ঈদের বোনাস আর গ্রামের মুখগুলো

ছবি: এআই
ঈদ সামনে এলেই শহরের বাসাবাড়িতে এক ধরনের ব্যস্ততা শুরু হয়। বাজার করা, ঘর গোছানো, নতুন কাপড়, নানা আয়োজনের সঙ্গে আরেকটি পরিচিত দৃশ্য থাকে। বাসার সিকিউরিটি গার্ড, বুয়া কিংবা সহায়তাকারীদের হাতে ঈদের বোনাস তুলে দেওয়া। বছরের এই সময়টাতে তাদের মুখে যে হাসি ফুটে ওঠে, সেটি দেখলে নিজের মনেও এক ধরনের শান্তি নেমে আসে।
আজকে বাসার বুয়া আর সিকিউরিটি গার্ডদের বোনাস দিতে গিয়ে হঠাৎ কিছু মুখ মনে ভেসে ওঠে। দূরের গ্রামের কোনো চাচা, ফুপু, মামা কিংবা খালার মুখ। এমন কেউ, যার সঙ্গে বহুদিন যোগাযোগ নেই। বছরের পর বছর কেটে গেছে কথা না বলেই। অথচ শৈশব বা কৈশোরের কোনো সময় তারা আমাদের জীবনের খুব কাছের মানুষ ছিলেন। কেন এমন হয়, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা হয়তো নেই।
তবে, মনে হলো, যখন আমি দুই বা তিন বছরের পরিচিত কাউকে ঈদের আনন্দে একটু বাড়তি টাকা দিই, তখন মনের অজান্তেই সামনে চলে আসে সেই মানুষদের কথা, যারা আমার আপন, কিন্তু দূরে পড়ে আছেন। হয়তো গ্রামের সেই স্বজনের সংসার খুব স্বচ্ছল নয়। হয়তো তিনি অসুস্থ শরীর নিয়ে দিন পার করছেন। হয়তো ভাঙা ঘরের চাল ঠিক করার সামর্থ্যও নেই।
ঈদের আগে যদি তাদের হাতেও একটি ছোট্ট বোনাস তুলে দেওয়া যায়। খুব বড় কিছু না। সামর্থ্যের ভেতরে সামান্য সহায়তা। সেই টাকায় হয়তো তিনি ওষুধ কিনবেন, হয়তো ঘরের ভাঙা টিনটি বদলাবেন। হয়তো রমজানের রোজা রেখে দু হাত তুলে দোয়া করবেন।
আমাদের শহুরে জীবনটাই ব্যস্ততার। চাকরি, অফিস, যানজট, সন্তানের পড়াশোনা, হাজারো দায়দায়িত্বের ভিড়ে দিনগুলো দ্রুত কেটে যায়। কখনো বুঝতেই পারি না কবে একটি বছর শেষ হয়ে আরেকটি বছর শুরু হয়ে গেল। এই ব্যস্ততার ভেতরেই ধীরে ধীরে দূরে সরে যায় গ্রামের আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ।
অথচ একটু চেষ্টা করলেই সম্পর্কগুলো বাঁচিয়ে রাখা যায়। সপ্তাহে না পারলেও মাসে একটি দিন, কিংবা বছরের এই দিনে। কয়েক মিনিট সময় বের করে একটি ফোন কল করা খুব কঠিন কিছু নয়। শুধু জানতে চাওয়া, কেমন আছেন। বাড়ির সবাই ভালো আছে তো। এমন দু একটি বাক্যও একজন মানুষের কাছে অনেক বড় সান্ত্বনা হয়ে উঠতে পারে।
মানুষের জীবনে অর্থের মূল্য আছে। কিন্তু তার চেয়েও বড় মূল্য আছে খোঁজ নেওয়ার। মনে রাখার। সম্পর্কের প্রতি দায়িত্ববোধের। ঈদের সময়টাতে সেই অনুভূতিটাই যেন আবার নতুন করে মনে করিয়ে দেয়, আমাদের শেকড় কোথায়।
শহরের ব্যস্ত জীবনে আমরা যত দূরেই চলে যাই না কেন, গ্রামের সেই মানুষগুলোই আমাদের সম্পর্কের আসল বৃত্ত। তাদের খোঁজ নেওয়ার জন্য কোনো বড় আয়োজন দরকার হয় না। দরকার শুধু একটু সময় আর আন্তরিকতা। কোনো ব্যস্ততাই স্বজনের খোঁজ নেওয়ার ক্ষেত্রে অজুহাত হতে পারে না। বরং একটি ছোট্ট ফোন কলও অনেক সময় ঈদের সবচেয়ে বড় উপহার হয়ে ওঠে।



