পদ্মায় বাসডুবি
ভেসে ওঠা চিহ্ন, হারিয়ে যাওয়া প্রাণ

ছবিঃ আগামীর সময়
পন্টুনের লোহার ঠান্ডা বেদি। কিছুদিন আগে এখানেই ছিল প্রাণের চাঞ্চল্য, দোদুল্যমান ফেরির যাত্রীদের পদচারণা। আজ সেখানে নিস্তব্ধতা আর অদ্ভুত শূন্যতা। সেই শূন্যতায় চিৎকার করছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কিছু চিহ্ন। যেন জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত সঙ্গে ছিল, কিন্তু আজ মালিকহারা।
পন্টুনে একটি ট্রাভেল পিলো পড়ে আছে। যাত্রার ক্লান্তি দূর করার সঙ্গী আজ নিঃসঙ্গ। পাশেই হিল আর স্যান্ডেল। কে জানত, এই জুতাগুলো শেষ পা ফেলার সাক্ষী হয়ে থাকবে? একটু দূরে ভ্যানিটি ব্যাগ, তার পাশে ওড়না। সম্ভবত ঘোমটার আড়ালে লাজুক হাসিটা আজ নেই, নেই সেই মুখ।
সবচেয়ে বেশি চোখ জুড়িয়ে যায় কালো রঙের স্নিকার্সটি। এখনো চকচক করছে। এই ঈদেই কেনা হয়েছিল। হয়তো এক দিন পরেছে। বাসায় ফিরে আবার পরার স্বপ্ন ছিল। কিন্তু স্বপ্নগুলি অসমাপ্ত থেকে গেল। যে পায়ে এই জুতো ছিল, সেই পা আর ফিরবে না।
ডুবে যাওয়া বাস যখন উঠানো হলো, তখন ভেসে উঠেছে এসব। রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের ৩ নম্বর পন্টুন এখন ২৬টি প্রাণ হারানোর শোকে স্তব্ধ। প্রতিটি জিনিস যেন একটি করে কাহিনী বলে যাচ্ছে।
সকালে যখন হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো এসব ছবি দেখছিলাম, আমার ভেতরটা কেমন হু-হু করে উঠল। কিছুক্ষণ পর আগামীর সময়ের মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি সোহেল ফোন দিয়ে বলল, ভাই, ছবিগুলো তুলতে গিয়ে তো অস্থির লাগছে। বুকটা ভারী হয়ে গেছে।
সত্যিই তাই। মানুষ নেই। রয়ে গেছে শুধু তাদের স্মৃতি। আর সেই স্মৃতিগুলো আজ পন্টুনের বেদিতে পড়ে আছে। পন্টুন যেন এখন কান্নার বেদি।
আমরা কি ভুলে যেতে পারি? এই ট্রাভেল পিলোর মালিক কত স্বপ্ন দেখেছিলেন? এই ওড়নার মালিক কাদের জন্য প্রাণ ভরে ভালোবেসেছিলেন? এই নতুন জুতার মালিক কত আগ্রহ নিয়ে ঈদের দিন সকালে জুতো পায়ে দিয়েছিলেন?
কেউ ফিরবে না। কিন্তু এই জিনিসগুলো স্মৃতি হয়ে থাকবে। প্রমাণ হয়ে থাকবে যে, এখানে কেউ ছিল। তারা বেঁচে ছিল। তারা হেসেছিল, স্বপ্ন দেখেছিল, ভালোবেসেছিল। আর আজ তাদের অনুপস্থিতি পন্টুনকে কান্নার জায়গায় পরিণত করেছে।
যত দিন এই পন্টুন থাকবে, তত দিন এই স্মৃতি-চিহ্ন ভেসে বেড়াবে নদীর জলের মতো চিরকাল।



