দৃষ্টিপাত
বাবার রক্তে ভেজা উঠান, সন্তানের ক্রোধে আহত সমাজ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শুক্রবার মুসলমানদের কাছে পবিত্র এক দিন। বহু পরিবারে এদিনের সকাল শুরু হয় পরিচ্ছন্নতা, নামাজের প্রস্তুতি আর ঘরোয়া ব্যস্ততায়। সেই দিনের এমন এক সকালে একজন বাবা জুমার নামাজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ঠিক তখনই ছেলে এসে বসে সম্পত্তির ভাগ দাবি নিয়ে। কথার পর কথা বাড়তে বাড়তে একসময় তা পৌঁছে যায় ভয়াবহ পরিণতিতে। ছেলে ঘর থেকে ছুরি এনে বাবার ওপর হামলা করে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই একজন বাবা নিথর হয়ে পড়ে থাকেন নিজের ঘরে, নিজের সন্তানের হাতে।
কেরানীগঞ্জের ঘটনাটি যতটা নির্মম, রাঙ্গুনিয়ার ঘটনাও ততটাই হতবাক করে। গভীর রাতে বাবা-মায়ের ঝগড়া চলছিল। সংসারে মতবিরোধ নতুন কিছু নয়। স্বামী-স্ত্রীর তর্ক, অভিমান, অশান্তি বহু পরিবারেই ঘটে। কিন্তু সেই বিরক্তি থেকে ছেলে ঘরে ঢুকে বাবার ওপর হামলা করে, পরে তিনি মারা যান। আরও শোকাবহ হলো, ছেলেকে বাঁচাতে মা ঘরের রক্ত মুছে ঘটনাকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এই দৃশ্য শুধু অপরাধের নয়, মূল্যবোধেরও পতনের ছবি।
দেশের নানা প্রান্তে একই ধরনের সংবাদ বারবার সামনে আসছে। কোথাও জমি নিয়ে বিরোধ, কোথাও পারিবারিক কলহ, কোথাও সামান্য তর্ক। আর এসব কারণেই সন্তান বাবাকে হত্যা করছে। যে মানুষটি সন্তানের প্রথম আশ্রয়, প্রথম শিক্ষক, প্রথম নিরাপত্তা, তাকেই আজ কেউ কেউ প্রতিপক্ষ মনে করছে। আসলে আমরা কোথায় এসে দাঁড়িয়েছি?
পারিবারিক সম্পর্কের ভাঙন এক দিনে তৈরি হয় না। দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, লোভ, অবিশ্বাস, মানসিক অস্থিরতা, নেশা, অসহিষ্ণুতা, পারিবারিক যোগাযোগের অভাব, নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি- সব মিলিয়েই এমন ভয়ংকর বিস্ফোরণ ঘটে। আজকের সমাজে মানুষ দ্রুত রেগে যায়, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়, দ্রুত আঘাত করে। কিন্তু ধৈর্য শেখার জায়গাগুলো ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
আরেকটি বাস্তবতা হলো, সম্পত্তি এখন অনেক পরিবারে সম্পর্কের চেয়ে বড় হয়ে উঠছে। জমি, টাকা, উত্তরাধিকার, দখল, ভাগবাটোয়ারা নিয়ে যে বিষ জমছে, তা একসময় রক্তপাত ডেকে আনছে। অথচ সম্পদ মানুষের জীবন সহজ করার কথা, সম্পর্ক ধ্বংস করার নয়।
বাঙালি সংস্কৃতিতে বাবা-মা সম্মানের প্রতীক। ইসলামেও বাবা-মার মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। তাদের সঙ্গে সদাচরণ ইবাদতের অংশ বলা হয়েছে। এত ধর্মীয় আয়োজন, এত সামাজিক প্রচার, এত নৈতিকতার ভাষণ, তারপরও যদি ঘরে ঘরে শ্রদ্ধাবোধ কমে যায়, তবে আমাদের আত্মসমালোচনা জরুরি।
শুধু আইন করে এ সমস্যা থামানো যাবে না। প্রয়োজন পরিবারে সংলাপ ফিরিয়ে আনা। সন্তানকে ছোটবেলা থেকে রাগ নিয়ন্ত্রণ শেখাতে হবে, সহমর্মিতা শেখাতে হবে, অধিকার যেমন আছে, তেমনি দায়িত্বও আছে তা বোঝাতে হবে। বাবা-মাকেও সন্তানের সঙ্গে দূরত্ব নয়, বোঝাপড়ার সম্পর্ক গড়তে হবে।
এখনো সময় আছে থামার। এখনো সময় আছে ঘরে ঘরে শ্রদ্ধা, সংযম ও মানবিকতার আলো ফিরিয়ে আনার। নইলে খবরের কাগজে এমন শিরোনাম আরও বাড়বে, আর আমরা প্রতিবারই বলব, খুব খারাপ লাগছে। কিন্তু তখন হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে।



