আগামীর সময়

‘গাজা ডকট্রিন’ এখন লেবাননে

  • যে কৌশল গাজাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে, এখন লেবাননেও সেই কৌশলেরই পুনরাবৃত্তি হচ্ছ- সেখানে চলছে বেসামরিক নাগরিকদের বাস্তুচ্যুতি, অবকাঠামো ধ্বংস এবং শাসনব্যবস্থাকে চুরমার করে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
‘গাজা ডকট্রিন’ এখন লেবাননে

বৈরুতের একটি ভবনে ইসরায়েলি বিমান হামলার পর ধোঁয়া উড়ছে- ১২ মার্চ, ২০২৬, [ওয়ায়েল হামজেহ/ইপিএ]

ইসরায়েল দুই সপ্তাহেরও কম সময়ে লেবাননে প্রায় ৬০০ মানুষকে হত্যা করেছে এবং ৭ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষকে বাস্তুচ্যুত করেছে। এটি ইসরায়েলের 'গাজা ডকট্রিন' বা গাজা-নীতির প্রয়োগের প্রাথমিক ধাপ মাত্র। এই ফর্মুলাটি অত্যন্ত সুসংহত: প্রথমে মানুষকে চলে যাওয়ার আদেশ দিয়ে অথবা তাদের বেঁচে থাকার উপায় ধ্বংস করে দিয়ে বাস্তুচ্যুত করা হয়। এরপর বেসামরিক অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় যাতে কেউ ফিরে আসতে না পারে এবং তথাকথিত 'বাফার জোন' তৈরির মাধ্যমে ভূখণ্ড দখল করা হয়। সবশেষে, ভূখণ্ডটিকে বিচ্ছিন্ন ছিটমহলে পরিণত করার মাধ্যমে যেকোনো শাসন ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলা হয়, আর সামরিক অভিযান চলতেই থাকে।

ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বহিষ্কৃত হওয়ার আগে আমি ফিলিস্তিনে তিন বছর কাজ করেছি। আমি সেখানে এই ডকট্রিনটি বাস্তবে রূপ নিতে দেখেছি। এখন বৈরুতে বসে আমি এর পুনরাবৃত্তি প্রত্যক্ষ করছি।

পশ্চিম তীরে ইসরায়েল কয়েক দশক ধরে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডকে খণ্ডবিখণ্ড করেছে এবং ফিলিস্তিনিদের অখণ্ড ভৌগোলিক অবস্থান অস্বীকার করেছে। সিমেন্ট দিয়ে পানির কূপ বন্ধ করে দেওয়া, পাওয়া অসম্ভব এমন পারমিটের অজুহাতে বাড়িঘর ভেঙে ফেলা এবং অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের মাধ্যমে পশুপালকদের তাদের জমি থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে। গাজায় এই একই যুক্তি অনেক দ্রুত এবং চরম নিষ্ঠুরতার সাথে প্রয়োগ করা হয়েছে।

২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েল ঘোষণা করেছিল যে গাজার উত্তরের প্রতিটি ফিলিস্তিনিকে অবিলম্বে চলে যেতে হবে। তার কয়েকদিন আগে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পূর্ণাঙ্গ অবরোধের ঘোষণা দিয়েছিলেন: কোনো বিদ্যুৎ নেই, খাবার নেই, পানি নেই। পুরো জনসংখ্যাকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করার মাধ্যমে ইসরায়েল এক শ্রেণির ‌'অপ্রয়োজনীয় মানুষ' তৈরি করেছে। সামরিক বাহিনী গাজাকে নম্বরযুক্ত ব্লকে বিভক্ত করে মানচিত্র প্রকাশ করেছে। যখন আপনার ব্লকের নম্বর ডাকা হতো, তখন আপনি চলে যেতে বাধ্য হতেন। এই উচ্ছেদ আদেশগুলো পরবর্তী অপরাধগুলোর অজুহাতে পরিণত হয়েছিল। মানুষকে আল-মাওয়াসি নামক উপকূলীয় এলাকায় যেতে বাধ্য করা হয়েছিল যেটিকে ইসরায়েল 'নিরাপদ অঞ্চল' বলে ঘোষণা করেছিল—যা মূলত লাখ লাখ মানুষের একটি বন্দী শিবির মাত্র। তথাকথিত এই উচ্ছেদ এলাকাগুলোকে জনশূন্য ও ধ্বংস করা হয়েছে।

চিরাচরিত বিদ্রোহ দমনের (Counterinsurgency) যুক্তি হলো—'দখল করো, ধরে রাখো এবং পুনর্গঠন করো।' কিন্তু ইসরায়েলের পদ্ধতি সম্পূর্ণ ভিন্ন: ধ্বংস, বাস্তুচ্যুতি এবং শাসন ব্যবস্থা চুড়মার করে দেয়া। লক্ষ্য এলাকাটি খালি করা। গাজা এবং দক্ষিণ লেবানন—উভয় ক্ষেত্রেই তাদের বাস্তুচ্যুতিই হলো মূল লক্ষ্য। তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের পতন ঘটানোকে ইসরায়েল স্থায়ী করতে চায়। এটি মূলত সমসাময়িক সামরিক রূপ নেওয়া একটি বসতি স্থাপনকারী-ঔপনিবেশিক (settler-colonial) যুক্তি।

একই নীল নকশা এখন লেবাননে এসেছে, তবে পূর্ববর্তী ইসরায়েলি অভিযানের তুলনায় এখানে একটি প্রকাশ্য পার্থক্য রয়েছে। আশির দশকে প্রথম লেবানন যুদ্ধে ইসরায়েল একটি অনুগত সরকার গঠনের চেষ্টা করেছিল। গাজা দেখিয়েছে যে ইসরায়েল সেই আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করেছে। লক্ষ্য এখন আর কোনো ভূখণ্ড কে শাসন করবে তা নির্ধারণ করা নয়, বরং সেখানে যেন কোনো সুসংহত শাসন ব্যবস্থাই বিদ্যমান না থাকে তা নিশ্চিত করা।

ইসরায়েল সমগ্র দক্ষিণ লেবানন এবং দক্ষিণ বৈরুতের জন্য উচ্ছেদ আদেশ জারি করেছে। গত সপ্তাহে বৈরুতে আমার স্ক্রিনে ভেসে আসা পরিচিত মানচিত্রটির অস্পষ্টতা ঠিক গাজার মতোই ছিল; ঘোষিত উচ্ছেদ এলাকাগুলো মানচিত্রে দেখানো এলাকার সাথে মিলছিল না। গাজায় যারা এই অদৃশ্য রেখা অতিক্রম করেছিল তাদের হত্যা করা হয়েছিল।

লক্ষ লক্ষ মানুষ এখন বাস্তুচ্যুত। স্কুলগুলো আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, স্বাস্থ্যকর্মীরা নিহত হয়েছেন এবং মানুষ সমুদ্রতীরে ঘুমাচ্ছে- যেখানে মাত্র দুই রাত আগে একটি তাবুতে বোমা হামলা করা হয়েছে। ইসরায়েল হুমকি দিয়েছে যে লেবানন সরকার যদি হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয় তবে তারা লেবাননের রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোতে হামলা করবে—অর্থাৎ তাদের লক্ষ্য এখন বাস্তুচ্যুতি এবং অবকাঠামো ধ্বংস থেকে রাষ্ট্রের জোরপূর্বক অস্থিতিশীলতার দিকে বিস্তৃত হয়েছে। লেবানন সরকার হিজবুল্লাহকে গুলি চালাতে নিষেধ করার মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ইসরায়েলের কৌশল লেবাননে অভ্যন্তরীণ ফাটল সৃষ্টির জন্যই ডিজাইন করা হয়েছে বলে মনে হয়।

কিন্তু লেবানন গাজা নয়। হামাস একটি অবরুদ্ধ ভূখণ্ডের ভেতরে ইম্প্রোভাইজড অস্ত্র নিয়ে লড়াই করছিল এবং সেটিই ইসরায়েলি বাহিনীর জন্য চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছিল। হিজবুল্লাহর কাছে রয়েছে অনেক বেশি অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র, মজবুত অবকাঠামো এবং এই ধরণের যুদ্ধের জন্য কয়েক দশকের প্রস্তুতি। তারা দেখিয়েছে যে তারা আঘাত সহ্য করতে পারে এবং পাল্টা আঘাত হানতে পারে, যা ইসরায়েল এবং বাইরের পর্যবেক্ষক উভয়কেই অবাক করেছে। দক্ষিণ লেবানন এবং বেকায় ইসরায়েলি স্থল অভিযান ইতিমধ্যেই উল্লেখযোগ্য প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছে। এখানেই এই ডকট্রিনটি তার সীমার মুখোমুখি হতে পারে—কূটনৈতিক চাপের মাধ্যমে নয় (যা বাস্তবে দেখা যায়নি), বরং অসম সামরিক বাস্তবতার (asymmetric military reality) মাধ্যমে। ইরান লেবাননের ভাগ্যকে যেকোনো যুদ্ধবিরতি আলোচনার অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তুলেছে, যা এই ফ্রন্টগুলোর একীভূত হওয়ার সংকেত দিচ্ছে—যাকে ইসরায়েল দুর্বল ভেবেছিল।

দায়মুক্তির ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই ডকট্রিনটি তথাকথিত 'নিয়ম-ভিত্তিক বিশ্ব ব্যবস্থার' সম্মেলন কক্ষগুলোতে সামান্য প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছে।
জবাবদিহিতার শূন্যতায় এই ডকট্রিনটি বিকশিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতকে (ICJ) উপেক্ষা করা হয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদ পঙ্গু হয়ে পড়েছে। সরকারগুলো ইসরায়েলের সাথে বাণিজ্য চালিয়ে গেছে কারণ তারা ক্রমাগতভাবে অগ্রহণযোগ্য বিষয়গুলোকে স্বাভাবিক করে তুলেছে।

ইসরায়েলের সামরিক অ্যাডভোকেট জেনারেলের অফিসের আন্তর্জাতিক আইনি বিভাগের প্রধান ড্যানিয়েল রেইজনার অকপটে বলেছিলেন, 'আপনি যদি দীর্ঘ সময় ধরে কোনো কাজ করেন, তবে বিশ্ব তা মেনে নেবে... আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের মাধ্যমেই অগ্রসর হয়।'

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখানে কোনো নীরব দর্শক নয়; তারা সক্রিয়ভাবে এটির সাথে আছে। এই বছরের শুরুতে মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে সেক্রেটারি অফ স্টেট মার্কো রুবিও আটলান্টিক জোটকে জাতিগত জাতীয়তাবাদী ফ্রেমওয়ার্কে বর্ণনা করেছেন এবং উপনিবেশবাদকে পশ্চিমা কৃতিত্ব হিসেবে চিত্রিত করেছেন। তেল আবিবে এক অনুষ্ঠানে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি আস্থা প্রকাশ করেছেন যে ওয়াশিংটন আইসিসি (ICC) এবং আইসিজে (ICJ)—উভয় প্রতিষ্ঠানকেই 'নিষ্ক্রিয়' করবে, অথচ এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমেই জবাবদিহিতা চাওয়া সম্ভব ছিল।

লেবাননে যা ঘটছে তা একটি চলমান বসতি স্থাপনকারী-ঔপনিবেশিক প্রকল্পের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা। উচ্ছেদ আদেশগুলো হলো ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পূর্বসূরি, যা মূলত মানুষের ফিরে আসাকে রোধ করতে এবং মানচিত্রকে স্থায়ীভাবে পরিবর্তন করতে ডিজাইন করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য শুধু যুদ্ধবিরতি চুক্তির চেয়েও বেশি কিছু প্রয়োজন- কারণ, যুদ্ধবিরতি আসলে নিম্ন মাত্রায় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়। এর জন্য প্রয়োজন আন্তর্জাতিক আইনের শর্তহীন প্রয়োগ, এই ডকট্রিন পরিচালনাকারীদের পূর্ণ জবাবদিহিতা এবং বেইত হ্যানুন থেকে বৈরুত পর্যন্ত সবার ফিরে আসার এবং পুনর্গঠনের অধিকার।

আলজাজিরা অনলাইন থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর।

লেখক: বৈরুতে অবস্থানরত রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

    শেয়ার করুন: