আগামীর সময়

ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ ও মার্কিন দেশপ্রেমের সংকট

ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ ও মার্কিন দেশপ্রেমের সংকট

এআই নির্মিত ছবি

নিকট অতীতের সেই ইরাক যুদ্ধ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক ইনান যুদ্ধ প্রসঙ্গে আমেরিকা ও ইউরোপের উদারপন্থী রাজনীতিকদের মধ্যে একটি অদ্ভুত প্রবণতা আমরা দেখে আসছি। যেমন ইরান যুদ্ধ নিয়ে তারা ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, ‘আমরা ট্রাম্পের যুদ্ধের বিরোধী, কিন্তু ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুতে আমরা খুশি। আমাদের প্রার্থনা লড়াকু মার্কিন সেনাদের সঙ্গে আছে। আমরা যুদ্ধের সফল সমাপ্তি আশা করি।’

ভাষা এবং ভাষ্যের ধরণ ক্ষেত্রবিশেষে আলাদা হলেও মোটা দাগে তাদের মন্তব্যের মূল সুর বা বক্তব্য আসলে এটুকুই।

কিন্তু এই ধরনের বক্তব্য কেবল ভণ্ডামিই নয়, বরং কাণ্ডজ্ঞানহীন এবং ভেতরে ফাঁকা। অবৈধভাবে শুরু করা যুদ্ধের ‘সফল সমাপ্তি’ আশা করা আর ডাকাতের চুরির নিন্দা করে সে যেন বড় সিন্দুক ভাঙতে পারে সেই দোয়া করা মধ্যে তফাত নেই। ২০২৬ সালের এই যুদ্ধময় আবহে যখন আকাশে বোমারু বিমান কিংবা ক্ষেপণাস্ত্রের ছুটে চলা, তখন মাটিতে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রশ্ন তোলা দরকার: নিজের দেশ যখন একটি অন্যায্য যুদ্ধে জড়ায়, তখন দেশপ্রেমের মানে কি দাঁড়ায়? অন্যায় যুদ্ধে একজন দেশপ্রেমিক কি তার নিজ দেশের পরাজয় কামনা করতে পারেন?

ইরানের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই যুদ্ধের বিরোধিতা করার এবং এই যুদ্ধে আমেরিকার ব্যর্থতা কামনা করার মতো অন্তত ১০টি জোরালো কারণ রয়েছে।

১. আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন: ইরান একটি স্বাধীন রাষ্ট্র এবং জাতিসংঘের সদস্য। তারা কখনো আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেনি। ফলে মার্কিন হামলা সরাসরি ‘আগ্রাসন’, যা জাতিসংঘ সনদ ও মার্কিন সংবিধান উভয়েরই পরিপন্থী।

২. গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অবমাননা: মার্কিন সংবিধানে যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা কেবল কংগ্রেসের। ইরানে হামলার বিষয়ে ট্রাম্প সেই ক্ষমতার তোয়াক্কা করেননি। এমনকি তার মন্ত্রীরা— পেট হেগসেথ বা মার্কো রুবিও- একেক সময় যুদ্ধের একেক কারণ দেখাচ্ছেন। এটি প্রমাণ করে এই যুদ্ধের কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নেই।

৩. রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড: কোনো বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান বা সামরিক নেতাকে হত্যা করা আন্তর্জাতিক আইন এবং ১৯৮১ সালের মার্কিন নির্বাহী আদেশের লঙ্ঘন। এই হত্যাকাণ্ড কেবল অস্থিতিশীলতাই বাড়ায়।

৪. মানবিক বিপর্যয়: ইসরায়েল ও আমেরিকার বোমাবর্ষণে ইতিমধ্যে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ মারা গেছে। একটি স্কুলে হামলায় ১৭৫ জন শিশু ও শিক্ষক নিহত হয়েছে। এই ধ্বংসলীলা চললে মধ্যপ্রাচ্যে কোটি কোটি মানুষ উদ্বাস্তু হবে।

৫. অর্থনৈতিক দেউলিয়া দশা: আমেরিকার বাজেট ঘাটতি যেখানে ২ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, সেখানে এই অবৈধ যুদ্ধে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ওড়ানো সাধারণ মার্কিন করদাতাদের পকেট কাটার নামান্তর। এই টাকা স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় হতে পারত।

৬. পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি: ইরানের সঙ্গে এই সংঘাত চীন, ভারত ও রাশিয়ার সঙ্গে আমেরিকার উত্তেজনা বাড়িয়ে দিচ্ছে। এটি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বা পারমাণবিক ধ্বংসযজ্ঞের দিকে ঠেলে দিচ্ছে পৃথিবীকে।

৭. আস্থার সংকট: শান্তি আলোচনার নাম করে ইরানকে ডেকে টেবিলে বসিয়ে রেখে আড়ালে হামলার তারিখ ঠিক করা হয়েছিল। এই চরম বিশ্বাসঘাতকতার পর ভবিষ্যতে কোনো দেশ কি আর আমেরিকার সঙ্গে টেবিলে বসতে চাইবে?

৮. মিত্রদের দ্বিচারিতা: ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের মতো তথাকথিত মিত্ররা একইসঙ্গে যুদ্ধের পক্ষে ও বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে সস্তা রাজনীতি করছেন।

৯. কৌশলী ব্যর্থতা: ট্রাম্প প্রশাসন ইরানি বাহিনীকে অস্ত্র সমর্পণের কথা বলছে, অথচ সেখানে কোনো দখলদার সেনাবাহিনী নেই যাদের কাছে তারা আত্মসমর্পণ করবে। এটি এক প্রকার সামরিক রসিকতা।

১০. পারমাণবিক অস্ত্রের দৌড়: আমেরিকা উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে নরম আচরণ করে অথচ পারমাণবিক অস্ত্রহীন ইরানের ওপর হামলা চালায়। এটি বিশ্বকে এই বার্তাই দিচ্ছে যে— মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ থেকে বাঁচতে হলে পারমাণবিক অস্ত্র থাকা বাধ্যতামূলক।

আধুনিক আমেরিকান দেশপ্রেম এখন ‘জাতীয়তাবাদ’ এবং এক ধরণের ‘থিয়েট্রিক্যাল বা প্রদর্শনীমূলক বাড়াবাড়ির’ মিশণ। ট্রাম্পের মেইক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন আন্দোলন দেশপ্রেম নয়, বরং ক্যাপ, গোল্ড কয়েন আর টি-শার্ট বিক্রির এক বিশাল ব্যবসা। হোয়াইট হাউস এখন ভার্সাই প্রাসাদের মতো জাঁকজমকপূর্ণ সাজে সজ্জিত, যা সাধারণ মানুষের অভাব-অনটনের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।

দেশপ্রেম আসলে কী? অষ্টাদশ শতাব্দীতে দেশপ্রেমের অর্থ ছিল নাগরিক গুণাবলি এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ। থমাস জেফারসন লিখেছিলেন, যখন কোনো সরকার মানুষের জীবন ও স্বাধীনতার জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে, তখন সেই সরকারকে বদলে দেওয়া বা উচ্ছেদ করা জনগণের অধিকার।

সুতরাং, নিজের দেশ যখন অন্যায়ভাবে অন্য কোনো দেশের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়, তখন সেই যুদ্ধে নিজের দেশের পরাজয় বা ব্যর্থতা কামনা করাও এক ধরণের দেশপ্রেম। কারণ, অন্যায়ের জয় মানেই মানুষের চিরস্থায়ী পরাজয়। ফলে দেশপ্রেমিক মার্কিনদের বুঝতে হবে- ট্রাম্পের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন থামাতে হলে আমেরিকার এই যুদ্ধে ব্যর্থ হওয়া প্রয়োজন।

একইসঙ্গে আমাদের আশা করতে হবে যেন ইরানের তরুণ প্রজন্ম তাদের স্বৈরাচারী ধর্মীয় শাসকদের হটিয়ে একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে। তবে সেই পরিবর্তন যেন ইরাক বা লিবিয়ার মতো সমাজকে ধ্বংস করে না দেয়। যুদ্ধের ধ্বংসলীলা নয়, বরং মানুষের মুক্তিই প্রকৃত দেশপ্রেমিকের কাম্য।

একটি দেশের সামরিক শক্তি যদি কেবল লুটপাট আর হত্যাকাণ্ডের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তবে সেই শক্তির দম্ভ চূর্ণ হওয়াই মঙ্গলের। অন্ধের মতো ‘আমার দেশ, ঠিক বা ভুল’ স্লোগান দেওয়াটা আজকের বাস্তবতায় আর দেশপ্রেম নয়, বরং অশুভের সঙ্গে আপস করা। প্রকৃত দেশপ্রেমিক তিনিই, যিনি অন্যায়ের মুখে নিজের দেশের বিরুদ্ধে দাঁড়াতেও দ্বিধা করেন না।

কাউন্টারপাঞ্চ অনলাইন থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর।

লেখক: নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির এমিরিটাস অধ্যাপক এবং ইস্ট অ্যাংলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক গবেষণা ফেলো।

    শেয়ার করুন: