এমনকি ট্রাম্পের দলের সবাইও যুদ্ধের পক্ষে নয়

সংগৃহীত ছবি
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী বিরোধী নেতাই নিহত হয়নি, বরং বড় আঘাত লেগেছে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায়। এই যুদ্ধ পরিচালনায় ট্রাম্প প্রশাসন যতটা আগ্রাসী, মার্কিন নাগরিকদের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তাদের স্বতস্ফূর্ত সমর্থন আছে— এমন কোনো জরিপ নেই। বরং অধিকাংশ জরিপ বলছে মার্কিন নাগরিকরা এই যুদ্ধের ঘোর বিরোধী।
ইরানের সঙ্গে এই সংঘাতটি ‘ক্রাইম অব অ্যাগ্রেসন’ মনে করেন মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সের সাবেক পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা ম্যাথিউ ডাস। তার ভাষ্য, এই যুদ্ধ হুট করে শুরু হয়নি; বরং এটি দীর্ঘদিন ধরে সামরিক শক্তিনির্ভর পররাষ্ট্রনীতির পরিণতি। একই মতামত দিয়েছেন ট্রাম্পের দলের অনেকেই।
প্রশ্নের মুখে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন রিপাবলিকান প্রতিনিধি থমাস ম্যাসি। তিনি বলছেন, ‘এই যুদ্ধ ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি নয়। কংগ্রেস অধিবেশনে বসলে আমি রো খান্নার সঙ্গে কাজ করব, যাতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বিষয়ে কংগ্রেসে ভোট বাধ্যতামূলক করা যায়। সংবিধান চায় সবকিছু ভোটের মাধ্যমে হোক। আপনার প্রতিনিধি এই যুদ্ধে পক্ষে না বিপক্ষে তা নথিভুক্ত হওয়া প্রয়োজন।’
একই মনোভাব ডেমোক্র্যাট সিনেটর অ্যাডাম শিফের। তার ভাষ্য, ‘ট্রাম্প আমাদের দেশকে আরেকটি বিদেশি যুদ্ধে টেনে নিচ্ছেন, যা জনগণ চায় না এবং কংগ্রেস অনুমোদন দেয়নি। ইরানের শাসনব্যবস্থা একটি নিষ্ঠুর ও হত্যাকারী একনায়কতন্ত্র। কিন্তু তা ট্রাম্পকে একতরফাভাবে পছন্দসই যুদ্ধ শুরু করার ক্ষমতা দেয় না।’
সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী কামালা হ্যারিসও যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন। অপরদিকে ক্ষোভ ঝেড়েছেন সাবেক রিপাবলিকান প্রতিনিধি মার্জোরি টেইলর গ্রিন।
তার মতে, ‘আমরা বলেছি আর কোনো বিদেশি যুদ্ধ নয়, সরকার পরিবর্তন নয়। ট্রাম্প, ভ্যান্স, প্রায় পুরো প্রশাসন এই প্রতিশ্রুতি দিয়েই প্রচার চালিয়েছিল—আমেরিকা ফার্স্ট এবং মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন। আমাদের প্রজন্ম পুরো জীবন সরকারের দ্বারা হতাশ, ব্যবহৃত ও নির্যাতিত হয়েছে।’
‘এই যুদ্ধ ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে’
সাধারণত অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে মনোযোগী ডেমোক্র্যাটরা। তবে সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ধারাবাহিক ভুল পদক্ষেপ (যার সর্বশেষটি ইরানে) তাদের বিকল্প পররাষ্ট্রনীতি কেমন হতে পারে তা ভাবতে বাধ্য করছে।
‘ইরানে হামলা চালানোর আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প কংগ্রেসের অনুমোদন চাননি। বরং কূটনীতি পরিত্যাগ করে ব্যাপক সামরিক হামলা চালানোর সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তিনি মার্কিন সেনাদের ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়ার মুখে ফেলেছেন’, বলছিলেন ডেমোক্র্যাটিক হাউসের সংখ্যালঘু নেতা হাকিম জেফ্রিস।
একই কথা বলছেন ডেমোক্র্যাট নেতা ও সিনেট মাইনোরিটি লিডার সিনেটর চাক শুমার।
‘হুমকির ব্যাপ্তি ও তাৎক্ষণিকতা সম্পর্কে প্রশাসন কংগ্রেস ও মার্কিন জনগণকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়নি। ইরানের ক্ষতিকর আঞ্চলিক কার্যক্রম, পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং ইরানি জনগণের ওপর কঠোর দমন-পীড়নের মোকাবিলায় প্রয়োজন মার্কিন শক্তি, দৃঢ়তা, আঞ্চলিক সমন্বয় এবং কৌশলগত স্বচ্ছতা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হঠাৎ ক্ষোভ প্রকাশ ও বৃহত্তর সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করার প্রবণতা কোনো কার্যকর কৌশল নয়’, ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচনায় মুখর হয়ে বলছিলেন এই নেতা।
অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি রাশিদা তালিব জানিয়েছেন, মার্কিন জনগণ ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চায় না। তার অভিযোগ, ট্রাম্প আমেরিকার রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণি ও ইসরায়েলি বর্ণবাদী সরকারের সহিংস কল্পনার ভিত্তিতে কাজ করছেন, অথচ অধিকাংশ মার্কিনি স্পষ্টভাবে বলছে ‘আর কোনো যুদ্ধ নয়।’
‘মার্কিন জনগণ আবারও এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে, যা তারা চায়নি। এমন একজন প্রেসিডেন্টের কারণে এটি ঘটছে যিনি নিজের সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদী পরিণতি নিয়ে ভাবেন না। এই যুদ্ধ বেআইনি, অপ্রয়োজনীয় এবং ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে। এই সপ্তাহেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করছিল, যা যুদ্ধ ঠেকাতে পারত। প্রেসিডেন্ট সেই আলোচনা থেকে সরে গিয়ে যুদ্ধকে বেছে নিয়েছেন’, আল জাজিরাকে বলছিলেন ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-করতেজ।
সরকার পতনই কি লক্ষ্য?
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের চূড়ান্ত লক্ষ্য ইরানের ইসলামী শাসন উৎখাত করা এবং ওয়াশিংটনপন্থী একটি শাসন কায়েম করা। সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে রেজা পাহলভির নাম আলোচনায় যিনি ১৯৭৯ সালে উৎখাত হওয়া শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির ছেলে।
জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আত্মরক্ষার অধিকার কেবল তখনই প্রযোজ্য, যখন কোনো রাষ্ট্র সশস্ত্র হামলার শিকার হয়। এর বাইরে সশস্ত্র আক্রমণ ‘আগ্রাসনের অপরাধ’ হিসেবে গণ্য।
‘ইরানের ওপর সামরিক হামলা যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল পরিচালনা করছে— এটি বেআইনি আগ্রাসী যুদ্ধের ভয়াবহ সম্প্রসারণ। শহরে বোমাবর্ষণ, বেসামরিক মানুষ হত্যা, নতুন যুদ্ধক্ষেত্র উন্মুক্ত করা; মার্কিনীরা এটি চায় না। তারা সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্যে আরেকটি যুদ্ধ চায় না। তারা জীবনযাত্রার ব্যয়সংকট থেকে মুক্তি চায়’, নাগরিকরা শান্তি চায় জানিয়ে বলছিলেন নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি।
অপরদিকে বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ বার্নি স্যান্ডার্স বলছেন, ‘এই ট্রাম্প–নেতানিয়াহু যুদ্ধ অসাংবিধানিক এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে। এটি মার্কিন সেনা ও অঞ্চলের মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। আমরা ভিয়েতনাম ও ইরাকে ‘মিথ্যার অভিজ্ঞতা’ পেয়েছি। আর কোনো অন্তহীন যুদ্ধ নয়। কংগ্রেসকে অবিলম্বে ওয়ার পাওয়ারস রেজোলিউশন পাস করতে হবে।’
জনগণের কাছে মিথ্যার বলার অভিযোগ করেছেন অপর সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেনও।
তার ভাষ্য, ‘ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে একটি বেআইনি সরকার পরিবর্তন যুদ্ধ শুরু করতে গিয়ে মার্কিন জনগণের কাছে মিথ্যা বলছেন। এটি তাদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলছে এবং ইতোমধ্যেই ব্যাপক বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটিয়েছে। আমরা এতে নিরাপদ বোধ করছি না; বরং যুক্তরাষ্ট্র ও আমাদের স্বার্থে ক্ষতি হচ্ছে। এটি থামাতে সিনেটকে অবিলম্বে ওয়ার পাওয়ারস রেজোলিউশনে ভোট দিতে হবে।’
পশ্চিমা গণমাধ্যম কী বলছে
পুরো যুদ্ধজুড়ে পশ্চিমা গণমাধ্যমের কাভারেজে যে বিষয়টি অনুপস্থিত তা হলো এই হামলা ‘সম্পূর্ণ বেআইনি।’ আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে এটি অপরাধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে ইরানের সশস্ত্র প্রতিক্রিয়া ন্যায্য ও বৈধ। পশ্চিমা গণমাধ্যমের দর্শকদের সেই পুরোনো ভ্রান্ত বয়ানই দেখানো হচ্ছে, যা তৈরি করেছে আগ্রাসী রাষ্ট্র, যুদ্ধবাজ গোষ্ঠী ও জায়োনিস্ট প্রতিনিধিরা। যেমন, যুদ্ধই নাকি শান্তি, শান্তিই নাকি হুমকি; আগ্রাসনই আত্মরক্ষা, আত্মরক্ষাই আগ্রাসন; ভুক্তভোগীই অপরাধী, অপরাধীই ভুক্তভোগী।
সমালোচকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক আলোচনায় অংশগ্রহণের ভান করে যুদ্ধ প্রস্তুতির আড়াল তৈরি করে, এরপর ইসরায়েলি মিত্রের সঙ্গে আকস্মিক সামরিক হামলা চালায়। আসলে হামলাটি চালানো হয় ঠিক কয়েক ঘণ্টা পর, যখন ওমানের মধ্যস্থতাকারীরা ঘোষণা করেন বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে।
ইরান পারমাণবিক অস্ত্র বানাবে না বলে নিশ্চিত করেছে এবং শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচির অধিকার সীমিত করতে রাজি ছিল। বাস্তবে ইরানের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র নেই বলেই তাকে হামলার লক্ষ্য করা হয়েছে।
অন্যদিকে এই অঞ্চলে ঘোষণাবিহীন পারমাণবিক অস্ত্রের মজুদ রয়েছে ইসরায়েলের কাছে। যুক্তরাষ্ট্রও একটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। অথচ এই দুই দেশ পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণের অজুহাতে একটি নিরস্ত্র রাষ্ট্রের ওপর হামলা চালিয়েছে। এই অজুহাত দুর্বল হওয়ায় এবার বলা হচ্ছে, ইরানি জনগণের মানবাধিকার রক্ষায় এই হস্তক্ষেপ।
মানবাধিকার রক্ষার দাবি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মতো রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে মর্মান্তিক। ইরানের মানবাধিকার সমস্যা থাকতে পারে। কিন্তু যারা দশক ধরে অঞ্চলে সামরিক আগ্রাসন চালিয়েছে, তারাই এখন মানবাধিকারের রক্ষক।

