আগামীর সময়

কর্মী থেকে শ্রমিক হতে আর কত পথ?

কর্মী থেকে শ্রমিক হতে আর কত পথ?

সংগৃহীত ছবি

রাজধানীর ধানমন্ডি ও আশপাশের এলাকায় প্রায় ১০ বছর যাবত কাজ করছেন জামিলা। কখনও ছোট পরিবারের ঘর পরিষ্কার, কখনও বড় পরিবারের কাপড় ধোয়া, করেছেন শিশুর দেখভাল, ব্যাচেলারদের মেসের রান্নাও।

কারও ‘বুয়া’, কারও ‘খালা’ জামিলা বাসাবাড়িতে কাজ করেই একা হাতে সামলেছেন নিজ সংসার। বড় করেছেন দুই ছেলেকে। স্বামী যখন যেভাবে যা আয় করতে পারেন, তাতেই খুশি তিনি।

দীর্ঘ ‘ক্যারিয়ারে’ বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা ৪৫ বছরের এই গৃহকর্মীর। বলছিলেন একটি অনিশ্চিত আর্থিক ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে কাটানো দিনগুলোর কথা।

‘অনেকদিন তো কাজ করি। এই টাকা দিয়াই সংসার করসি। হের (ছেলের) বাপের তো কামাইয়ের ঠিক ঠিকানা ছিল না। আগে ভাল্লাগতো না, শরীরে দিত না। এহন কাজ করতে করতে হইয়া গেছে। ট্যাকাটুকা আগে মিলাইতে পারতাম না… অহন পোলাডি বড় হইছে, তাই একটু পারি।’

আজকাল নিয়োগের ধরন পাল্টেছে বলে ঠিক কোন কাজটি করতে হবে- তা নাকি আর বলা হয় না। সুযোগমতো সব কাজই করিয়ে নেয়া হয় এক বেতনে।

‘আগে তো বইলা রাখত যে ঘর মুছতে হইব, নাইলে রান্না করন লাগব… এখন কাজে নেয় বইলা যে দিনে তিন কাজ করবা, যখন যেটা বলব, ঘুরায় ঘুরায় করবা। এহন মনে করেন একদিন কইল আজকে ঘর মুছো, কালকে কাপড় ধোও, অনেকদিন জমায় রাইখা এতলা কাপড় ধোয়াইলো। ট্যাকা কিন্তু সব কাজের লেইগ্যা একই’- ক্ষোভ ঝাড়লেন জামিলা।

তার কথা, গৃহকত্রীদের এ ধরনের নিয়োগের ধকল যায় শরীরে। দিনশেষে অসুস্থ হলে আরেক বিপদ।

‘মনে করেন আজকে এক বাসায় দুনিয়ার কাপড় ধুইতে দিল, ওইদিন আরেক বাসায় কইল আজকে রান্না করা লাগব না ঘরটা মুইছা দাও। এরপর আরেক বাসায় গিয়াও তো হেই ঘরই মুছা লাগব। বাসায় গিয়া দুইটা রান্না করমু- হেই শক্তি পাই না। কাজটা ঠিক কইরা দিত, হেমনে বুইঝা বুইঝা কাজ নিতাম, হেইডা তো হয় না।’

উত্তরার গৃহকর্মী আয়েশা জানালেন আরেক সংকটের কথা। প্রায় ৭-৮ বছর ধরে ‘ছুটা’ কাজ করেন পঞ্চাশোর্ধ এই নারী।

‘বান্দা লোক এখন পায় না কেউ। ছুটা দুই-তিনজন দিয়া চালায়। তারপর কোনো ঠিক-ঠিকানা নাই। এক মাসে কাজ বাড়ায়, টাকা বাড়ায়, আবার আরেক মাসে গিয়া কাজ কমায় দেয়, টাকাও কমায় দেয়। কোনো বাসায় বান্দা লোক পাইলেই পরের দিন থেকা আর আসা লাগবে না বইলা দেয়’- বলছিলেন আয়েশা।

একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে লোন নিয়ে স্বামীকে দিয়েছিলেন তিনি। প্রতি মাসে সেই কিস্তি টানা, সঙ্গে তিন সন্তান আর সংসারের খরচের হিসাব আর মেলে না।

‘দেখেন, আমার তো একটা হিসাব থাকে, আপনাদেরও তো হিসাব থাকে মাসের। কয়টা বাসায় কাজ করি, কয় টাকা পাই, সেই টাকা দিয়া চলি। এখন কথা নাই বার্তা নাই কাজ থেকে বের কইরা দেয়, নাইলে কাজ কমায় দেয়। কাজ কি রেডি থাকে? তহন মাসটা ক্যামনে চলি?’

ধরন পাল্টালেও সিংহভাগ নারীর এ পেশায় সমস্যা-সংকট আছে বরাবর। অনিশ্চিত আয়, কখনও অনিরাপদ পরিবেশ, তারউপর ‘মালিকের’ আচরণও যাচ্ছেতাই। আর নির্যাতন-নিপীড়ন এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও এখন যেন নিয়মিত। এর মধ্যে শিশু গৃহকর্মীর ওপর বিভৎসতার ঘটনাই শোনা যায় বেশি।

কোথায় গিয়ে নালিশ জানাবেন, কোথায় গেলে মিলবে সমাধান- জানেন না এই নারী ও মেয়েশিশুরা।

অনানুষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্র হওয়ায় বাংলাদেশে গৃহকর্মীর সংখ্যার সুনির্দিষ্ট হিসাবে নেই। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার হিসাবে, সংখ্যাটি ১৫ থেকে ২০ লাখের মধ্যে, যার বড় অংশের বয়স ৬ থেকে ১৭ বছর।

এই পেশাজীবী নারী ও শিশুদের সুরক্ষায় ২০১৫ সালে ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি’প্রণয়ন করে তৎকালীন সরকার। এখনও আইন হয়নি বলে নীতিমালা মেনে চলায় নেই কোনো বাধ্যবাধকতা।

২০১১ সালে হাইকোর্ট বিভাগের রায়ে ১২ বছরের কম বয়সী শিশুদের ঘরের কাজে নিয়োগকে নিষিদ্ধ করে হাইকোর্ট। তবে সেই রায় বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো তৈরি হয়নি আজও।

গৃহকর্মীদের নিয়ে কাজ করে বেশ কিছু বেসরকারি সংস্থা ও সংগঠন। তবে তাদের কাজ ‘অ্যাডভোকেসি’ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ বলে জানালেন ‘আমরাই পারি’ জোটের প্রধান নির্বাহী জিনাত আরা হক।

‘এনজিওরা বরাবরই এই আইন দরকার ওই নীতিমালা দরকার বলে। তাদের কাজ ওই অ্যাডভোকেসি পর্যন্তই… গৃহকর্মীদের সংগঠিত করার সেই অর্থে কেউ নেই। এ কারণে তাদের নিয়ে যে নীতিমালা, সেটা আইনের দিকে নেয়ার জন্য চাপ দেয়ার কেউ নেই। গৃহকর্মীদের অর্গানাইজ করার বিষয়টাতে আমাদের ঘাটতি আছে।’

জিনাতের মতে, অনানুষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্র হওয়ায় গৃহকর্মীদের থেকে প্রয়োজনমতো সুবিধা নিতে অভ্যস্ত সমাজের বড় ও স্বচ্ছল অংশটি।

‘যতদিন এই মানুষগুলোকে ইনফর্মাল সেক্টরে রাখবে, ততদিন তাদের শোষণ করা যাবে। নারীদের বড় একটা অংশ যে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে, এটা বাংলাদেশের সরকার স্বীকৃতি দিচ্ছে না… শ্রমিক বললেই তো নিয়োগকর্তাদের আইনের আওতায় আসতে হবে… এটা নিয়ে হয়ত ভয় কাজ করে অনেকের… এটা একটা শুভঙ্করের ফাঁকির মতো বিষয়।’

গৃহকর্মীদের সুরক্ষায় নীতিমালার উদ্যোগ নিয়েছিলেন মুজিবুল হক চুন্নু। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে এই নীতিমালার অনুমোদন হয় মন্ত্রীসভায়। আওয়ামী লীগ সরকারের সেই আমলে শ্রম প্রতিমন্ত্রী ছিলেন জাতীয় পার্টির এই নেতা। তিনিই সম্ভবত প্রথম কোনো এমপি, যিনি গৃহকর্মীদের পক্ষে সোচ্চার হয়েছিলেন।

তার উদ্যোগে নীতিমালা হলেও তা আইনের পরিণত হয়নি এতবছরেও। প্রসঙ্গ উঠতেই আক্ষেপের কথা জানালেন মুজিবুল হক চুন্নু।

‘দেখেন, আমি ২০২৫ সালের মে দিবসের একটা অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বলেছিলাম কতটা অমানবিক আচরণ করা হয় গৃহকর্মীদের সাথে। ছোট ছোট মেয়েদের বাসায় রাখে। নির্দিষ্ট কোনো বেতন নাই, কর্মঘণ্টা নাই। তাদের ঘুমানোর কোনো নির্দিষ্ট জায়গাও নাই। হয়ত ড্রইং রুমে ঘুমায়, গেস্ট আসলে আবার পাঠায় দেয় রান্নাঘরে। আর শারীরিক নির্যাতন তো আছেই…’

‘তখন আমি একটা নীতিমালা করেছিলাম, সেটা পরে গৃহীত হয়েছিল। এখন আইনই মানুষ মানে না, নীতিমালা কী মানবে!’

নীতিমালাকে আইন করার উদ্যোগ তখন তিনি কেন নিলেন না? জবাবে হতাশার কথা জানালেন মুজিবুল হক।

‘এগুলো দু:খের কথা বলি আপনাকে, ওই সময় কেবিনেটে এটা নিয়ে হাস্যরস হতো। সবাই বলত, লেবার মিনিস্ট্রির আর কোনো কাজ নাই, ফালতু কাজ নিয়ে থাকে। গৃহকর্মীদের আবার নীতিমালা… আমাদের মানসিকতায় আসলে প্রব্লেম। মানুষ হিসেবে আমরা আসলে ফিউডাল।’

‘আইন হলেই তো এদের মর্যাদা দিতে হবে, ভালো বেতন দিতে হবে, ছুটি দিতে হবে। কেউ তো সেটা করতে চায় না। আমি অনেক চেষ্টা করেছি শেষ পর্যন্ত, বাট ব্যর্থ হয়েছি’, অকপট স্বীকার করলেন এই প্রবীণ রাজনীতিক।

আশার কথা, গত বছরের নভেম্বরে ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬’ সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। সেখানে গৃহকর্মীদের শ্রমিক সংজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে।

নতুন সরকারে সংসদে এই অধ্যাদেশ পাস হয় কিনা- দেখার অপেক্ষায় আছেন মুজিবুল হক চুন্ন।

গৃহকর্মীদের অবশ্য সে খবর জানা নেই। এসময়টায় তারা নিজ ঘরের কাজ গুছিয়ে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ভোর হতেই শুরু হবে দৌঁড়।

    শেয়ার করুন: