লটারি নয় পরীক্ষা—শৈশবের দরজায় নতুন প্রতিযোগিতা

স্কুলে ভর্তি মানে একসময় ছিল নতুন খাতা, নতুন বন্ধু আর অজানা এক আনন্দের শুরু। কিন্তু সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে সেই দরজায় আবার ফিরে এল প্রতিযোগিতার ছায়া। শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রথম থেকে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হবে পরীক্ষার মাধ্যমে। কয়েক বছর ধরে চালু থাকা লটারি পদ্ধতি বাতিল করা হয়েছে।
নীতিনির্ধারকদের যুক্তি স্পষ্ট। লটারি কোনো শিক্ষাব্যবস্থার আদর্শ পদ্ধতি নয়। এতে শিক্ষার্থীর মেধা বা প্রস্তুতির মূল্যায়ন করা যায় না। তাই তারা মনে করছেন, সহজ ও শিশুবান্ধব ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হলে অন্তত একটি মৌলিক যাচাইয়ের সুযোগ থাকবে। শিক্ষামন্ত্রীও বলেছেন, প্রথম শ্রেণির শিশুদের নিউরোসার্জন বানানোর মতো কঠিন পরীক্ষা নেওয়ার পরিকল্পনা নেই। পরীক্ষাটি হবে প্রাথমিক স্তরের, যাতে শিশুদের ওপর বাড়তি মানসিক চাপ না পড়ে।
কাগজে-কলমে যুক্তিগুলো যুক্তিসঙ্গত মনে হতে পারে। সত্যিই তো, লটারি পদ্ধতিতে অনেক সময় দেখা যায় প্রস্তুত ও আগ্রহী শিক্ষার্থী সুযোগ পায় না, আবার কেউ কেউ কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই কেবল ভাগ্যের জোরে কাঙ্ক্ষিত স্কুলে ভর্তি হয়ে যায়। শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীলতা অনেকের কাছেই অস্বস্তিকর।
তবে বাস্তবতার আরেকটি দিক আছে, যা নিয়ে উদ্বেগও কম নয়। আমাদের সমাজে পরীক্ষা মানেই প্রতিযোগিতা, আর প্রতিযোগিতা মানেই কোচিং। ভর্তি পরীক্ষা যতই সহজ করার কথা বলা হোক, বাজারে তার ব্যাখ্যা প্রায়ই ভিন্নভাবে দাঁড়ায়। কিছুদিনের মধ্যেই হয়তো দেখা যাবে, প্রথম শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষার জন্য আলাদা কোচিং, আলাদা গাইডবই, আলাদা মডেল টেস্ট। শিশুরা স্কুলে যাওয়ার আগেই পরীক্ষার প্রস্তুতির চক্রে ঢুকে পড়বে।
এখানেই মূল প্রশ্নটি সামনে আসে। আমরা কি শিশুদের শৈশবকে আরও আগে থেকেই প্রতিযোগিতার মঞ্চে ঠেলে দিচ্ছি? নাকি সত্যিই এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে পারব, যেখানে পরীক্ষা থাকবে কিন্তু চাপ থাকবে না?
বাংলাদেশে শিক্ষা নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগ নতুন কিছু নয়। একটি ভালো স্কুলে ভর্তি হওয়া যেন সন্তানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রথম ধাপ। ফলে ভর্তি প্রক্রিয়া যত কঠিন হয়, অভিভাবকদের দৌড়ঝাঁপও তত বাড়ে। অনেক মা-বাবা হয়তো সন্তানের জন্মের পর থেকেই ভাবতে শুরু করেন, কোন স্কুলে পড়াবে, কীভাবে ভর্তি করাবে। ভর্তি পরীক্ষা চালু হলে সেই দুশ্চিন্তা আরও আগেই শুরু হতে পারে।
অন্যদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, কোচিং বাণিজ্য যাতে না বাড়ে সে বিষয়ে সরকার সতর্ক থাকবে। প্রয়োজনে স্কুলের ভেতরেই সহায়ক শিক্ষার ব্যবস্থা করা হবে। এই আশ্বাস গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অভিজ্ঞতা বলে, নীতির চেয়ে বাস্তব প্রয়োগই শেষ পর্যন্ত বড় হয়ে দাঁড়ায়।
শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শিশুদের কৌতূহল জাগিয়ে তোলা, শেখার আনন্দ তৈরি করা। ভর্তি পদ্ধতি এমন হওয়া দরকার, যা সেই আনন্দকে নষ্ট না করে বরং সহজভাবে শিক্ষার পথে নিয়ে যায়। লটারি পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা আছে, আবার অল্প বয়সে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষারও ঝুঁকি আছে। তাই প্রয়োজন এমন একটি ভারসাম্য, যেখানে ন্যায়সঙ্গত সুযোগ থাকবে, কিন্তু শৈশবের স্বাভাবিকতা নষ্ট হবে না।
শিক্ষানীতির প্রতিটি সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত শিশুদের জীবনেই সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলে। তাই ভর্তি পরীক্ষার এই নতুন সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে এর বাস্তব প্রয়োগের ওপর। যদি সত্যিই সহজ, চাপমুক্ত এবং শিশুবান্ধব একটি ব্যবস্থা তৈরি করা যায়, তবে তা ইতিবাচক ফল দিতে পারে। কিন্তু যদি এটি কোচিং আর মুখস্থ বিদ্যার নতুন প্রতিযোগিতার দরজা খুলে দেয়, তবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা আবারও পুরোনো এক চক্রে আটকে যেতে পারে।
শিশুরা আসলে খুব সহজ। তারা শেখে খেলতে খেলতে, প্রশ্ন করতে করতে, নতুন কিছু আবিষ্কার করতে করতে। সেই সহজতাকে রক্ষা করাই শিক্ষার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। ভর্তি পদ্ধতির পরিবর্তন যদি সেই দায়িত্বকে শক্তিশালী করে, তবে তা স্বাগত। আর যদি শৈশবকে আরও ভারী করে তোলে, তবে আমাদের আবারও ভেবে দেখতে হবে, আমরা আসলে কোন পথে হাঁটছি।



