অভ্যুত্থান থেকে নির্বাচন, কেন পিছিয়ে পড়ল তরুণদের দল

টগবগে তারুণ্য, সব বদলে দেওয়ার চোখভরা স্বপ্ন আর বুকভরা সাহস নিয়ে রাজপথ দখল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলি উপেক্ষা করে ক্ষমতাধর সরকারের পতন ঘটানো। দুর্নীতিমুক্ত দেশ পেতে তরুণদের এই অসাধ্য সাধনে সমর্থন জুগিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিল সাধারণ জনতা।
ঘটনাগুলো একের পর এক ঘটেছে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালে। তবে বাংলাদেশে নতুন ক্ষমতার চালক হতে শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ তরুণদের দল। কেন? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে নানামুখী বিশ্লেষণের ঝড়।
রাজনীতি বিশেষজ্ঞরাও খুঁজছেন উত্তর। অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের গঠন করা দল জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) ঘিরে শুধু স্বপ্নভঙ্গ নয়, নানান বিতর্ক এবং নির্বাচনে অল্প কয়েকটি আসনে জয় হতাশ করছে সমর্থক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের।
নেপালে অভ্যুত্থানের ছয় মাস পার হওয়ার ঠিক তিন দিন আগে অনুষ্ঠিত হলো জাতীয় নির্বাচন। অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের নায়ক হিসেবে আবির্ভূত সাবেক র্যাপার এবং কাঠমান্ডুর মেয়র বালেন্দ্র শাহের নবগঠিত দলের বিজয় এখন সুনিশ্চিত। তারুণ্যের নেপাল জয়ের পর থেকে বাংলাদেশজুড়ে চলছে আলোচনার ঝড়। হিমালয়কন্যার মতো একই ধরনের ইতিহাস দেড় বছর আগে বঙ্গোপসাগরের কোলের দেশটিতেও গড়েছিলেন তরুণরা। অথচ এরপর বাংলাদেশে নির্বাচনে কেন পুরোপুরি ধরাশায়ী তরুণদের দল?
বিশ্লেষকেরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারকে হটিয়ে যেভাবে উত্থান, অন্তর্বর্তী সরকারের ‘কিংস পার্টির’ তকমা গায়ে মেখে সেভাবেই পতনের দিকে হেঁটেছে এনসিপি। সর্বশেষ সর্বনাশটি হয় একাত্তরে যুদ্ধাপরাধের দায় বহন করা ধর্মভিত্তিক দল জামায়াতে ইসলামীর জোটে গিয়ে।
মোটাদাগে নেপালের জেন-জিদের সঙ্গে এখানেই পার্থক্য ঘটে যায় আমাদের অভ্যুত্থানসেনাদের।
নেপালে গত সেপ্টেম্বর ওলি সরকারের পতনের পর সুশীলা কারকির নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। আসে ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচনের ঘোষণা। সেই সরকারে যুক্ত হননি অভ্যুত্থানের নেতারা। তাদের বিরুদ্ধে ওঠেনি ক্ষমতার অপব্যবহারের কোনো অভিযোগ। অভ্যুত্থানের সমর্থক ৩৫ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহের রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি আরএসপি নির্বাচনে লড়ার প্রস্তুতি নেয়। আর আন্দোলনকারী তরুণরা ফিরে যান পড়ার টেবিলে।
অভ্যুত্থানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন বালেন্দ্র শাহ। নির্বাচনের পর প্রাথমিক গণনায় পুরোনো সব দলকে বিপুল ভোটে পেছনে ফেলেছে তার মধ্যপন্থী দল। ১৬৫ আসনের মধ্যে এখন পর্যন্ত ১১৫ আসনে তারা এগিয়ে।
আরএসপি তুলনামূলক নতুন হলেও অভ্যুত্থানের পর গঠিত দল নয়। ২০২২ সালে নির্বাচনে একা লড়াই করে ভোট পেয়েছিল ১০ শতাংশ। দলের নেতা রবি লামিছান দুই দফায় ছিলেন দেশের উপপ্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এবার অভ্যুত্থানের জনপ্রিয় মুখ বালেন্দ্র শাহ এ দলে যোগ দিয়ে হতে চলেছেন প্রধানমন্ত্রী।
এর আগে শ্রীলঙ্কাতেও দেখা গেছে অনেকটা এক দৃশ্য। সেখানে অভ্যুত্থানের সমর্থক অনুরা কুমার দিশানায়েকের দল বিপুল ভোটে অন্য সব বড় দলকে হারিয়ে দেয়। ১৯৬ আসনের মধ্যে ১৩৭টিতে জয় পায় তার দল ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার (এনপিপি)।
এটিও অভ্যুত্থানের পর গঠিত দল নয়। ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত দলটি আগে একবার নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। আর বামপন্থী অনুরা নির্বাচন করছেন ২০১৫ সাল থেকে। এনপিপি গঠন করে পেয়েছেন ক্ষমতার মসনদ।
সার্কভুক্ত দুই দেশের অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও ছিল মিল। অন্তর্বর্তী সরকার এসেই দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণ করে।
শ্রীলঙ্কায় ২০২২ সালের অভ্যুত্থানের পর আসা অন্তর্বর্তী সরকার হাত দেয়নি সংবিধানে। নিষিদ্ধ করেনি কোনো রাজনৈতিক দলকে। নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল সব দল। বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ রনিল বিক্রমাসিংহের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার আন্দোলন-পরবর্তী বিশৃঙ্খলা দমন করে দেশে আনে স্থিতিশীলতা।
এমনকি অভ্যুত্থানের সময় এক সংসদ সদস্যকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় অন্তত ১২ আন্দোলনকারীকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দিয়েছিল দেশটির আদালত।
নেপালের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কারকি গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর ক্ষমতা নিয়েই আন্দোলনের নামে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেন। অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েই জানিয়েছিলেন, জেন-জি আন্দোলনের অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনাগুলো দেশের বিরুদ্ধে ‘ফৌজদারি অপরাধ’ হিসেবে বিবেচিত হবে।
সেখানেও ভোটে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়েছে সব দল।
বাংলাদেশের সঙ্গে দেশ দুটির মিল কেবল অভ্যুত্থানেই। পরের ঘটনাক্রম একেবারেই ভিন্ন।
এখানে অন্তর্বর্তী সরকারের ছায়ায় অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণরা গঠন করে ‘কিংস পার্টি’ এনসিপি। এরপর গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ২৯৭টি আসনের মধ্যে দলটি জয় পায় কেবল ৬ আসনে।
দেড় বছরের ব্যবধানে জনপ্রিয়তায় কেন এমন ভরাডুবি?
কবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজের মতে, নেপালের গণঅভ্যুত্থানকারীরা যেকোনো মূল্যে পুরোনো দলগুলোকে ক্ষমতার বাইরে রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল। শ্রীলঙ্কায় গণঅভ্যুত্থানকারীরা সামাজিক পরিবর্তনে আগে থেকেই ছিল অঙ্গীকারবদ্ধ। আর বাংলাদেশে তরুণরা বিভিন্ন পুরোনো দলের সঙ্গে আঁতাত করে ক্ষমতার ভাগ পেতে চেষ্টা করেছে কেবল।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারে যোগ দেন আন্দোলনের সামনের সারির নেতা নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদ। পরে আরেক ছাত্র প্রতিনিধি মাহফুজ আলম যুক্ত হন উপদেষ্টা পরিষদে।
কয়েক মাস পর ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণরা গঠন করেন এনসিপি। জুলাই আন্দোলনকারীদের দল হওয়ায় তাদের ঘিরে দেশে নতুন রাজনৈতিক ধারা তৈরির প্রত্যাশা তৈরি হয়।
তবে এরপর সরকারের নানামুখী সহায়তায় ভর করেই চলতে দেখা গেছে এনসিপিকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তায় দেশে সভা-সমাবেশ করা, মব ভায়োলেন্সকে উসকে দেওয়া, চাঁদাবাজি, এমনকি থানা থেকে অভিযুক্তদের ছাড়িয়ে আনার মতো দাপট দেখিয়েছেন দলের নেতারা।
দল সংগঠিত করার যখন সময়, তখন অনেক তরুণকে একে একে দল ছাড়তেও দেখা গেছে। শীর্ষ নেতাদের অনেকের বিরুদ্ধে উঠতে শুরু করে দুর্নীতির অভিযোগ। নেতারা প্রথমে নির্বাচনে সব আসনে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দিলেও শেষপর্যন্ত জোট গড়েন জামায়াতের সঙ্গে। মাত্র ৩০টি আসনে দেওয়া হয় দলীয় প্রার্থী।
জোটের এই সিদ্ধান্ত তরুণ নেতাদের এক ধাক্কায় হিরো থেকে বানিয়েছে জিরো। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ও ধর্মভিত্তিক দল জামায়াতের সঙ্গে জোটে যাওয়ায় দল ছাড়েন নারী নেতাসহ বেশ কয়েকজন পরিচিত মুখ। মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করা মানুষ এনসিপির এই সিদ্ধান্তে হয়েছেন হতাশ, ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত।
তরুণদের জনপ্রিয়তায় ধসের শুরুটা বর্ণনা করলেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ।
‘উপদেষ্টা প্যানেলে শুরুতেই দুই তিনজন ঢুকে গেল, জেলা-উপজেলা পর্যায়েও পদ-পদবির জন্য এরা তদবির শুরু করল... পরিবর্তনের চিন্তা থেকে সরে গিয়ে তারা প্রশাসনিক চিন্তায় মনোযোগী হলেন... আমাদের তরুণ সমাজ হয়ে পড়ে সচিবালয়মুখি, যেখানে শ্রীলঙ্কা-নেপালে তরুণরা মাঠে-ময়দানে নেমে গণমুখি সংযোগ করতে শুরু করে।’
তরুণদের মধ্য থেকে একক কোনো নেতাকে তুলে ধরা হয়নি- পতনের কারণ হিসেবে এ বিষয়টিকেও সামনে আনেন আলতাফ। ‘নেপালের বালেন্দ্র শাহ অভ্যুত্থানের সমর্থক ছিলেন, তাকে তরুণরা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রজেক্ট করে। আমাদের তরুণরা তো কাউকে প্রজেক্টও করেনি। বরং একটা সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর এক নেতাকে তারা অভ্যুত্থানের বীর সেনানী বলে পরিচয় করায় তারা। তাহলে তো আর তারা বীর সেনা থাকল না- এটাই তো দেখল জনগণ। নিজেকে ওরাই খাটো করেছে।’
‘অন্তর্বর্তী সরকারের ছায়ায় থেকে ওরা কেবল যতটুকু সুযোগ-সুবিধা নেওয়া যায়, শহরভিত্তিক রাজনীতির দল গঠন- সেসবই করেছে। এরা ফেসবুকভিত্তিক হয়ে পড়ে ছিল, ওই দুইদেশে তরুণরা ছিল মাঠভিত্তিক, তৃণমূলের সাথে এঙ্গেইজ হওয়াকে গুরুত্ব দিয়েছে... আবার শ্রীলঙ্কা ও নেপালের তরুণরা বামঘেঁষা নাহলে মধ্যমপন্থাঘেঁষা। বাংলাদেশের তরুণরা তো হয়ে পড়েছে রাইটিস্ট’- অভিমত এই রাজনৈতিক বিশ্লেষকের।
তরুণদের দল যখন এভাবে শুভাকাঙ্ক্ষীদের স্বপ্নভঙ্গে ব্যস্ত, তখন জনগণের ভরসা গিয়ে ঠেকে পুরোনো ও অভিজ্ঞ রাজনৈতিক দল বিএনপিতে। সহজেই বিপুল ভোট পেয়ে সরকার গঠন করেন তারেক রহমান।
অন্যদিকে জামায়াতের জোটসঙ্গী হওয়ার বদৌলতে সংসদে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন এনসিপির মাত্র ছয়জন। অথচ দেড় বছর আগের জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারলে বাংলাদেশেও হয়তো ঘটতে পারত নেপাল বা শ্রীলঙ্কার মতো দৃশ্যায়ন।

