ইরান যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতির কতটা ক্ষতি করছে?

জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক এয়ারলাইন্স টিকিটের মূল্য বাড়িয়েছে। ছবি: সংগৃহীত
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ যুদ্ধ এবং উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে তেহরানের প্রতিশোধমূলক হামলা বিশ্বব্যাপী আর্থিক ও জ্বালানি বাজারকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। যার ফলে ঘনীভূত হচ্ছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট। এমনকি মন্দাও দেখা দিতে পারে— এমন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
জ্বালানির দাম বাড়ছে হু হু করে
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের উপর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে তেহরান উপসাগরীয় অঞ্চল জুড়ে ইসরায়েল, মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, তেল ডিপো এবং অন্যান্য অবকাঠামো লক্ষ্য করে একের পর এক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী বেশ কয়েকটি জাহাজের উপর ইরানি হামলা এই সংকীর্ণ জলপথে জাহাজ চলাচল নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দিয়েছে। এই পথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ হয়। বৃহস্পতিবার ইরান ইরাকি জলসীমায় জ্বালানি ট্যাঙ্কারেও হামলা চালিয়েছে।
এই সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবে তেলের দাম এখন আকাশচুম্বী। মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত এই শিল্পের মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেল প্রতি ১০৩ ডলার, যা ২৭ ফেব্রুয়ারির ব্যারেল প্রতি ৭২ ডলার থেকে ৪০ শতাংশেরও বেশি।
কেপলারের ক্রুড অয়েলবিষয়ক সিনিয়র বিশ্লেষক মুয়ু শু-এর মতে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দামও প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
একটি ইরানি ড্রোন হামলার জেরে ২ মার্চ কাতারএনার্জি তাদের এলএনজি উৎপাদন স্থগিত করে। এই সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক এলএনজি বাজারে চাপ সৃষ্টি করেছে। বিশ্বের মোট এলএনজির ২০ শতাংশ সরবরাহ করে কাতার।
বিশ্লেষক মুয়ু বলেছেন, পেট্রোল থেকে শুরু করে জেট কেরোসিন ও ফুয়েল অয়েল পর্যন্ত পরিশোধিত পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ থাকলে এই দাম বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে।
এতে এশিয়ার দেশগুলোই বেশি বিপদে পড়বে বলে মত এই গবেষকের। তার মতে, মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে অপরিশোধিত তেল এবং পরিশোধিত পণ্য ক্রেতাদের কাছে পৌঁছাতে না পারায় বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলো, উচ্চমূল্যে বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করতে এবং মজুত ও চাহিদা ব্যবস্থাপনার জন্য জরুরি ব্যবস্থা নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
ইউএস এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এই প্রণালী দিয়ে পরিবহন করা অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮৪ শতাংশ এবং এলএনজির ৮৩ শতাংশ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছিল।
সংস্থাটির মতে, এই তেল চালানের প্রায় ৭০ শতাংশ চীন, ভারত, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মাধ্যমে এবং প্রায় ১৫ শতাংশ এশিয়ার বাকি দেশগুলোর জন্য পাঠানো হয়।
মার্চে ইউরোপজুড়ে প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য ডাচ টিটিএফ ফিউচারসের বেঞ্চমার্ক মূল্য ৬০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, যদি সংঘাত স্বল্পস্থায়ী হয় এবং উপসাগরীয় দেশগুলিতে ও হরমুজ প্রণালীতে ইরানের হামলা বন্ধ হয়ে যায়, তবে তেল এবং এলএনজির দাম ব্যাপকভাবে কমে আসবে এবং বছরের শেষ নাগাদ ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ৬৫ ডলারে পৌঁছাবে।
কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে সে বিষয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে সংঘাত চলাকালীন তেলের দাম আরও বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১৩০ ডলারে পৌঁছাবে।
অর্থনীতিবিদরা পূর্বাভাসে আরও বলেছেন, সংঘাত তিন মাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও আগামী ছয় মাস বা তার বেশি সময়ের মধ্যে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম গড়ে ১৫০ ডলারে পৌঁছাতে পারে।
কমছে উৎপাদন
জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোর আমদানি খরচ বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশগুলোর অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতাও কমতে শুরু করেছে।
প্রায় ১৫০টি দেশের খুচরা জ্বালানির মূল্য পর্যবেক্ষণ ও প্রকাশকারী একটি ডেটা প্ল্যাটফর্ম ‘গ্লোবাল পেট্রোল প্রাইসেস’-এর বিশ্লেষণ করা তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে অন্তত ৯৫টি দেশে পেট্রোলের দাম বেড়েছে। কিছু দেশ শুধু প্রতি মাসের শেষে মূল্য পরিবর্তনের ঘোষণা দেয়, তাই এপ্রিলে আরও অনেক দেশে দাম বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত, কম্বোডিয়ায় পেট্রোলের দাম সর্বোচ্চ প্রায় ৬৮ শতাংশ বেড়েছে। এর পরেই রয়েছে ভিয়েতনাম, সেখানে দাম ৫০ শতাংশ বেড়েছে, তারপর নাইজেরিয়ায় ৩৫ শতাংশ, লাওসে ৩৩ শতাংশ এবং কানাডায় ২৮ শতাংশ।
এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে সরকারগুলো জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে।
পাকিস্তান সরকারি কর্মচারীদের জন্য চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করেছে, যেখানে ৫০ শতাংশ কর্মী পালাক্রমে বাড়ি থেকে কাজ করছেন। ফিলিপাইনের সরকারি দপ্তরগুলোও চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করেছে। থাইল্যান্ড সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য বাড়ি থেকে কাজ করা বাধ্যতামূলক করেছে। শ্রীলঙ্কাও দেশটির সাপ্তাহিক ছুটি বাড়িয়ে তিনদিন করেছে।
মিয়ানমারের সরকার এমন একটি নিয়ম চালু করেছে, যার অধীনে গাড়িগুলো কেবল একদিন পর পর চালানো যাবে। শ্রীলঙ্কায়, গাড়ির মালিকদের জ্বালানি কেনার জন্য অনলাইনে নিবন্ধন করতে হবে, তারপর পাম্পে পেট্রোল বা ডিজেল কেনার জন্য একটি কিউআর কোড ব্যবহার করতে হবে। এই পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো স্বতন্ত্র ভোক্তা কী পরিমাণ কেনাকাটা করবে তা নিয়ন্ত্রণ করা।
অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, এই সবকিছু অর্থনীতির উৎপাদনশীলতাকে প্রভাবিত করে। এর কারণে পণ্য উৎপাদন কমে যায়। যার ফলে অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হয়।
তবে অর্থনীতিবিদরা একটি ভয়াবহ আশঙ্কার খবর দিয়েছেন। তারা বলছেন, ‘এ সংকট তো সবে শুরু।’
এদিকে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার পর শিপিং কোম্পানিগুলো হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের সামুদ্রিক তেল বাণিজ্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশ সম্পন্ন হয়।
মুয়ু উল্লেখ করেছেন যে, জাহাজের মালিকরাও নতুন অর্ডার নিতে দ্বিধা করছেন। কারণ জাহাজের ভাড়া প্রতিদিন নতুন উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছে। তারা আশঙ্কা করছেন, ক্রমবর্ধমান জ্বালানি খরচ মেটানোর জন্য তাদের প্রাপ্ত মালবাহী ভাড়া যথেষ্ট নাও হতে পারে।
‘হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকার অর্থনৈতিক প্রভাব সবেমাত্র দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। আগামী সপ্তাহগুলোতে আমরা জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, চাহিদা হ্রাস এবং অবশেষে মুদ্রাস্ফীতির মতো সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকগুলোতে এর প্রভাব পড়ার আরও প্রমাণ দেখতে পাব’, সতর্ক করেন তিনি।
বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে পতন
ব্লুমবার্গ নিউজ রবিবারের এক প্রতিবেদনে জানায়, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে সূচক ৫.৫ শতাংশ কমেছে। এর মধ্যে এশিয়ার শেয়ারবাজারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে সোমবার সকাল পর্যন্ত সার্বিক সূচক ২৭ ফেব্রুয়ারির তুলনায় ৬ শতাংশ, ন্যাসডাক শেয়ারবাজারে ২.৪ শতাংশ, সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জে সোমবার পর্যন্ত ১.৮৬ শতাংশ কমেছে, টোকিও স্টক এক্সচেঞ্জে ১১ শতাংশ, ভারতের জাতীয় শেয়ারবাজারে ৭ শতাংশ, হংকং শেয়ারবাজারের প্রায় ৪ শতাংশ, সৌদি শেয়ারবাজারের ৯.৬ শতাংশ এবং ইউরোপীয় শেয়ারবাজারের সূচক ৬ শতাংশ কমেছে।
মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোব্যাল অ্যাফেয়ার্সের জ্যেষ্ঠ গবেষক ফ্রেডেরিক স্নাইডার বলেছেন, এশিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলের শেয়ারবাজার যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বেশি কমেছে, কারণ তারা জ্বালানির ওপর বেশি নির্ভরশীল। এছাড়াও এটি দেখায় যে যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের প্রধান বাজার হিসেবে কাজ করছে। যুদ্ধের কারণে লাভবান অনেক বড় কোম্পানিই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক।
‘অন্যদিকে, রাশিয়ার শেয়ারবাজার উর্ধ্বমুখী রয়েছে, কারণ রাশিয়া বড় তেল ও গ্যাস সরবরাহকারী দেশ। ফলে এই যুদ্ধ থেকে দেশটি লাভবান হতে পারে’, যোগ করে তিনি।
মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা
গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা সতর্ক করে বলেছেন, যদি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে এটি বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি করবে।
ইতিহাস বলছে, তেলের দামের হঠাৎ বৃদ্ধি প্রায়ই স্ট্যাগফ্লেশন সৃষ্টি করে—অর্থাৎ একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি বাড়ে এবং বেকারত্বও বৃদ্ধি পায়। অর্থনীতিবিদরা ১৯৭৩, ১৯৭৮ এবং ২০০৮ সালের সংকটের উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, তেলের দামে বড় ধরনের উল্লম্ফনের পর প্রায় সব সময়ই কোনো না কোনোভাবে বিশ্বব্যাপী মন্দা দেখা দিয়েছে।
ঋণে জর্জরিত উন্নয়নশীল দেশগুলো এই অবস্থায় সংকটে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে মত স্নাইডারের। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, যদি উন্নত দেশগুলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়ায় তাহলে যেসব উন্নয়নশীল দেশ ইতিমধ্যেই ঋণে জর্জরিত তারা বড় ধরনের ঋণ সংকটে পড়তে পারে।
তবে তিনি উল্লেখ করেছেন, চীন এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব থেকে তুলনামূলকভাবে বেশি সুরক্ষিত। কারণ গত কয়েক বছরে দেশটি বড় পরিসরে জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য এনেছে। দেশটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পারমাণবিক শক্তি ও কয়লায় ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে এবং কৌশলগত মজুত গড়ে তুলেছে।
এই গবেষক জোর দিয়ে বলেছেন, চীন নিজের সরবরাহ ব্যবস্থার অনেকটাই দেশের ভেতরেই গড়ে তুলেছে, ফলে তাদের উৎপাদনে বিঘ্ন কম ঘটে।
‘তবে রপ্তানিনির্ভর দেশ হওয়ায়, বিশ্ব অর্থনীতি দুর্বল হলে চীনের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে’, যোগ করেন তিনি।
ইউরোপেও ইতোমধ্যে যুদ্ধের ধাক্কা লেগেছে বলে মনে করছেন তিনি। তার মতে, ইউরোপ ইতিমধ্যেই এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব টের পাচ্ছে। কারণ নর্ড স্ট্রিম গ্যাস পাইপলাইনে হামলা এবং রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার ফলে ইউরোপ আগে থেকেই রাশিয়ার তেল-গ্যাস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
স্নাইডার বলেছেন, উচ্চ জ্বালানি খরচের কারণে ইউরোপের শিল্পখাত আগেই চাপে ছিল। আর এই যুদ্ধ সেই চাপকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিষয়ে এই গবেষক জানাচ্ছেন, দেশটি জ্বালানির দিক থেকে স্বনির্ভর হলেও জ্বালানি তেলের দাম জনগণের অসন্তোষের বড় কারণ। খাদ্যের দামের মতোই, এসব দাম অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল জনগোষ্ঠীর ওপর বেশি প্রভাব ফেলে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকরাও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, কারণ জ্বালানি ও সারের দামের পেছনে তাদের অনেক অর্থ খরচ হয়ে যাচ্ছে। তারা আগেই শুল্ক যুদ্ধের কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন।
এছাড়াও, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাও চাপের মধ্যে রয়েছে। সব মিলিয়ে, এসব বিষয় এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন দেশটিতে মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে।
জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার
ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে যে, যদি যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শেষ হয়, তাহলে উপসাগরীয় অর্থনীতি ছাড়া অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রে জিডিপি, মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রানীতির ওপর প্রভাব সীমিত থাকবে।
তবে যদি যুদ্ধ কয়েক মাস ধরে চলতে থাকে, অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, তখন এর প্রভাব আরও গুরুতর হবে। তাদের মতে, বছরের দ্বিতীয়ার্ধে ইউরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে প্রায় ০.৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। অন্যদিকে, চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ৩ শতাংশের নিচে নেমে যেতে পারে।
অর্থনীতিবিদরা পূর্বাভাস দিয়েছেন যে, ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য দেশের তুলনায় ভালো করবে এবং প্রায় ২.২৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে।
তারা আরও বলছেন, ইউরো অঞ্চলে মূল্যস্ফীতি ৪ শতাংশের বেশি, যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৩ শতাংশ এবং জাপানে প্রায় ২.৫ শতাংশ হতে পারে। এর কারণে ব্যাংক সুদের হার বাড়াতে পারে ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংক এবং জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের নীতি কঠোর করতে পারে।
ভ্রমণ ও বিমান চলাচলের ওপর প্রভাব
যুদ্ধ কেবল তেলের দাম বাড়িয়েছে তাই নয়, এটি বিশ্বব্যাপী বিমান চলাচলের ওপরও প্রভাব ফেলেছে। ফলে কিছু রুটে বিমান ভাড়া আকাশছোঁয়া হয়ে গেছে।
সংঘাত শুরু হওয়ার দুই সপ্তাহের বেশি সময় অতিক্রান্ত হলেও উপসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে বড় এয়ারলাইন্সগুলো এখনও যুদ্ধ পূর্ববর্তী ফ্লাইট সংখ্যায় ফিরতে পারছে না। আকাশপথগুলো বন্ধ বা বড় ধরনের সীমাবদ্ধতার মধ্যে চলছে, সাথে মিসাইল ও ড্রোন হামলার হুমকি তো আছেই।
কিন্তু শুধু এই অঞ্চলের এয়ারলাইন্স নয়, অন্যান্য দেশের এয়ারলাইন্সও বেকায়দায় পড়েছে। ফলে তারা বাড়িয়ে দিয়েছে টিকিটের দাম। এরমধ্যে রয়েছে— অস্ট্রেলিয়ার কান্টাস এয়ারওয়েজ, স্ক্যান্ডিনেভিয়ার এসএএস, নিউজিল্যান্ডের এয়ার নিউ জিল্যান্ড এবং ভারতের ইন্ডিগো ও এয়ার ইন্ডিয়া।
সংস্থাগুলো জানায়, যুদ্ধের কারণে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে তারা টিকিটের দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে।
নিউজিল্যান্ডের জাতীয় এয়ারলাইন্সের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে জেট ফুয়েলের দাম প্রতি ব্যারেল ৮৫–৯০ ডলার ছিল, এখন তা বেড়ে ১৫০–২০০ ডলারের মধ্যে পৌঁছেছে।
কয়েকটি এশীয় ও ইউরোপীয় এয়ারলাইন্স, যেমন লুফথানসা ও রায়ানএয়ার, ইতিমধ্যেই তেলের হেজিং ব্যবস্থা করেছে। অর্থাৎ তারা ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট দামে তেল কেনা বা বিক্রি নিশ্চিত করেছে, যাতে দাম ওঠানামা কম প্রভাব ফেলে।
এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া থেকে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লাইটগুলোও উপসাগরীয় আকাশপথ এড়িয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে বাধ্য হচ্ছে। এতে বিমান ভাড়া আরও বেড়েছে।
স্নাইডার উল্লেখ করেন, ভিন্নপথে ফ্লাইট পরিচালনা করা ইউরোপীয় এয়ারলাইন্সের জন্য ভালো খবর নয়। কারণ তারা ইতিমধ্যেই রাশিয়ার আকাশপথ থেকে বিচ্ছিন্ন, ফলে এশিয়ার ফ্লাইটগুলো আরও দীর্ঘ এবং ব্যয়বহুল হয়ে যাচ্ছে।
‘এই সংকট বছরের বাকি সময়েও প্রভাব ফেলতে পারে, যার ফলে পর্যটন খাত দুর্বল হবে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে’, যোগ করেন তিনি।
*আলজাজিরা থেকে অনূদিত

