দৃষ্টিপাত
স্পিকারের আসন ও আস্থার রাজনীতি

সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার পদটি কেবল সংসদ পরিচালনার একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়। এটি রাজনৈতিক ভারসাম্যেরও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সংসদের বিতর্ক, শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝখানে স্পিকারকে থাকতে হয় নিরপেক্ষতার প্রতীক হয়ে। কিন্তু বাস্তবে এই পদটি প্রায়ই রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে থাকে। সংসদীয় ইতিহাসে মির্জা গোলাম হাফিজ, জমির উদ্দিন সরকার এবং শিরীন শারমিন চৌধুরী- এই তিনজন স্পিকারের সময়ে সেই বাস্তবতার ভিন্ন চিত্র দেখা যায়।
দেশের সংবিধান প্রণয়নের জন্য ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর গঠিত হয়েছিল গণপরিষদ। সেই গণপরিষদের শুরুতে সভাপতিত্ব করেছিলেন মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ। তাঁর তত্ত্বাবধানে গণপরিষদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হয়েছিলেন শাহ আবদুল হামিদ ও মোহাম্মদউল্লাহ। পরে মোহাম্মদউল্লাহ স্পিকার ও রাষ্ট্রপতি হন।
প্রবীণ আইনজীবী ও অভিজ্ঞ রাজনীতিক মির্জা গোলাম হাফিজ। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার কারণে সংসদ পরিচালনায় তার মধ্যে দৃঢ়তা ছিল। অধিবেশন পরিচালনায় তিনি সংযত ও পরিমিত আচরণের পরিচয় দিয়েছেন বলে অনেকেই মনে করেন। তার সময়ে সংসদের কার্যক্রম মোটামুটি নির্বিঘ্ন ছিল। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা তাকে সংসদের বিতর্ক সামাল দিতে সহায়তা করেছিল।
১৯৮৬-৮৮ সালের সংসদে স্পিকার ছিলেন সামশুল হুদা চৌধুরী। ওই সংসদের ডেপুটি স্পিকার ছিলেন কোরবান আলী।
১৯৯১ সালে পঞ্চম সংসদে প্রথমে স্পিকার নির্বাচিত হয়েছিলেন আবদুর রহমান বিশ্বাস। তবে খুব অল্প দিনের মধ্যেই তিনি দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তখন স্পিকার হন শেখ রাজ্জাক আলী। তিনি পঞ্চম সংসদের শুরুতে ছিলেন ডেপুটি স্পিকার।
১৯৯৬ সালে সংদের স্পিকার ছিলেন হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী। ওই সংসদের ডেপুটি স্পিকার ছিলেন আব্দুল হামিদ। পরে তিনি স্পিকার ও রাষ্ট্রপতি হন।
২০০১ সালে স্পিকারের দায়িত্ব পান ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার। পেশায় তিনি আইনজীবী ছিলেন। সংসদ পরিচালনায় তিনি নিয়ম ও কার্যপ্রণালি বিধিকে গুরুত্ব দিতেন। তার ধরন ছিল তুলনামূলকভাবে কঠোর ও নিয়মমাফিক। তবে সে সময় দেশের রাজনীতি ছিল তীব্র মেরুকরণের মধ্যে। বিরোধী দলের সঙ্গে সংসদে প্রায়ই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হতো। সমর্থকরা বলেন, তিনি বিধি মেনেই সংসদ চালানোর চেষ্টা করেছেন। অন্যদিকে সমালোচকরা মনে করেন, সেই সময়ের রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যেই তাকে রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত করে তোলা হয়েছিল।
২০০৯ সালের সংসদে স্পিকার ছিলেন আব্দুল হামিদ। এরপর ২০১৩ সালে স্পিকারের পদে আসে একটি আলোচিত পরিবর্তন। তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই দায়িত্ব দেন শিরীন শারমিন চৌধুরীকে। তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী স্পিকার। তবে তার এই নিয়োগ শুরুতেই বিস্ময় তৈরি করেছিল। সংসদীয় রাজনীতিতে তখন তার অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। ফলে অনেকেই তাকে অনভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে দেখেছিলেন।
দলের ভেতরেও কিছু অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। অনেক প্রবীণ নেতা মনে করেছিলেন, সংসদ পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে আরও অভিজ্ঞ কাউকে বেছে নেওয়া যেতে পারত। শিরীন শারমিনের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ় আস্থা নিয়েও তখন আলোচনা ছিল। কিন্তু শেখ হাসিনা এসব সমালোচনাকে খুব একটা গুরুত্ব দেননি। তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিরীন শারমিন চৌধুরী দীর্ঘ সময় ধরে স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেছেন। আন্তর্জাতিক সংসদীয় অঙ্গনেও তিনি সক্রিয় ছিলেন এবং বিভিন্ন ফোরামে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তবে সংসদে বিরোধী মতের পরিসর নিয়ে তার সময়েও রাজনৈতিক বিতর্ক হয়েছে।
এই তিনজন স্পিকারের অভিজ্ঞতা একটি বিষয় স্পষ্ট করে। স্পিকারের পদ শুধু সংসদ পরিচালনার দক্ষতার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ব্যক্তির অভিজ্ঞতা, সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং নেতৃত্বের আস্থা। কেউ অভিজ্ঞতার জোরে সংসদ চালান, কেউ নিয়মের কঠোর প্রয়োগে বিতর্কের মুখে পড়েন, আবার কেউ নেতৃত্বের আস্থায় দায়িত্ব পেয়ে সময়ের সঙ্গে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
জাতীয় সংসদের স্পিকারের আসন তাই শুধু একটি সাংবিধানিক পদ নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও ক্ষমতার সম্পর্কেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।



