ইরান যুদ্ধ যেভাবে বিশ্বে প্রভাব ফেলছে

মোটরসাইকেলে তেল নেওয়ার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা। ছবি: সংগৃহীত
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার দুই সপ্তাহ পার হতে চলল। এরমধ্যেই এ যুদ্ধের পরিণতি বিশ্বজুড়ে অনুভূত হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি ইরানে হামলার লক্ষ্যগুলোর মধ্যে অন্যতম কয়েকটি হচ্ছে— তার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ ধ্বংস করা, শক্তিশালী নৌবাহিনী গঠন ঠেকানো এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে দেশটিকে দূরে রাখা। এই হামলা এখন আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে ফেলেছে হুমকির মুখে।
বিধ্বংসী বিমান হামলা সত্ত্বেও ইরানি শাসনব্যবস্থা এখনো বহাল রয়েছে। এই অবস্থায় নতুন এবং বিপজ্জনক উপায়ে দেশটির ওপর আক্রমণ চলছে।
একসময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যাকে ‘স্বল্পমেয়াদি অভিযান’ বলে বর্ণনা করেছিলেন, সেই অভিযানের প্রভাবে এখন কাঁপছে মধ্যপ্রাচ্য, এমনকি পুরো বিশ্ব।
অস্থির মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শক্তি ইরান
ইরান বিশেষ ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এটি তার প্রতিবেশী ইরাক ও আফগানিস্তানের চেয়ে অনেক বড়। এই দুই দেশেই মার্কিন হস্তক্ষেপ ছিল জটিল, যা বহু বছর ধরে চলে।
ইরানের সামরিক সম্পদের কিছু অংশ, বিশেষ করে পারমাণবিক কর্মসূচি বিশাল দেশেটির বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে আছে। অনেক ক্ষেত্রে পাহাড়ের গভীরে তৈরি বাংকারের ভেতরে লুকানো রয়েছে পারমাণবিক কাঠামোগুলো।
৯ কোটিরও বেশি মানুষের এই দেশের জনসংখ্যা বৈচিত্র্যময়। এর প্রায় অর্ধেক পার্সিয়ান হলেও এখানে বহু সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠী রয়েছে, যেমন— আজারবাইজানীয়, কুর্দি এবং আরব।
১৯৭৯ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থা পৌঁছে গেছে রাষ্ট্রের গভীরে। এই শাসনব্যবস্থা গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত, আদর্শগতভাবে প্রভাবিত এবং সুসংগঠিত।
২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক হামলার পরও দেশটি টিকে আছে সগৌরবে। শুধু তাই নয়, তেহরান সম্প্রতি জনসাধারণের বিক্ষোভ দমন করেছে কঠোর হাতে। এর মাধ্যমে দেশটির শক্তিমত্তা ফুটে ওঠে।
সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে পুরো অঞ্চলে
যুদ্ধ শুরু হয় ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ওপর বড় ধরনের হামলার মাধ্যমে। উপসাগরীয় অঞ্চলের আশপাশে ইরানের ডজনখানেক জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া হয়। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং সরকারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব প্রথম দিনেই নিহত হন।
এরপর সংঘাত দ্রুত বেড়ে যায়। ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে ইসরায়েল এবং পুরো অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালায়। উপসাগরীয় দেশগুলো, যারা সংঘাতের বাইরে থাকতে চেয়েছিল, তারাও হামলার ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়।
লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে দীর্ঘদিনের সংঘাত আবার শুরু হয়। হিজবুল্লাহ ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র। এতে ২০২৪ সালের নভেম্বরে হওয়া যুদ্ধবিরতি ভেঙে যায়।
সংঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। কয়েক দিনের মধ্যেই সাইপ্রাসের আক্রোতিরি এলাকায় থাকা ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ার ফোর্স ঘাঁটি আক্রমণের শিকার হয়। শ্রীলঙ্কার উপকূলে একটি ইরানি জাহাজ মার্কিন সাবমেরিন ডুবিয়ে দেয়। তুরস্কের দিকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয় এবং আজারবাইজানে ড্রোন হামলা চালানো হয়।
জাতিসংঘের জরুরি ত্রাণ সমন্বয়কারী টম ফ্লেচার বলেছেন, যুদ্ধ কখনো নির্দিষ্ট সীমান্তের ভেতরে আটকে থাকে না।
আশার জায়গা দখল করে নিয়েছে আতঙ্ক ও ভয়
জানুয়ারিতে সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে বিক্ষোভকারীদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চলার সময় ইরানের মানুষ ট্রাম্পকে বলতে শুনেছিল যে, সহায়তা আসছে।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যখন সেই সহায়তা সত্যিই এলো তখন কিছু মানুষ উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন। তাদের আশা ছিল, এই বুঝি দীর্ঘদিনের অপেক্ষা ফুরালো। ভিডিওতে দেখা যায়, সর্বোচ্চ নেতা খামেনি নিহত হওয়ার খবর পেয়ে কিছু ইরানি উদ্যাপন করছেন।
কিন্তু বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় সেই আশা এখন বদলে যায় ভয় ও আতঙ্কে। মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলায় অন্তত ১৬০ জন নিহত হয়, যাদের অনেকেই শিশু। এছাড়া এমন আরো বহু বেসামরিক স্থাপনায় চালানো হয়েছে হামলা।
জাতিসংঘ বলছে, এখন পর্যন্ত প্রায় ৩২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ইরানের অনেক মানুষ এবং দীর্ঘদিন ধরে সেখানে থাকা আফগান শরণার্থীরাও শহর ছেড়ে গ্রামাঞ্চলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। দক্ষিণ লেবাননেও ইসরায়েলের হুমকির কারণে অন্তত ৮ লাখ বেসামরিক মানুষকে স্থানান্তরিত হতে হয়েছে।
যারা এই যুদ্ধ শুরু করেছে তাদের জন্যও এটি কষ্টদায়ক হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন সেনা হারিয়েছে। ইসরায়েলে মারা গেছেন বেসামরিক মানুষও। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে প্রতিদিনই ঘটছে হতাহতের ঘটনা।
ইরানের কারাজের এক নারী বাসিন্দা দুঃখ করে বলেছেন, এত ভোগান্তি ও ধ্বংসের মধ্যেও সবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয় হলো— ইরানের ধর্মীয় নেতা এবং ইসলামী শাসনব্যবস্থা টিকে থাকছে।
ড্রোন এবং স্বল্প প্রযুক্তির অস্ত্রের কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে মার্কিন শক্তি
ইরানে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরেই সৈন্য সমাবেশ করছিল। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর এটিই সবচেয়ে বড় সৈন্য সমাবেশ। এতে দুটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ এবং বিপুলসংখ্যক যুদ্ধবিমান অন্তর্ভুক্ত। তবে এগুলোতে হামলা করা হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরান।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রায় সব ধরনের অস্ত্রই রয়েছে। তারা দূর থেকে বিপুলসংখ্যক নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অক্ষম ও ধ্বংস করতে পারে। এরপর তারা প্রায় অফুরন্ত পরিমাণ বোমা দিয়ে আক্রমণ চালিয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে ইরানের কাছেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন রয়েছে। তবে সেগুলোর মজুদ ধীরে ধীরে কমে আসছে। হয়তো তারা কিছু অস্ত্র এখনো সংরক্ষণ করে রেখেছে, কিন্তু দুই সপ্তাহ পর দেখা যাচ্ছে তারা আগের তুলনায় এসব অস্ত্র কম ব্যবহার করছে।
তবুও তাদের হাতে এখনো কিছু কৌশল বাকি আছে। সম্প্রতি সমুদ্রে ট্যাংকার জাহাজগুলোর ওপর অজানা প্রজেক্টাইল ও নৌবাহিনীর সুইসাইড ড্রোন ব্যবহার করে যে ধারাবাহিক হামলা হয়েছে— এগুলো তারই প্রমাণ। এই ধরনের আক্রমণ শনাক্ত করা ও ধ্বংস করা তুলনামূলক কঠিন। এগুলো এই সংঘাতকে আরও কিছু সময় দীর্ঘায়িত করতে পারে।
চোখ রাঙাচ্ছে জ্বালানি সংকট
এই যুদ্ধ বৈশ্বিক অর্থনীতিকে এমনভাবে ধাক্কা দিয়েছে যা হোয়াইট হাউস সম্ভবত আগে কল্পনাও করেনি। হরমুজ প্রণালী প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এটি একটি সরু জলপথ, যার মাধ্যমে বিশ্বের প্রায় ২০% তেল পরিবহন হয়।
সৌদি আরব থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত একটি পাইপলাইন অথবা সংযুক্ত আরব আমিরাত হয়ে ওমান উপসাগর পর্যন্ত একটি কৃত্রিম খাল এই সংকটের সমাধান করতে পারে। এসব প্রকল্প যদিও সময়সাপেক্ষ বিষয়। কিন্তু এরমধ্যে তেল ও গ্যাস সরবরাহের কারণে বিঘ্ন সারা বিশ্বে হাহাকার লেগে গেছে।
আসলে বৈশ্বিক অর্থনীতির এমন কোনো খাত—বিমান চলাচল থেকে কৃষি, প্লাস্টিকশিল্প থেকে জাহাজ চলাচল— খুঁজে পাওয়া কঠিন, যেখানে এই সংকটের প্রভাব পড়েনি।
ফিলিপাইনের কিছু কর্মকর্তা জ্বালানি খরচ বাঁচাতে সপ্তাহে চার দিন কাজ করছেন। থাইল্যান্ডের সরকারি দপ্তরে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য এয়ার কন্ডিশনারের তাপমাত্রা ২৬ সেলসিয়াসে রাখা হচ্ছে। আর মিয়ানমারের সামরিক সরকার বলেছে, ব্যক্তিগত গাড়ি একদিন পরপর চালানো যাবে।
যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের সরকারগুলো বলেছে, তারা অতিরিক্ত দাম বাড়ানোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে, কারণ আশঙ্কা করা হচ্ছে যে জ্বালানি কোম্পানিগুলো এই সংকট থেকে লাভ করার চেষ্টা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রেও পেট্রলের দাম দ্রুত বাড়ছে, যদিও ট্রাম্প দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
ভ্রমণ ও পর্যটন খাতও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। বিশেষ করে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বৈশ্বিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর যেখানে ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে প্রতিদিন প্রায় আড়াই লাখ যাত্রী যাতায়াত করত, সেখানে একাধিকবার ইরানি ড্রোন হামলা হয়েছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে হাজার হাজার পর্যটক ও বাসিন্দা সেখান থেকে পালিয়ে গেছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরানের ছোড়া প্রজেক্টাইল ও দ্রুতগামী নৌকার আঘাতে বেশ কয়েকটি ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সামরিক শক্তির মুখে ইরান স্পষ্টতই সহজ, তুলনামূলক সস্তা কিন্তু অত্যন্ত বিঘ্ন সৃষ্টিকারী উপায়ে পাল্টা আঘাত করার কৌশল বেছে নিয়েছে।
মার্কিন মিত্ররা হতবাক
এটি এমন এক যুদ্ধ, যা কেবল দুই দেশই চেয়েছিল। সেগুলো হলো— যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।
তারা কখনো বলেছে, ইরানের সরকারের পতন ঘটাতে চায়। কখনো বলেছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করতে চায়। আবার কখনো বলেছে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করতে চায়। কিন্তু এই যুদ্ধের মাধ্যমে যে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে বা হচ্ছে সে সম্পর্কে তাদের কোনো উদ্বেগ নেই।
সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ ওয়াশিংটনের উপসাগরীয় মিত্রদের জন্য এই যুদ্ধ একটি বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে এসেছে। তারা অধিকাংশ সময় ইরানকে সন্দেহ ও কিছুটা ভয়ের চোখে দেখে, কিন্তু তাদের প্রতিবেশীর সঙ্গে বসবাসের কিছু উপায় খুঁজে পেয়েছে। তারা ইরানের ক্ষমতা সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন। কিন্তু শক্তি ব্যবহার করার পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজতে চায় দেশগুলো।
ওমান মনে করেছিল যে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চুক্তি করার পথে আছে। হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে, সংঘাত এড়ানোর জন্য ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কিন টেলিভিশনে বলেছিলেন যে, চুক্তি আমাদের নাগালের মধ্যে।
অন্যদিকে ইউরোপে মার্কিন মিত্ররাও দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগছে। কেউই সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন দেওয়ার সাহস করছে না। এরমধ্যে সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে রয়েছে যুক্তরাজ্য। দেশটিকে যুদ্ধ থেকে দূরে থাকতে চাওয়া এবং যুক্তরাজ্যের স্বার্থ ও মিত্রদের রক্ষা করার মধ্যে সূক্ষ্ম সমতা বজায় রাখতে কঠোর পরিশ্রম করছে।
লাভ গুনছে রাশিয়া, বিপদে চীন
তেহরানের মিত্রদের মধ্যে মস্কো হয়তো ইরানের সৃষ্ট ক্ষতি নিয়ে আফসোস করছে। তবে তেল থেকে অপ্রত্যাশিত আয় মস্কোকে ইউক্রেনে চলমান তার ব্যয়বহুল যুদ্ধে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে।
চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইরানি তেল আমদানিকারক। তাকে এখন তেলের বিকল্প উৎসব খুঁজতে হবে।
লেখক : পল অ্যাডামস, বিবিসির কূটনৈতিক সংবাদদাতা। বিবিসি থেকে অনূদিত

