খাল খনন
স্মৃতি ফেরানো, নাকি সময়ের প্রয়োজন

সংগৃহীত ছবি
দেশের ৫৪ জেলায় আজ খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম ধাপে ছয় মাসে ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার এবং পর্যায়ক্রমে পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী, নালা ও খাল খননের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষি পুনরুজ্জীবনের উদ্দেশ্যে খাল খনন কর্মসূচি চালু করেছিলেন। দীর্ঘ ৪৯ বছর পর আবারও সেই উদ্যোগ তার সুযোগ্য সন্তান তারেক রহমান সামনে নিয়ে এসেছেন।
প্রশ্নটি তাই স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে। খাল খনন কি শুধুই অতীতের ঐতিহ্য ধরে রাখার প্রয়াস, নাকি এটি আজকের বাস্তব প্রয়োজন?
বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতি নদী ও পানির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গ্রামীণ জীবন, কৃষি এবং যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্গে নদী, খাল ও বিলের বিস্তৃত জলপথ জড়িয়ে আছে। একসময় গ্রামের পর গ্রাম সংযুক্ত ছিল এসব খালের মাধ্যমে। বর্ষার অতিরিক্ত পানি সহজে বেরিয়ে যেত, আবার শুষ্ক মৌসুমে সেই খালের পানিই হয়ে উঠত কৃষির প্রধান ভরসা।
আধুনিক সেচব্যবস্থা চালু হওয়ার আগেও খাল ছিল প্রাকৃতিক জল ব্যবস্থাপনার মূল মাধ্যম। বর্ষার পানি ধরে রাখা, প্রয়োজনমতো সেচ দেওয়া এবং অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশন করা সম্ভব হতো এই জলপথগুলোর মাধ্যমে। ফলে কৃষি উৎপাদন ও গ্রামীণ জীবনে খালের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে পরিকল্পিতভাবে খাল খনন কর্মসূচি নতুন গতি পায়। কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, জলাবদ্ধতা কমানো এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল করার লক্ষ্যেই তখন এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। অনেক এলাকায় স্থানীয় মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খননের কাজে অংশ নেন। কোথাও প্রশাসনের উদ্যোগ, কোথাও গ্রামবাসীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় খাল পরিষ্কার করা হয়।
অনেক প্রবীণ মানুষের স্মৃতিতে এখনো আছে সেই সময়ের কথা। একটি খাল খনন মানে ছিল পুরো গ্রামের অংশগ্রহণে বড় একটি উদ্যোগ। খাল পরিষ্কার হলে পানি দ্রুত নামত, জমিতে সেচ দেওয়া সহজ হতো, নৌকায় চলাচলও বাড়ত। ফলে কৃষি উৎপাদনের পাশাপাশি গ্রামীণ যোগাযোগেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছিল।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই খালগুলোর অনেকই হারিয়ে যেতে শুরু করে। কোথাও দখল, কোথাও ভরাট, আবার কোথাও অপরিকল্পিত বসতি ও রাস্তা নির্মাণের কারণে খালের প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। অনেক এলাকায় খালের অস্তিত্বই প্রায় বিলীন হয়ে গেছে।
এর প্রভাব ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়েছে। বর্ষায় জলাবদ্ধতা বেড়েছে, আবার শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বাড়তে শুরু করেছে। পরিবেশবিদদের মতে, নদী ও খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হলে তার প্রভাব শুধু কৃষিতে নয়, পুরো পরিবেশ ব্যবস্থায়ই পড়ে।
এই বাস্তবতায় খাল খননের বিষয়টি আবারও গুরুত্ব পাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জলাবদ্ধতা, পানির সংকট এবং কৃষির টেকসই ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও এই প্রয়োজনকে আরও স্পষ্ট করেছে। অস্বাভাবিক বৃষ্টি, দীর্ঘ খরা কিংবা হঠাৎ বন্যার মতো পরিস্থিতিতে কার্যকর জলব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি। নদী ও খালের নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকলে বর্ষার অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশন করা যায়। আবার প্রয়োজনের সময় সেই পানি ধরে রাখাও সম্ভব হয়। এতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমে এবং কৃষি উৎপাদন স্থিতিশীল থাকে।
খাল খনন তাই শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়। এটি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ভূ-প্রকৃতি, কৃষি এবং গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে জড়িত একটি মৌলিক বিষয়। ইতিহাসে এর শিকড় আছে, মানুষের স্মৃতিতেও আছে। তবে এর গুরুত্ব শুধু অতীতের কারণে নয়। বর্তমান ও ভবিষ্যতের প্রয়োজনও এটিকে নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।
বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজের এখনো অনেক প্রবীণ মানুষ বলেছেন, একটি খাল পরিষ্কার হলেই গ্রামের জমিতে নতুন প্রাণ ফিরে আসত। সেই স্মৃতির ভেতরেই হয়তো লুকিয়ে আছে আজকের বাস্তবতার উত্তর। খাল খনন শুধু ইতিহাসকে স্মরণ করা নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য পানির পথ খুলে দেওয়ারও একটি প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত।

