আগামীর সময়

ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে মোদির ভারতকে লজ্জায় ফেলল যুক্তরাষ্ট্র

ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে মোদির ভারতকে লজ্জায় ফেলল যুক্তরাষ্ট্র

ইরানি যুদ্ধজাহাজ আইআরআইএস ডেনা। ছবি: সংগৃহীত

ভারত মহাসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর হামলায় ইরানের ‘অস্ত্রবিহীন’ যুদ্ধজাহাজ আইআরআইএস ডেনা ডুবে যায়। ইরানি যুদ্ধজাহাজটি ভারতে আয়োজিত নৌ মহড়ায় অংশ নিয়েছিল বলে জানিয়েছে নয়াদিল্লি। সেটি দেশে ফেরার সময় ভারত মহাসাগরের আন্তর্জাতিক জলসীমায় প্রবেশের পর হামলার শিকার হয়।

শ্রীলঙ্কার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওই জাহাজের ৩২ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং এক কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেছেন যে, জাহাজে ৮০ জনের মরদেহ পাওয়া গেছে।

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ভারত কোনো শোকবার্তা বা নিন্দা জানায়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের এই নীরবতা তার নিরপেক্ষ অবস্থানকে ক্ষুণ্ন করেছে এবং কূটনৈতিকভাবে দেশটিকে আরও বিচ্ছিন্ন ও বিব্রতকর পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছে।

তাদের মতে, সংঘাতের মূল এলাকা থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে এমন একটি হামলা বিপজ্জনক নজির স্থাপন করেছে। সবচেয়ে বড় অবাক করা বিষয় হচ্ছে টর্পেডো নিক্ষেপ করা হয়েছে কোনো সতর্কবার্তা ছাড়াই এবং নাবিকদের লাইফবোটের মাধ্যমে সরে যাওয়ার সুযোগও দেওয়া হয়নি। এর ফলে ধরে নেওয়া যায়, সাগরে যে কোনো জায়গায় যে কোনো নৌযান অনিরাপদ।

ভারতের নৌবাহিনীর সাবেক প্রধান অরুন প্রকাশ টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ইরানের ওই যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া ছিল একটি অর্থহীন ও উসকানিমূলক কাজ। তার মতে, এই ঘটনা সমুদ্রপথে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করবে এবং বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যকেও ব্যাহত করতে পারে।

বিশ্বের বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের নৌবাহিনীর সাবেক এই প্রধান আরও বলেছেন, ভারতের উচিত যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আমাদের অসন্তোষ প্রকাশ করা। এই কথা জোর দিলে বলা যে, ‘তোমরা আমাদের না জানিয়ে আমাদের সীমান্তের কাছাকাছি সমুদ্র এলাকায় যুদ্ধ নিয়ে এসেছো।’

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন , ভারতের উপকূলের এত কাছে একটি পারমাণবিক সাবমেরিন অবস্থান করছিল, অথচ এ বিষয়ে ভারতীয় নৌবাহিনীকে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি—যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

আন্তর্জাতিক কৌশলগত সম্পর্কবিষয়ক বিশ্লেষক সুশান্ত সিং বলেছেন, ইরানি যুদ্ধজাহাজ ভারতের জলসীমা ছাড়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ডুবে যাওয়া নয়াদিল্লির আঞ্চলিক বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য একটি বড় ধাক্কা।

তিনি হতাশার সুরে বলেছেন, এখন এই বিষয় পরিষ্কার যে, ট্রাম্প প্রশাসন মোদি সরকারের সঙ্গে কোনো পরামর্শ ছাড়াই সরাসরি সাবমেরিন থেকে হামলা চালিয়েছে। এতে বোঝা যায়, এটি যুদ্ধক্ষেত্র বিস্তৃত করার একটি অপচেষ্টা। এই কর্মকাণ্ড মোদির ভারতের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক।

ইরানি জাহাজটি বিশাখাপত্তনমে সদ্য অনুষ্ঠিত মিলান ২০২৬ নৌ মহড়ায় অংশ নিয়েছিল। নৌযানটি এই মহড়ায় অংশ নেয় ভারতের নৌবাহিনীর আমন্ত্রণে।

সাবেক পররাষ্ট্রসচিব কানওয়াল সিবল, যিনি সাধারণভাবে মোদি সরকারের সমর্থক হিসেবে পরিচিত, তিনি বলেছেন, মিলান দ্বিবার্ষিক অনুশীলনের মূল লক্ষ্য হলো নৌবাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া, বিশ্বাস ও পেশাদার যোগাযোগ গড়ে তোলা, যাতে একটি স্বাধীন, উন্মুক্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং নিয়মভিত্তিক সামুদ্রিক ব্যবস্থা বজায় থাকে। এর উদ্দেশ্য হলো সামুদ্রিক অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রচার করা।

তিনি আরও বলেছেন, ইরানি ফ্রিগেট জাহাজটি ভারতীয় নৌবাহিনী দ্বারা আমন্ত্রিত ছিল। স্পষ্টতই মার্কিন সাবমেরিনটি এই অনুশীলন পর্যবেক্ষণ করছিল এবং যখন জাহাজটি ইরানে ফিরে যাচ্ছিল তখন এতে হামলা চালানো হয়। মিলান মহড়ার চেতনা যুক্তরাষ্ট্রের এ হামলায় লঙ্ঘিত হয়েছে। এটি খুবই বাজে কাজ হলো।

কৌশলগত সম্পর্কবিষয়ক বিশ্লেষক ব্রহ্মা চেলানি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম এক্স পোস্টে লিখেছেন, ভারত-আয়োজিত বহুপক্ষীয় মহড়া থেকে ফিরে যাওয়ার সময় একটি ইরানি জাহাজ ডুবিয়ে ওয়াশিংটন কার্যকরভাবে ভারতের সামুদ্রিক এলাকাকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছে। যার ফলে ভারতের নিজস্ব আঙ্গিনায় কর্তৃত্ব সম্পর্কে অস্বস্তিকর প্রশ্ন উঠেছে। কূটনৈতিক পরিভাষায়, এই হামলা নৌ-আতিথেয়তার অলিখিত কোড লঙ্ঘন করেছে। কোনো জাহাজ যখন কোনো দেশের জলসীমা ছেড়ে চলে যায়, তখনই আক্রমণ করাকে সেই দেশের প্রতি অবজ্ঞা হিসেবে দেখা হয়। অংশগ্রহণকারী নৌবাহিনীর প্রতি বার্তাটি স্পষ্ট, তা হলো— ভারতের মহড়ায় অংশ নেওয়া নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নাও দিতে পারে।

দ্য প্রিন্টের কনট্রিবিউটিং এডিটর প্রবীণ স্বামী বলেছেন, ইরানি জাহাজটি মহড়া শেষ করে চলে যাওয়ার আগে ভারত ও ইরানকে যুক্তরাষ্ট্র সতর্ক করতে পারত। বলতে পারত, ফেরার পথে এই জাহাজে হামলা চালানো হবে। তখন জাহাজের ক্যাপ্টেন হয়তো নিরপেক্ষ কোনো বন্দরে আশ্রয় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন।

চেলানি ও স্বামী— দু’জনই স্বীকার করেছেন যে, আন্তর্জাতিক জলসীমা নেভিগেশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে, কিন্তু যুদ্ধকালীন আক্রমণ থেকে রক্ষা করে না। কিন্তু যুদ্ধের আইন—জেনেভা কনভেনশনের আওতায়—একটি স্পষ্ট বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আর তা হচ্ছে—আক্রান্ত জাহাজটি ডুবে গেলে, আক্রমণকারী পক্ষকে সামরিক পরিস্থিতি যতটা অনুমতি দেয়, সে অনুযায়ী বেঁচে থাকা নাবিকদের উদ্ধার করতে হয়। কিন্তু ঘটনার পর মার্কিন সাবমেরিন ওই এলাকা ত্যাগ করে আর উদ্ধারকাজ ছেড়ে দেয় শ্রীলঙ্কা নৌবাহিনীর ওপর। এটি এখনো স্পষ্ট নয় যে, ভারতীয় নৌবাহিনী কোনো উদ্ধার প্রচেষ্টা চালিয়েছিল কি-না।

অনেকে দাবি করেছেন, মার্কিন নৌবাহিনী ভারতকে বিব্রত করে একতরফা পদক্ষেপ নেওয়ার এটাই প্রথম ঘটনা নয়। সমালোচকরা উল্লেখ করেছেন যে, ২০২১ সালে মার্কিন নৌবাহিনী লাক্ষাদ্বীপের আশেপাশে একটি সামরিক মহড়া পরিচালনা করেছিল। জাতিসংঘের সমুদ্র আইন সংক্রান্ত কনভেনশন অনুযায়ী, কারও অর্থনৈতিক অঞ্চলে মহড়া চালাতে হলে সে দেশের অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র অনুমতি নেয়নি।

এরমাধ্যমে ওয়াশিংটন ভারত ও জাতিসংঘের কনভেশনের লঙ্ঘন করে। এই লঙ্ঘনের পরও দেশটি তখন পার পেয়ে গেছে। তবে জাতিসংঘের ওই কনভেশনে যুক্তরাষ্ট্র সই করেনি, ভারত সই করেছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ন্যাশনাল হেরাল্ড থেকে অনূদিত

    শেয়ার করুন: