‘তেল পথ’ লড়াই

প্রতীকী ছবি
কি অদ্ভুত কাণ্ড! খবর পাড়া বলছে তেল আছে। সরকার বলছে মজুদ পর্যাপ্ত। অথচ পাম্পগুলো তেল দিচ্ছে না। বলছে নেই! বেশিরভাগই পাম্পই আবার বন্ধ। কিছু কিছু পাম্পে আবার নববধূর ঘোমটা খোলার দশা। কৌতূহলের লাইন বাড়তেই লজ্জাবতির মতো মুখ লুকিয়ে ফেলছে। আর খোলে না! বউ দেখতে আসা পাড়া লোকেরা তখন থ! কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কেউ কেউ আবার ঝোঁপ বুঝে কোপ মারছে। তিথি-নক্ষত্র দেখে পাম্প খুলছে। দু-তিন ঘণ্টা যেতেই খেল খতম। দম শেষ। অথচ মাঠে তখন হাজার ‘ফকিরের মেলা’।
সকাল থেকে রাত; রাত থেকে ভোর। ২৪ ঘণ্টা চলছে ঢাকার এই ‘তেল পথ’ লড়াই। মাত্র ২০০ টাকার অকটেন-পেট্রোলের জন্য নিদেনপক্ষে ২ থেকে ৪ ঘণ্টার লড়াই। ২-৩টা পাম্প ঘুরে এসে, আরও বেশি সময় পুড়ানোর পর বড়জোর ১০০০ টাকার তেল জুটছে প্রাইভেট মাইক্রোগুলোর পেটে! খানিকটা কাকুতি করে কখনও সখনও ২-১ লিটার বেশি পাওয়া যায়। এত মানুষের সামনে অতি প্রয়োজনেও অতটা কাঁচুমাচুই বা হতে পারছেন কজন?
বলছি মহাখালী পার হয়ে জাহাঙ্গীর গেট থেকে বিজয় সরণিতে সেনাবাহিনীর ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনের সেই দুঃসহ অভিজ্ঞতার গল্প!
মঙ্গলবার দিবাগত রাত। হাত ঘড়ির ক্লান্ত ১২টা কাঁটা ঘুরতে ঘুরতে রাত তখন ২টা ১০ মিনিট। অফিসের পাশের কুড়িল বিশ্বরোডের পাম্পে ব্যর্থ হয়ে কী যেন ভাবতে ভাবতে আনমনেই ছুটছিলাম নিদ্রাপুরীর পথে। জাহাঙ্গীর গেট আসতেই দেখলাম ‘সেই লম্বা লাইন’। গড়াতে গড়াতে দাঁড়িয়ে গেলাম আমিও। একেবারে শেষজনের পেছনে। লাইনের শেষ কোথায় বুঝতে পারলেও ভিড়ে টিকিটা দেখতে পাচ্ছিলাম না। বাইক স্ট্যান্ড করে দেখার চেষ্টা করলাম শেষটা। মাথা আর মোটরসাইকেল; এর বাইরে কিছু নেই!
হঠাৎ চোখে ভেসে উঠল ভুলে যাওয়া সেই করোনার দিনগুলো! গোটা দুয়েক ওষুধ কেনার জন্য জেলের কয়েদির মতো বৃত্তবন্দি হতে হত। যেন পিথাগোরাসের মার্শাল ল চলছে ফার্মেসির পিচ ঢালা রাস্তায়। মুখে মাস্ক; হাতে পলি গ্লাভস। রেললাইনের ঐতিহাসিক দূরত্বে ঠাঁই দাড়িয়ে থাকতাম এক পাতা ওষুধের আশায়! গায়ে গা লাগা দূরের কথা; বাঁ পাশের নিঃশ্বাস থেকেও দূরে থাকত ডানের ভদ্রলোক! ছোঁয়া বাঁচিয়ে হঠাৎ ব্রাক্ষ্মণ হয়ে উঠার সে কি জ্বালা তখন আমাদের!
সুখের কথা হলো— এবেলায় আবার ওসব নেই। লম্বা নাইন। ১-২ কিলোমিটার তো বটেই। কোথাও আবার ৩-৪ কিলোমিটারও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। জাত-পাত নেই। ধনী-গরিব সবাই মিলেমিশে একাকার। রংচটা কমদামি মোটরসাইকেলটাও চাকায় চাকা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সামনের পঙ্খীরাজের পেছনে! দূর থেকে দেখলে আকালের দিনের রেশনের লাইনের চেয়েও কম কিছু নয়!
ভিড়। গাড়ি। যতদূর চোখ যায়, ততদূর গাড়ি! ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছে গাড়ির মালিক-চালকরা! কাঁচা বয়সী, মাঝবয়সী, যুবক.... কত মানুষ এই শেষ রাতের লাইনে। ঘুম তাড়িয়ে নির্ঘুম অপেক্ষা। চোখেমুখে সারাদিনের ক্লান্তি। মাথার ভেতর ভনভন করছে সকালের অফিস; সেহরির আগে ঘরে ফেরার উদ্বেগ। একটু সাহেবি ভাড়াটিয়াদের আবার আরেক চিন্তা! ঘুম থেকে ডেকে তুলতে হবে দারোয়ানকে। মাত্র ২০০ টাকার তেলের জন্য! তার ওপর সারাদিনের ক্লান্তি!
গত কয়েকদিন ধরে এই নতুন রুটিনেই চলছে ঢাকা। স্বস্তিটা হলো, পাম্পগুলোয় টিসিবির লাইনের মত হামলে পড়ার সেই অসহায়ত্বটা এখনও আসেনি! তবে ঈদযাত্রায় ঢাকার পেট্রোল পাম্পগুলোর হাল ট্রেনের বেহাল ছাদের চেহারা পাবে কিনা সে কল্পনায় এখন না যাওয়াই শ্রেয়।
ট্রাস্ট ফিলিং বরাবর দুই সারি। ফুটপাত ছুঁয়ে প্রধানমন্ত্রীর আলিশান অফিস দেখতে দেখতে থেমে থেমে এগোচ্ছে চার চাকাগুলো। পাশের সারিতেই দুই চাকার লম্বা মিছিল। একেকজন একেক তালে। কেউ একা। কেউ সবান্ধব। কারও সাথে প্রিয়জন। কেউ গালে হাত দিয়ে বসে আছে বাইকে। চোখে মুখে অপেক্ষার বিরক্তি। কেউ ভিডিও কলে সময় কাটাচ্ছেন ঘরনির সাথে। মাঝে মাঝে দক্ষ ক্যামেরাম্যানের মতো ফোনটা দুই হাতে উঁচু করে ধরে ‘পৃথিবীর নতুন আশ্চর্য’ দেখাচ্ছেন পরিবারকে। কেউ শুনছেন হারানো দিনের গান। কেউ আবার মুখ গুঁজে মোবাইল ঘাঁটছেন একমনে। কি-ই বা করার আছে? সামনে প্রায় দুই কিলোমিটার পথ। তবে নিজের গাড়ি ছেড়ে খুব দূরে কাউকে যেতে দেখলাম না৷ তাও কি সিরিয়াল হারানোর ভয়ে?
কারণটা খুঁজতেই জট খুললো গোপন রহস্যের। ১০ মিনিট সামনে গিয়ে ফেরার পথেই পড়লাম গোলকধাঁধায়। সারি সারি বাইক। মাথার পর মাথা। নিয়ন বাতির আবছা আলোয় রেখে যাওয়া নিজের বাইক খুঁজে পাওয়া দায়! ভিড়ের ভেতর তালগোল পাকিয়ে যায়।
লাইন এগোচ্ছিল ১০/১৫ মিনিট পরপর। সিরিয়ালে টান পড়তেই সবাই সজাগ। পিএম অফিসের সামনে যখন এলাম রাত তখন সাড়ে তিনটা। বাকিদেরও সয়ে গেছে অপেক্ষার জ্বালা। পাশের গাড়িগুলোর ভেতরেও স্মার্টফোনের আলো। সময় কাটছে ইউটিউবে। কেউ গেমসে। কেউ গাড়ি থেকে নেমে আরেক ড্রাইভারের সঙ্গে কথা বলছেন। কেউ দরজায় হেলান দিয়ে হাওয়ায় উড়াচ্ছেন অবসাদের ধোঁয়া। তাদেরই একজনের মুখে শুনলাম, হেমায়েতপুর থেকে এসে দাঁড়িয়েছেন লাইনে। গাবতলীর পাম্পেও তেল পাননি। এখানে ১০০০ টাকার নিয়েছেন রাত ২টায়। ফিরে এসে আবার দাঁড়িয়েছেন লাইনের শেষে। মাইক্রো-প্রাইভেটে এর বেশি দিচ্ছে না। এক ট্রাক ড্রাইভার বললেন ৪০ লিটার নেওয়ার ইচ্ছা তার। ১টায় এসে মিশেছেন লাইনে। চোখে-মুখে আগুনের ফুলকি।
কাউকে যেচে প্রশ্ন করার মতো পরিস্থিতি নেই। শুকনো চেহারায় প্রচ্ছন্ন বিরক্তি। দেখে মনে হচ্ছে স্বাভাবিক; কিন্তু মুখ খুললেই ফুটছে। মতিন নামের এক যুবক বললেন, ‘সন্ধ্যা থেকে আমি কুত্তার মতো ঘুরছি। বাড়ি আব্দুল্লাহপুর। সেখানকার এক পাম্পে বাইকে মাত্র ২৫০ টাকার তেল দিচ্ছে। তাও আবার ৪০ মিনিট পর। তেল নিয়ে টান দিলাম উত্তরায়। কয়েকটা পাম্প ঘুরলাম; বন্ধ। খবর পেলাম আর্মিদের এই পাম্পই নাকি সবচেয়ে বেশি তেল দিচ্ছে। ৬০০ টাকার। অন্যদের মতো ২-৩ ঘণ্টা দিয়ে লাইনে লোক থাকতেই মুখের সামনে সপাং করে দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে না।’
তেল নিতে আসা আরেক ব্যক্তি বললেন, ‘আমি রামপুরা থেকে এসেছি তেল নিতে। প্রথমে গিয়েছিলাম মতিঝিলে। দুই-তিনটাতে ঢুঁ মারলাম; বন্ধ। শেষপর্যন্ত এখানে এসে পেলাম।’
দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন ভুক্তভোগী সেলিম খান। সাত রাস্তার সিটি পাম্প তেল দিচ্ছে না। তেজগাঁওয়ের কোনো পাম্পেও তেল পাননি। মহাখালীর পাম্প বন্ধ পেয়েছেন। শেষমেষ এখানে এসেছেন।
পিএমও অফিসের শেষ কোণায় এসে নজর পড়ল সেনা-পুলিশ পোস্টে। আপাদমস্তক পরখ করছেন সবাইকে। মনে হলো হঠাৎ নিশিরাতের অসহ্য একাকীত্ব কাটছে। দুই বন্ধুকে দেখলাম মোহাম্মদপুর থেকে এসেছে তেল নিতে। দাঁড়িয়ে গল্প জুড়ে দিয়েছে সমবয়সীদের সঙ্গে। দুঃখীরা সব এক হলে সুখের পালা গায়।
প্রতীক্ষার লাইন ঘিরে জমেছে পান-সিগারেটের ভ্রাম্যমাণ দোকানও। গলায় দোকান ঝুলিয়ে হেঁটে হেঁটে রাউন্ড চলছে। বিক্রিও হচ্ছে বেশ। নাখালপাড়ার গলিটা পার হয়ে অতিরিক্ত প্রকৌশলীর কাছারির সামনের ফুটপাতে দোকান সাজিয়েছে দুই কিশোর— আসাদ আর ইব্রাহিম। সিগারেটের সঙ্গে আবার চা-ও আছে এখানে।
ভীষণ ব্যস্ত তারা। হাত চলছে ঝড়ের বেগে। জিজ্ঞেস করতেই বলল, এখানে এখন রাত-দিন নেই। সবসময়ই মানুষ। ‘বেলা ৩টায় বসি আমরা। উঠি সেহেরির আগে।’ গত তিনদিন ধরে বসছে তারা। গড়ে ৪-৫ হাজার টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। ওখানে দাঁড়িয়েও সময় কাটাচ্ছে অনেকে। খানিক দূরে প্রিয়জনের ঘাড়ে হাত রেখে কি যেন দেখছেন দুজন। খুনসুটি করছে। দামি হেলমেট চুরি হয়ে যাবে ভেবে হাতে নিয়েই টহল শুরু করছে পাম্পের সীমান্ত বরাবর। হয়তো বিড় বিড় করে গাইছে, আর কতদূর পাঞ্জেরি। আর কত দিন?
অবশেষে মাহেন্দ্রক্ষণ। মাঝরাত ডুবে তখন সেহরির ওয়াক্ত। ৪টা ১০ মিনিটে এলাম সেই সোনার খনির দরজায়। একসাথে ৬ জন করে ঢোকায় সীমানার ভেতরে। সেখানেও দেখি আরেক ‘জাহাঙ্গীর গেট’। প্রায় ২০টা বাইক। আরেকপাশে চার চাকার পথ। আরও অন্তত মিনিট পনেরোর বিড়ম্বনা। তবু খুশি সবাই। চোখে আনন্দ। একজন বললেন, তবু ভালো, দিনে ৪-৫ ঘণ্টা দাঁড়িয়েও তেল পাওয়া যাচ্ছে না! তাকে বললাম, ঈদের পর যদি তেল না পান কি করবেন? বললেন, ‘সবার যা গতি আমারও তাই! বাইকই আর বের করব না। তেলের লাইনে দাঁড়াতে দাঁড়াতে জীবনটা তেজপাতা হয়ে গেল!’

