পদ্মার বুকে নির্বাক এক চিৎকার

বাসটি পন্টুনের ওপর থেকে তলিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে আশপাশের মানুষের আহাজারি আর বাসের ভেতরের আর্তনাদ মিলিয়ে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা তৈরি হয়েছিল। মানুষ বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল, হাত বাড়িয়েছিল, চিৎকার করেছিল। কিন্তু কেউই যথেষ্ট কাছে পৌঁছাতে পারেনি। আচ্ছা, পৌঁছাতে পারলেও কি বাসটিকে থামানো যেত?
নির্বাক হয়ে কয়েক সেকেন্ডের ভিডিওটা দেখেছি আর ভেবেছি, বাসের ভেতরে পানিতে ডুবে থাকা মানুষগুলো কী করতে পারত? মা তার বাচ্চাকে জানালার বাইরে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। স্বামী তার স্ত্রীকে, ছেলে তার মাকে বাঁচাতে চেয়েছে। কিন্তু কেউ পারেনি। বাঁচার জন্য একজন আরেকজনকে টেনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে, তবু পারেনি। নিথর হয়ে বাসের ভেতর ভেসে থেকেছে। মুহূর্তেই সব শেষ।
উন্নত চিকিৎসার আশায় ঢাকায় রওনা হয়েছিলেন জাহাঙ্গীর আলম দম্পতি। তাদের সেই যাত্রা রূপ নিল জীবনের শেষ যাত্রায়। পদ্মা নদীতে তলিয়ে যাওয়া বাসে ছিলেন তারা। বাস উদ্ধার হলেও নিখোঁজ জাহাঙ্গীর আলম ও তার স্ত্রী মুক্তা খানম। চলছে স্বজনদের আহাজারি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র আহনাফ রাইয়ান। তারও ফেরার কথা ছিল ঢাকায়। সঙ্গে ছিল ভাগ্নি। এবারের ঈদে মায়ের সঙ্গে বাড়ি গিয়েছিলেন। ফেরার পথে বাসডুবির ঘটনায় এখনো নিখোঁজ তিনি। তবে মারা গেছেন তার মা। ছেলের খোঁজে ছুটছেন বাবা। কোথায় পাবেন সন্তান? পদ্মার বুকে, নাকি কোনো হাসপাতালের শীতল মেঝেতে?
আরেক মা সাহেদার কান্না যেন সব মা-বাবার হয়ে কথা বলে। তিনি বলছিলেন, ‘‘জ্যোৎস্নাকে আমি বাসে তুলে দিয়েছিলাম। বাড়ি গিয়ে তার সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলাম। তখন জ্যোৎস্না আমাকে বলে, ‘আম্মা, বাস পদ্মায় পড়ে যাচ্ছে’। এরপর আর কোনো কথা শুনিনি। আমার মেয়েটা ফোনে কথা বলতে বলতে নদীতে চলে গেল।’’ এটুকু বলেই অঝোরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন সাহেদা। ফোনের ওপারে মেয়ের শেষ কথা, তারপর নীরবতা। চিরনীরবতা।
কুষ্টিয়ার শৈলকুপার বাসিন্দা মনিরুজ্জামানের চোখের সামনেই তলিয়ে যায় বাস। ভেতরে ছিল তার স্ত্রী ও বড় সন্তান। তিনি শুধু দেখেছেন, আর কিছুই করার ছিল না। হাতের কাছে ছিল না কোনো নৌকা, ছিল না দড়ি, ছিল না উদ্ধারকর্মী। সময়টা যেন নিঃসঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল ঘাটে।
ঈদের ছুটি শেষে মায়ের সঙ্গে ঢাকায় ফিরছিল আট বছর বয়সী আলিফ। বাসটি যখন ফেরিতে উঠছিল, হঠাৎ উল্টে যায়। ‘আমি মায়ের কোলে বসে ছিলাম। মা আমাকে জানালা দিয়ে বের করে দেয়। সাঁতার কেটে ওপরে উঠে আসি, কিন্তু আমার মাকে আর খুঁজে পাচ্ছি না’— কাঁদতে কাঁদতে বলছিল আলিফ। মা জানালা দিয়ে ছেলেকে ঠেলে দিয়েছিলেন, নিজে পানির নিচে থেকে গেছেন। আলিফ বেঁচে গেছে, কিন্তু মা হারিয়ে গেছে। এই বয়সে এর চেয়ে বড় ক্ষতি আর কী হতে পারে।
শরিফ নামের এক যুবক কান্নায় ভেঙে পড়ে বলছিলেন, ‘ছেলে ও ভাগ্নি তো আর নেই, এখন তাদের লাশটা বুঝিয়ে দিন। টাকার দরকার নেই, সন্তানের লাশটা আমাকে বুঝিয়ে দিন। আর কিছু লাগবে না, আমার সব শেষ।’ টাকার দরকার নেই- কান্নার আড়ালে এ কথাটাই আরও করুণ। টাকা দিয়ে কি ফিরিয়ে আনা যায় ছেলের মুখ, ভাগ্নির হাসি?
রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ায় পদ্মায় বাসডুবির ঘটনায় বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা পর্যন্ত মোট ২৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ২১ জনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। চালকসহ তিনজনের লাশ রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে রাখা হয়েছে। কিন্তু হিসাবটা কি এখানেই থেমে থাকে? নিখোঁজ আরও অনেকে। কবে শেষ হবে এই শোকের হিসাব?
হয়তো শোনা যাবে- বাসের ড্রাইভার ছিল না কিংবা বাসের ব্রেক কাজ করেনি, কিংবা হেল্পার গাড়ি চালাচ্ছিল। হয়তো ড্রাইভার ঘুমের ঘোরে ছিল, নেশাগ্রস্ত ছিল কিংবা পন্টুনে কোনো ব্যারিকেডই ছিল না। এই ‘কিংবা’গুলো যেন প্রতিবারই নতুন-পুরোনো সুরে বাজে। ঘটনা ঘটে, তারপর তদন্ত কমিটি হয়, প্রতিবেদন জমা পড়ে, তারপর সব চাপা পড়ে যায়। আবার নতুন ঘটনা আসে। মৃত্যুর এই হিসাব পত্রিকার পাতার এক কোণায় সরে যায়।
এখন বাড়ি বাড়ি মাতম চলছে। কয়েকদিন পর তা থেমে যাবে। আবার অন্য কোথাও নতুন মাতম শুরু হবে। যে দেশে জন্মই যেন আজন্ম পাপ, সেখানে এসব মৃত্যুর মূল্য কোথায়?
আজ মহান স্বাধীনতা দিবস। কত বছর হলো দেশ স্বাধীন হয়েছে। এই স্বাধীনতার দিনে পদ্মার বুকে ডুবে গেল কত স্বপ্ন, কত মা-বাবার সংসার, কত শিশুর পৃথিবী। স্বাধীনতার অর্থ কি শুধুই পতাকা উত্তোলন আর কুচকাওয়াজ? নাকি নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ নৌপথ, নিরাপদ ঘাট? প্রতিটি প্রাণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও কি স্বাধীনতার অংশ নয়?
পদ্মার ঢেউ এখনো কলকল করছে। যেন চিৎকার করে বলছে, ফিরিয়ে দাও আমাদের মানুষগুলোকে। ফিরিয়ে দাও মাকে, ফিরিয়ে দাও সন্তানকে, ফিরিয়ে দাও স্বামী-স্ত্রীকে। কিন্তু পদ্মার বুকে শুধুই নীরবতা। আর আমাদের বুকে এক গভীর প্রশ্ন- এই নির্বাক যন্ত্রণার শেষ কোথায়?
বাসডুবির ঘটনায় যারা আপনজন হারিয়েছেন, তাদের প্রতি রইল গভীর সমবেদনা। কিন্তু সমবেদনা দিয়ে কি চলে? প্রশ্ন থেকে যায়। প্রতিবারই থেকে যায়।



