তেল সংকট
অসাধু ব্যবসায়ীদের সাধু বানাবে কে?

ছবি: এআই
ঈদের ছুটির আনন্দটাই যেন শেষ হয়ে গেল বাইকের মিটারটা দেখে। মাত্র এক দাগ তেল, গন্তব্য পেট্রোল পাম্প। ভেবেছিলাম ছুটিতে শহর ফাঁকা, পাম্পগুলোও কম ভিড় হবে। হাতে সময়ও ভালোই। আর তাই শুরু হলো মিশন তেল সংগ্রহ। প্রথম গন্তব্য মিরপুর ১৪। কাছে যেতেই চোখ আটকে গেল পাম্পের সামনে বাঁশের বেরিকেড, আর ঝোলানো ব্যানার ‘জ্বালানি তেল নেই’। মনে হলো সামনে হয়তো পাবো, ছুটলাম কালশির দিকে। সেখানে আগের চেয়ে একটু বেশি সাজানো পোস্টার, লেখা ‘অকটেন ও পেট্রল নেই’। পাম্পের গার্ড জানালেন, শুধু ডিজেল আছে, সেটাও আজকের জন্য।
তখনও হাল ছাড়িনি। বাইক ঘুরালাম আগারগাঁওয়ের দিকে। পথে দুটো পাম্পে উঁকি দিলাম, একটিতেও নেই। শেষ পর্যন্ত তালতলায় গিয়ে দেখি কয়েকজন বাইকার দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছেন। তাদের একজন হাত নেড়ে বললেন, ‘ভাই, আর ঘুরে লাভ নেই। আমরা অন্তত দশটা পাম্প ঘুরে এলাম, কোথাও তেল নাই।’ মিটারের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম, আর সময় নষ্ট না করে বাসায় ফেরাই ভালো। নইলে শেষ পথটা বাইক ঠেলেই আসতে হবে।
অথচ ঠিক এই সময়টাতে সরকারি দপ্তরগুলো থেকে যা বলা হচ্ছে, তার সঙ্গে পাম্পের বেরিকেড আর অসহায় মানুষের ভিড়ের কোনো মিল নেই। সরকার বলছে দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই, বরং পর্যাপ্ত মজুত আছে। জ্বালানি মন্ত্রীও বলছেন, প্রয়োজনে স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্য দিয়েও তেল কিনে সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা হচ্ছে। নতুন তেলবাহী জাহাজ বন্দরে আসা শুরু করেছে বলেও আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-বিপিসির তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশে ১ লাখ ৩৬ হাজার মেট্রিক টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল মজুত রয়েছে। পাশাপাশি চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে প্রায় ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাতকরণের অপেক্ষায়। কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, এই মজুত দিয়ে নতুন কোনো সরবরাহ না আসলেও আগামী ২০ থেকে ২২ দিনের স্বাভাবিক চাহিদা মেটানো সম্ভব। আর যেহেতু আমদানি করা তেলবাহী জাহাজগুলো পর্যায়ক্রমে বন্দরে আসছে, তাই সরবরাহের ধারাবাহিকতা নিয়ে শঙ্কা থাকার কথা নয়।
তাহলে প্রশ্নটা ঘুরে ফিরে আসে সেই পাম্পগুলোর সামনে। সরকার যেখানে সংকট অস্বীকার করছে, সেখানে সাধারণ মানুষ কেন পাম্পে পাম্পে ঘুরে তেলের জন্য হাহাকার করছেন? সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, একটি অসাধু চক্র ব্যক্তিগত স্বার্থে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে নিচ্ছে। মজুত রাখা, চাহিদার চেয়ে কম বিক্রি করে পরে উচ্চমূল্যে তোলা-এই পুরোনো চক্রটাই যেন আবার সক্রিয় হয়েছে।
কিন্তু এখানেই থমকে দাঁড়াতে হয়। সরকার বলছে সংকট নেই, ব্যবসায়ীরা বলছেন সরবরাহ নেই, আর সাধারণ মানুষ পড়ে আছেন মাঝখানে। যিনি বাইক নিয়ে পাম্পে পাম্পে ছুটছেন, তাঁর কাছে তো হিসাব-নিকাশের চেয়ে বড় সত্য হচ্ছে ফাঁকা পাম্প আর মিটারের শেষ দাগ। অসাধু ব্যবসায়ীদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা যেমন সরকারের, তেমনি জ্বালানি তেলের মতো অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খলার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও তার দায়িত্ব। মানুষের সামনে যদি কৃত্রিম সংকটের ছবি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সরকারি আশ্বাস যতই বড় হোক না কেন, তা শেষ পর্যন্ত জনমনে আস্থা তৈরি করতে পারে না।
প্রশ্নটা এখন শুধু তেলের মজুতের নয়, প্রশ্নটা সত্যিকার অর্থে কার কাছে কোন তথ্য সঠিক আর এই অসাধু চক্রকে সাধু বানানোর দায়িত্বটা কে নেবে? যারা পাম্প বসিয়ে রাখছেন, নাকি যারা নজরদারির নামে চোখ বন্ধ করে আছেন। শেষ পর্যন্ত ফাঁকা পাম্পের সামনে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষকেই যেন আর হিসাব কষতে না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখার সময় এখনই।



