মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানি হামলায় ক্ষতির পরিমাণ কত?

মধ্যপ্রাচ্যে একটি মার্কিন ঘাঁটির স্যাটেলাইট চিত্র। ছবি: সংগৃহীত
ইরানে ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এরপর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা ওয়াশিংটনের ঘাঁটিতে হামলা চালাচ্ছে ইরান।
এতে ব্যবহার করা হচ্ছে সস্তা ড্রোন ও অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র। যেগুলো মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ফাঁক গলে আঘাত হানছে লক্ষ্যবস্তুতে।
ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা প্রায় সব মার্কিন ঘাঁটিই ইরানি হামলায় কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেই ক্ষতির পরিমাণ কত তার একটি হিসাব হাজির করেছে নতুন একটি গবেষণা।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) রিপোর্ট এবং বিবিসির পর্যালোচনা অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত সামরিক ঘাঁটিগুলোর ওপর ইরানের হামলায় যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহেই প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এই ক্ষতির বেশিরভাগই হয়েছে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রথম সপ্তাহে ইরানের প্রাথমিক পাল্টা হামলাগুলোতে।
তবে এই হিসাব শুধু মার্কিন ঘাঁটিতে যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তার। এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ বা স্থাপনাগুলোর ওপর ইরানের হামলায় কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এ পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি ইঙ্গিত দিচ্ছে সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তা কতটা ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।
সিএসআইএসের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা এবং এই গবেষণা প্রতিবেদনের সহ-লেখক মার্ক ক্যানসিয়ান বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোর ক্ষয়ক্ষতি প্রতিবেদনে যথাযথভাবে তুলে ধরা যায়নি।
‘যদিও এ গবেষণায় অনেক তথ্য উঠে এসেছে বলে মনে হচ্ছে। তবে আরও তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানা যাবে না’, যোগ করেন তিনি।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের কাছে। তারা এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) সঙ্গে যোগাযোগের জন্য পরামর্শ দেয়, যারা এই যুদ্ধ পরিচালনা করছে। তবে সেন্টকমের কর্মকর্তারা মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
ইরানের পাল্টা হামলাগুলো মূলত জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের বিমান প্রতিরক্ষা ও স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন স্থাপনাকে লক্ষ্য করে চালানো হয়।
ক্ষয়ক্ষতির একটি বড় অংশ হয়েছে জর্ডানের একটি বিমানঘাঁটিতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার রাডারের ওপর হামলার ফলে।
এএন/টিওয়াপি-২ রাডার সিস্টেমের মূল্য প্রতিরক্ষা দপ্তরের বাজেট সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রায় ৪৮৫ মিলিয়ন ডলার। এই ধরনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে ব্যবহৃত হয়।
ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি এবং এ অঞ্চলে আমেরিকান বাহিনীর ব্যবহার করা সামরিক ঘাঁটিতে থাকা ভবন, স্থাপনা এবং অন্যান্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে আনুমানিক আরও ৩১০ মিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
বিবিসি ভেরিফাইয়ের স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান কমপক্ষে তিনটি বিমানঘাঁটিতে একাধিকবার হামলা চালিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়া তেহরানকে এ অঞ্চলের আমেরিকান সামরিক বাহিনীর তথ্য সরবরাহ করেছে।
স্যাটেলাইট চিত্রে কুয়েতের আলি আল-সালিম ঘাঁটি, কাতারের আল-উদেইদ এবং সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান— এই তিন বিমান ঘাঁটিতে যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে নতুন নতুন ক্ষয়ক্ষতি দেখা গেছে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ সেনা নিহত হন। এরমধ্যে ছয়জন কুয়েতে, একজন সৌদি আরবে এবং বাকি ছয়জন নিহত হন ইরাকে। এছাড়া অন্তত ১৬টির মতো সামরিক বিমান ও ড্রোন হারিয়েছে ওয়াশিংটন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ জানায়, এ যুদ্ধে এ পর্যন্ত তিন হাজার দুইশর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এরমধ্যে এক হাজার চারশজন বেসামরিক নাগরিক।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তার লক্ষ্য অর্জনের পথে আছে—যা হলো ইরানের পারমাণবিক প্রোগ্রাম ধ্বংস করা, এর প্রচলিত সামরিক ক্ষমতা কমানো, এবং এ অঞ্চলে তার প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সরকারের সমর্থন বন্ধ করা।
গতকাল শুক্রবার হোয়াইট হাউসের এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেছেন, আমরা ইরানে অত্যন্ত ভালো কাজ করছি।
তবে জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকা এবং যুদ্ধ কতদিন স্থায়ী হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে ইতোমধ্যে বিশ্ব অর্থনীতি অস্থির হয়ে উঠেছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বড় কিছু সংস্থার পক্ষ থেকে স্যাটেলাইট চিত্র প্রকাশের ওপর আরোপিত সীমাবদ্ধতার কারণে সেগুলো বিশ্লেষণ কঠিন হয়ে পড়েছে। তবুও, এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্বার্থে ইরানের পাল্টা হামলার কিছু নমুনা বোঝা সম্ভব।
যখন ইরান বাহরাইনের মার্কিন নৌঘাঁটিতে প্রথম হামলা চালাল তখন থেকেই রাডার এবং স্যাটেলাইট ব্যবস্থা ছিল তাদের অন্যতম লক্ষ্যবস্তু। এগুলো আধুনিক সামরিক অভিযানের চোখ ও কান হিসেবে কাজ করে।
স্যাটেলাইট চিত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে দেখা গেছে দুটি রেডোমের ধ্বংস হয়ে গেছে, যা সংবেদনশীল সরঞ্জামের জন্য রক্ষাকারী খোলস হিসেবে থাকে। এই সরঞ্জামগুলোর ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি, যদিও ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা সম্ভব নয়।
কুয়েতের মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ক্যাম্প আরিফজান এবং সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান এয়ার বেসে রাডার সাইটগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান এয়ার বেসের স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, থাড বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি রাডারের অংশ থেকে ধোঁয়া উঠছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং জর্ডানের মার্কিন ঘাঁটিতেও থাড ব্যবস্থার ক্ষয়ক্ষতির চিত্র স্পষ্ট। সেই ক্ষতি পরিমাণ কত তা এখনো অজানা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সিস্টেমগুলোর কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়া থেকে থাড সিস্টেম মধ্যপ্রাচ্যে পুনঃস্থাপন করতে বাধ্য হয়েছে।
যদিও ইরানের পাল্টা হামলার কারণে সৃষ্ট ক্ষতি যুদ্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মোট ব্যয়ের কেবল একটি অংশ মাত্র।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিরক্ষা দপ্তরের কর্মকর্তারা কংগ্রেসের সদস্যদের ব্রিফ করেছেন যে, যুদ্ধের প্রথম ছয় দিনে খরচ হয়েছে ১১.৩ বিলিয়ন ডলার।
সিএসআইএসের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ১২ দিনে খরচ হয়েছে ১৬.৫ বিলিয়ন ডলার।
এদিকে পেন্টাগন যুদ্ধের জন্য আরও ২০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল চাইছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথ বৃহস্পতিবার বলেছেন, এই পরিমাণ পরিবর্তিত হতে পারে।
‘খারাপ লোকদের মারার জন্য অর্থ লাগে,’ যোগ করেন তিনি।

