আগামীর সময়

রাজনীতি নেতৃত্ব প্রতিনিধিত্ব

নারীর অগ্রযাত্রা কেবলই শব্দে

নারীর অগ্রযাত্রা কেবলই শব্দে

সংগৃহীত ছবি

নারী শিক্ষার সুযোগ, কর্মসংস্থান বা নেতৃত্ব- এমন অনেক সূচকেই এগিয়েছে দেশ, তবে অর্জিত হয়নি প্রকৃত সমতা। শিক্ষা, চিকিৎসা, অর্থনীতি, জনপ্রতিনিধিত্বসহ অনেক খাতেই তাদের অংশগ্রহণ দৃশ্যমান। কিন্তু লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতার মতো বাধা এখনো নারীর অগ্রযাত্রায় বড় বাধা। এমন প্রেক্ষাপটে নারী দিবস ঘিরে দেশের নারী উন্নয়নচিত্র নতুন করে আলোচনায়। আজ রোববার ঘটা করে নানান কর্মসূচির মধ্যে দিয়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং গত ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এবারের নারী দিবস বহন করছে ভিন্ন তাৎপর্য। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও গণতান্ত্রিক রূপান্তরের এই কাল পর্বে নারীরা সমানতালে কি এগুতে পারছেন?

নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় এখনো নানান চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে বলে মনে করেন সমাজবিজ্ঞানী ও অধিকারকর্মীরা। তারা বলছেন, প্রতিনিধিত্বের সুযোগ কিছুটা বাড়লেও বাস্তবে এখনো সব জায়গায় সমান সুযোগ নিশ্চিত হয়নি। যার তরতাজা নজির এবারের সংসদ নির্বাচন। সরাসরি ভোটে লড়ে দেশের নীতি নির্ধারণের সর্বোচ্চ প্ল্যাটফর্ম জাতীয় সংসদের সদস্যদের আসনে বসার সুযোগ পেয়েছেন মাত্র ৭ জন নারী (বিএনপির ৬ ও স্বতন্ত্র ১)। যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন, মোট ৩০০ সংসদ সদস্যের মধ্যে যার শতকারা হার মাত্র ২.৩৬। এর আগে নবম জাতীয় সংসদে সরাসরি ভোটে এমপি হওয়া নারী ছিলেন ১৯ জন, দশমে ১৮ জন এবং একাদশে ২২ জন। সেই তুলনায় এবারের সংখ্যাকে লজ্জাজনক বললে অত্যুক্তি হবে না।

২০২৪-এর জুলাই-আগস্টের রাজপথ ছিল নারী শিক্ষার্থীদের স্লোগানে মুখর। সেই আন্দোলনে নারীদের সাহসী ভূমিকা প্রশংসিত হয়েছে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও। কিন্তু ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের ফলাফল সম্পূর্ণ উল্টো ও হতাশাজনক চিত্র সামনে এনেছে। যখন সমতাভিত্তিক ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার আলোচনা চলছে, তখন নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের এই অনুপস্থিতি যেনো আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে ধরছে।

প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, দলের ভেতরেই কি বৈষম্য? অধিকারকর্মীদের পযবেক্ষন হলো- পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজে নারীদের মনোনয়নে অনীহার নেপথ্যে যে অজুহাত তুলে ধরা হয় তা হলো জেতার সক্ষমতা। দলগুলো মনে করে, নারীদের চেয়ে পুরুষ প্রার্থীরা বেশি ‘ভোট টানতে’ সক্ষম। এ ছাড়া তৃণমূল রাজনীতিতে বহু যোগ্য ও জনপ্রিয় নারী রাজনীতিক থাকলেও অর্থ এবং পেশিশক্তির লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়ছেন তারা। আবার রাজনীতির ময়দানে কোনো নারীর সময় দেওয়াকে সমাজ এখনো দেখে বাঁকা চোখে। ভোটের মাঠে নারী প্রর্থীদের নিরাপত্তা এবং পুরুষ সহকর্মীদের অসহযোগিতাও একটি মস্ত অন্তরায়। এমন প্রেক্ষাপটে এমনকি গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী দলগুলোর সব স্তরে ৩৩% নারী প্রতিনিধিত্বের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও মনোনয়নের ক্ষেত্রে ৫% নারী প্রার্থীও নিশ্চিত হয়নি।

আবার দেশের বর্তমান বাস্তবতায় সংসদ নির্বাচনে লড়তে বিপুল অংকের যে অর্থ ব্যয় করতে হয় তার জোগান দেওয়া অনেক নারী রাজনীতিকের পক্ষেই সম্ভব হয়ে উঠে না।


কেন সংসদে কমছে নারী প্রতিনিধি? অথচ বহুল আলোচিত জুলাই সনদের আলোকে তা বাড়ার কথা। যাতে স্বাক্ষর করেছে দুই তৃতীয়াংশ সংগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করা বিএনপিসহ এবারের সংসদে প্রতিনিধিত্ব করা সবকটি দল। নারী প্রতিনিধিত্ব কমার নেপথ্যের কারণ হিসেবে এরই মধ্যে বিশ্লেষক ও অধিকারকর্মীদের আলাপনে উঠে এসেছে বেশ কয়েকটি বিষয়। যার মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় ত্রুটি এবং তৃণমূল থেকে নারী নেতৃত্বের উঠে আসাতে সামাজিক, রাজনৈতিক ও মনস্তাত্তিক বাধা। সমাজ যেনো এখনো সংরক্ষিত আসনের বাইরে নারীদের জাতীয় সংসদের আসনের মতো মযাদাপূর্ণ স্থানে দেখতে নারাজ।

অথচ ছাত্র-জনতার যে জুলাই অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও চলমান এই গণতান্ত্রিক রূপান্তর রাজপথের সেই আন্দোলনে রাজধানী ঢাকাসহ অধিকাংশ জনপদেই সামনের সারিতে উচ্চকণ্ঠ ছিলেন তরুণীরাও। এমনকি কোথাও কোথাও তাদের দেখা গেছে নেতৃত্বেও।

আগস্ট বিপ্লবে নারীদের যে অদম্য উপস্থিতি ছিল, ভোটের রাজনীতিতে তার প্রতিফলন ঘটল কতটা? রাজপথের সেই লড়াকু নারীরা এখন কোথায়? যারা আন্দোলনে ছিলেন সামনের কাতারে, তাদের কতজন সক্রিয় হলেন রাজনীতিতে? এনসিপির মতো তরুণদের গড়া নতুন নতুন রাজনৈতিক দলে তাদের কি ঠাঁই হলো, হলেও তা কি শীর্ষ স্তরে? আজ যখন ঘটা করে পালিত হচ্ছে নারী দিবস, তখন এত এত প্রশ্ন কি এড়িয়ে যেতে পারবেন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা? এসব প্রশ্নের বাণ ছুটবে দেশের মূল ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বের দিকেও। তারা যদি কৌশলে এসব প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন তাহলে নিশ্চিতভাবেই তাদের ‘বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ’- এর অঙ্গীকার সাধারণ মানুষের কাছে দিনশেষে রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর হিসেবেই চিহ্নিত হবে।

অন্যান্য খাতের মতো রাজনীতির ময়দানেও যে নারীরা প্রকৃতপক্ষে সমানতালে এগুতে পারছেন না তার প্রমাণ মিলেছে এবারের সংসদ নির্বাচনের ভোটের মাঠেও। নারী প্রার্থীদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ভয়াবহ আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে। মূল ধারার রাজনৈতিক দলগুলো থেকে হাতেগোনা যে কয়েকজন নারী দলীয় মনোনয়ন পেয়ে ভোটযুদ্ধে নামেন তাদেরকে প্রতিদ্বন্দ্বী পুরুষ প্রার্থীর সঙ্গে লড়তে হয়েছে ভিন্ন এক অসম লড়াই। নারী প্রার্থীর জয়ে পথে অন্যতম বাধা হিসেবে আবির্ভূত হয় ‘সাইবার বুলিং’। নির্বাচনী প্রচারকালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারী প্রার্থীদের লক্ষ্য করে চলে ‘ডিজিটাল অ্যাবিউজ’ বা অনলাইন হেনস্তা। জনসংযোগের মাধ্যমে ভোটারদের মন জয়ের চেয়ে কোনো কোনো সময় এসব অপপ্রচার মোকাবিলাতেই বেশি ব্যস্ত থাকতে হয়েছে তাদের। নারীদের রাজনৈতিক মেধার চেয়ে তাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রটানো হয়েছে কুৎসা। ভোটের মাঠের এমন নোংরা চিত্র কি বার্তা দিচ্ছে? নিশ্চয়ই অনেক সম্ভাবনাময় ও প্রতিশ্রুতিশীল তরুণী ভাবমূর্তি ক্ষুন্নের ভীতিতে রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন।

আর হতাশার বড় জায়গা হলো নারী প্রার্থীদের লক্ষ্য করে ধারাবাহিকভাবে চলা এই ‘ডিজিটাল অ্যাবিউজ’ থামাতে দৃশ্যত কোনো কাযকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি তৎকালীন সরকার বা নির্বাচন কমিশনকে। নির্বাচনের সময় এই অনলাইন ট্রলের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব অনেক নারী প্রার্থীরই ভোট ব্যাংককে নড়বড়ে করে তোলে।
নারীর সামাজিক নিরাপত্তা ও সহিংসতার চিত্র আরও উদ্বেগজনক। ‘নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ ২০২৪’ অনুযায়ী, দেশের ৭০ শতাংশ নারী জীবদ্দশায় অন্তত একবার ঘরোয়া সহিংসতার শিকার হন; যা নারীর সিদ্ধান্ত-ক্ষমতা, নিরাপত্তা ও সামাজিক অংশগ্রহণকে দুর্বল করে।

এদিকে সরাসরি ভোটে লড়ে সংসদে নারীদের প্রতিনিধিত্বের বিকল্প হিসেবে সংরক্ষিত আসনের যে ‘সান্ত্বনা পুরস্কার’ পদ্ধতির প্রচলন, কাযত তাতে কাজের কাজ হচ্ছে না কিছুই। সংসদের এই ৫০ সংরক্ষিত আসন নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। সংরক্ষিত আসনের এমপিরা সরাসরি জনগণের ভোটে উঠে আসেন না বলে সংসদে তাদের কথা বলার সুযোগ বা গুরুত্বও থাকে কম। অধিকাংশ বিশ্লেষক ও অধিকারকর্মীদের দৃষ্টিতে এটি একটি রাজনৈতিক ঢাল। দলগুলো সংরক্ষিত আসনকে ব্যবহার করে সরাসরি ভোটে নারী মনোনয়নের দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যায়। এমন প্রেক্ষাপটে মনে পড়ছে বাংলা সেই বহুল প্রচলিত প্রবাদ, ‘নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো’। আমরা তেমনটি করতে পারি কিনা তা ভেবে দেখা যেতে পারে। অর্থ্যাৎ সরাসরি ভোটে লড়ে সংসদে মোট আসনের অন্তত ৩৩% নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত না হওয়া পযন্ত সংরক্ষিত আসনের বর্তমান ধারা পাল্টে আপাতত বিকল্প হিসেবে এক্ষেত্রেও সরাসরি ভোটের ব্যবস্থা করা।

সবশেষে এটাই বলবো যে নারীকে শুধুই ভোটার হিসেবে নয়, বরং নেতৃত্বের আসনে বসার যোগ্য হিসেবে মূল্যায়িত করতে হবে। তা না হলে সাম্যতা বা নায্যতার দেশ গড়ার যে বুলি আওড়ানো হয় প্রায়ই, তা দিয়ে বোধহয় বেশি দিন আর চলবে না। জুলাই বিপ্লব যে সাম্য ও ন্যায়বিচারের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, রাজনীতিসহ সমাজ ও জনজীবনের প্রতিটি স্তরে নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো ছাড়া তা অধরাই থেকে যাবে।

কারণ নারীর উন্নয়ন শুধু তার নিজের ব্যক্তিগত বা পারিবারিক উন্নয়ন নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অগ্রগতির জন্য অপরিহার্য। উন্নয়ন কাঠামোতে নারীর পূর্ণ অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা গেলে তবেই সম্ভব টেকসই ও ন্যায়সংগত ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ।

    শেয়ার করুন: