আগামীর সময়

সদরঘাট লঞ্চ দূর্ঘটনা

'উই অল ফাইট, উই অল ওয়েট অ্যান্ড উই অল ডাই ফর এ হোম...'

  • ব্যাগভর্তি কেনাকাটা যখন লঞ্চের তলায় পিষ্ট হয়, তখন সব গ্ল্যামার বুড়িগঙ্গার নোংরা জলে ভেসে যায়। আমাদের ঈদযাত্রা বরাবরই ‘ডেথ ট্র্যাপ’, যেখানে টিকে থাকাটাই সবচেয়ে বড় উৎসব।
'উই অল ফাইট, উই অল ওয়েট অ্যান্ড উই অল ডাই ফর এ হোম...'

সংগৃহীত ছবি

সদরঘাটের ১৪ নম্বর পন্টুনের কাছে পড়ে থাকা ছিন্নভিন্ন জুতো আর ব্যাগের চেইন দিয়ে বের হয়ে আসা নতুন জামার হাতা— আমাদের ঈদযাত্রায় এবারের কোলাজ। গত বুধবার বিকেলে যখন ‘জাকির সম্রাট’ লঞ্চটি অন্য একটি লঞ্চকে ধাক্কা দিল, তখন কেবল লোহায় লোহায় ঘর্ষণ হয়নি, পিষ্ট হয়েছে কয়েকজন মানুষ। থেতলে যাওয়া শরীরের সেই বীভৎস ভিডিওতে দেখা গেল, একটি ব্যাগকাঁধে শরীর নিমিষেই বুড়িগঙ্গার পলিমাখা জলে বিলীন হয়ে গেল। অথচ মানুষটির ফোনের ওপাশ থেকে হয়তো তখনো কোনো এক মা বা স্ত্রী জিজ্ঞেস করছিলেন—‘কতদূর আইছো?’

সেই ফোনের ব্যাটারি ব্লাস্ট হয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে ছিন্নবিচ্ছিন্ন পায়ের পাশে। আমাদের ডিজিটাল বাংলাদেশের এই এনালগ মৃত্যু—স্বপ্নগুলো ধোঁয়া হয়ে ওড়ে, আর মানুষগুলো স্রেফ ‘নিখোঁজ’ তালিকায়।

একমাস রোজা রেখে, খেয়ে না খেয়ে হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে এই যে লাখে লাখে মানুষের নাড়ির টানে ছোটা—একে কি কেবল ‘ছুটি’ বলা যায়? এটি আসলে এক দীর্ঘমেয়াদী প্রত্যাখ্যান। এই ঢাকা শহর আমাদের কাউকে আপন করতে পারেনি। সারা বছর যে শহর আমাদের রক্ত চুষে নেয়, ঈদের সময় সেই শহর আমাদের উগড়ে দেয়। মানুষ কেন ভাঙাচোরা লঞ্চের রেলিংয়ে ঝুলে মেহেন্দীগঞ্জ বা ঘোষেরহাট যেতে চায়? প্রশ্ন উঠতে পারে, এই দেশের মানুষেরা কি আসলে ‘বাড়ি’ ফেরে? নাকি তারা একদল জম্বি, যারা প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে একই গর্তে ঢোকার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে?

সমাজবিজ্ঞানীরা একে ‘অভ্যন্তরীণ মাইগ্রেশন’ বলে গালভরা নাম দেন। কিন্তু আদতে এটি একটি অদ্ভুত অসুখ। ঢাকা আমাদের কাছে কেবল একটা ‘ওয়েটিং রুম’, যেখানে আমরা ট্রেনের বা লঞ্চের টিকিটের জন্য অপেক্ষা করি। আমাদের পিছুটান আসলে ঘরের প্রতি নয়, বরং এই শহরকে সাময়িকভাবে ঘৃণা করার তীব্র আকাঙ্ক্ষার প্রতি।

টেলিভিশনের পর্দায় রঙিন বিজ্ঞাপনে দেখা যায়—সাদা পাঞ্জাবি পরা এক যুবক সুগন্ধি মেখে ট্রেনের জানালায় হাত রেখে হাসছে। ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে...’। অথচ সদরঘাটের বাস্তবতায় কোনো মিউজিক নেই, আছে ইঞ্জিনের কর্কশ শব্দ আর পন্টুনে যাত্রীদের আর্তনাদ। মার্কেটিং আমাদের শেখায় ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে কেনাকাটা। কিন্তু সেই ব্যাগভর্তি কেনাকাটা যখন লঞ্চের তলায় পিষ্ট হয়, তখন সব গ্ল্যামার বুড়িগঙ্গার নোংরা জলে ভেসে যায়। আমাদের ঈদযাত্রা বরাবরই ‘ডেথ ট্র্যাপ’, যেখানে টিকে থাকাটাই সবচেয়ে বড় উৎসব। এবারের ঈদযাত্রায় যারা ওই ছিন্নবিচ্ছিন্ন পায়ের পাশে ধোঁয়া ওঠা ফোনের মতো নিভে গেছেন, তাদের জন্য কোনো টিভিসি বা বিলবোর্ড তৈরি হবে না। পিষ্ট হওয়া মো. সোহেল কিংবা নিখোঁজ মিরাজ ফকিররা স্রেফ কিছু পরিসংখ্যান মাত্র।

লঞ্চের মালিকের কাছে যাত্রী মানে স্রেফ ‘মাথাপিছু আয়’, আর রাষ্ট্রের কাছে তারা ‘পরিসংখ্যান’। যে মানুষটি সারা মাস ঘাম ঝরিয়ে বোনাস গুছিয়েছিল পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে, তার শরীর এখন নদীর অতলে মাছের খাদ্য। সভ্য দেশের মানুষ ছুটিতে ‘দেশ দেখতে’ বের হয়। আর আমাদের দেশের মানুষ ছুটিতে ‘দেশ ছাড়তে’ চায়। কারণ আমাদের মনে হয়, মেহেন্দীগঞ্জ বা ঘোষেরহাটের ওই কর্দমাক্ত উঠানটুকু ছাড়া বাকি পুরো মানচিত্রটাই আমাদের জন্য ‘কারফিউ এলাকা’। খেয়াল করবেন বিজ্ঞাপনগুলোও বাড়ি ফেরা কেন্দ্রিক; তারা ভিন্ন চিন্তার সুযোগ দেয় না। আমরা হয়েছি ‘ঘরমুখো রিফিউজি’। আমাদের নিজস্ব কোনো মানচিত্র নেই, কেবল আছে ক্যালেন্ডারের পাতায় কয়েকটা লাল দাগ।

সদরঘাট বরাবরই এক চমৎকার ‘ডেথ ট্র্যাপ’। এখানে লোহা কথা বলে, আর মানুষ ঠিকানায় ফিরতে চেয়ে নিখোঁজ হয়। মরে যেতে কোনো টিকিটের সিরিয়াল লাগে না। আগে লোকে বলত ‘ঈদযাত্রা মানেই যুদ্ধ’। এখন যুদ্ধ শব্দটা সেকেলে শোনায়।

আমরা সবাই লড়াই করি, অপেক্ষা করি এবং শেষ পর্যন্ত একটা ‘বাড়ি’র জন্যই প্রাণ দিই। বাংলাদেশের সড়কে মরে যাই বাড়ি ফিরতে গিয়ে, যেমন একজন ফিলিস্তিনি মরে যায় বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হতে হতে; ইউক্রেন, কাশ্মীর বা ইরানে মানুষ মরে যায় বাড়ির উঠানে। অবৈধ সাগরপথে মরে যায় কত লোক ঠিকানার খোঁজে। এখানে বাড়ি ফেরা মানে আসলে অস্তিত্বের এক অ্যাবসার্ড সমাপ্তি। আমরা বেঁচে ফিরলে ফেসবুকে ‘হোম সুইট হোম’ লিখব, আর যার ফোন থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে, তার নম্বরটা পরিচিতদের ফোনবুক থেকে চিরতরে মুছে দেব।

শিরোনাম কৃতজ্ঞতা: বোস শান্তনু

লেখক: কবি ও সাংবাদিক।

    শেয়ার করুন: