়, সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার কিছু দুর্বলতারও ইঙ্গিত। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এমনকি আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও হামের টিকার গুরুত্ব কমেছিল। সম্প্রসারিত টিকা কর্মসূচির বাইরে গিয়েও দুটি টিকা অতিরিক্ত হিসেবে দেওয়া হতো, যা ২০২৪-২৫ সালে হয়নি। এ অবস্থায় হাম সারাদশে ছড়িয়ে পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তর্কাতর্কির মধ্যেই হাসপাতালগুলোতে হাম আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে ভিড় করছেন অভিভাবকরা।

হাম বেড়ে যাওয়ার ছয়টি মূল কারণ চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি, সময়মতো রোগ শনাক্ত না হওয়া, স্বাস্থ্যকর্মীদের ধর্মঘট, অর্থায়ন সংকটে সেক্টর প্রোগ্রাম স্থগিত, ভিটামিন ‘এ’ ও কৃমিনাশক বিতরণ না হওয়া এবং প্রতি বছর প্রায় ১০ শতাংশ শিশু টিকার বাইরে থাকা।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এসব কারণ মিলিত হওয়ায় সংক্রমণ রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। তারা দ্রুত গণটিকাদান কর্মসূচি জোরদার এবং আক্রান্ত শিশুদের পৃথক চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে হাম শনাক্ত হয়েছে ৬৭৬ শিশুর শরীরে। আগের বছর ২০২৫ সালের এই সময়ে হাম আক্রান্ত রোগী ছিল ৯ জন।

এর আগে ২০২৪ সালের এই সময়ে আক্রান্ত রোগী ছিল ৬৪ জন। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এ বছরের প্রথম তিন মাসে রোগী বেড়েছে ৭৫ গুণ। আর ২০২৪ সালের তুলনায় বেড়েছে প্রায় ১১ গুণ। দেশের ৮ বিভাগে শনাক্ত হামের রোগীর এমন তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে রোগটিতে কত শিশু মারা গেছে তার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এর আগে ২০২৫ সালে সারাদেশে হাম আক্রান্ত হয়েছিল ১২৫ জন।

স্বাস্থ্য অধিপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরে সবচেয়ে বেশি ২৪৫ জন হাম আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে ঢাকা বিভাগে, যা মোট রোগীর ৩৬ দশমিক ২৪ শতাংশ। এরপর রাজশাহী বিভাগে ১৩৭ জন বা ২০ দশমিক ২৬ শতাংশ। চট্টগ্রামে ৯৩ জন বা ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ। ময়মনসিংহে ৮০ জন বা ১১ দশমিক ৮৩ শতাংশ। বরিশাল ও খুলনায় ৫১ জন বা ৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ করে। সিলেটে ১৩ জন বা ১ দশমিক ৯২ শতাংশ। রংপুর বিভাগে ৬ জন বা ০.৮৮ শতাংশ হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে।

শিশু ও মাতৃমৃত্যু কমিয়েছিল ইপিআই

জনস্বাস্থ্যখাতে গত চার দশকে অর্জিত সাফল্যের মধ্যে অন্যতম সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)। ১৯৭৯ সালে স্বল্প পরিসরে যাত্রা শুরু করা এই কর্মসূচি শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার হ্রাসে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে, যা বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে রোল মডেল হিসেবে দাঁড় করায়। ইপিআইয়ের সফল বাস্তবায়নের সরাসরি প্রভাব পড়েছে জনমিতিতে।

স্বাস্থ্যসেবা তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সুশৃঙ্খল নেটওয়ার্কের নাম ইপিআই। জন্মের পর থেকে নির্দিষ্ট সময় অন্তর শিশুদের যক্ষ্মা, পোলিও, ধনুষ্টঙ্কার, হেপাটাইটিস-বি এবং হাম-রুবেলার মতো মারাত্মক ১০টি রোগ প্রতিরোধে এই কর্মসূচির মাধ্যমে দেওয়া হয় বিনামূল্যের টিকা।

ইপিআইয়ের সাফল্যের পেছনে বড় কারণ এর বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবীদের অক্লান্ত পরিশ্রমে দুর্গম চর থেকে শুরু করে পাহাড়ি অঞ্চল পর্যন্ত প্রতিটি শিশু টিকার আওতায় আসে। এই সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ বৈশ্বিক পর্যায়ে একাধিক পুরস্কার লাভের পাশাপাশি ‘পোলিওমুক্ত’ দেশের মর্যাদা অর্জন করে।

তবে সেই বহুল প্রচলিত প্রবাদ ‘চাঁদের কলঙ্ক রয়েছে’-এর মতো ইপিআই কর্মসূচির সাফল্যে কামড় বসাতে চলেছে হামের সাম্প্রতিক প্রার্দুভাব। টিকাদানে দীর্ঘদিনের সফলতা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় হামের প্রাদুর্ভাব নতুন করে চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

    শেয়ার করুন: