ঈদযাত্রা মানেই কী প্রাণ হাতে নিয়ে চলা!

সংগৃহীত ছবি
ঈদ মানে আনন্দ, পরিবার-পরিজনের সঙ্গে মিলন, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর একসঙ্গে থাকার সুখ। কিন্তু বাস্তবতা যেন বারবার এই আনন্দকে ছাপিয়ে যাচ্ছে গভীর বেদনা দিয়ে। এবারের ঈদও তার ব্যতিক্রম নয়। সড়ক, রেল, নৌ—সব পথেই যেন মৃত্যুর মিছিল। ট্রেনে কাটা পড়ে ১২ জন, সদরঘাটে লঞ্চের চাপায় প্রাণ গেছে ২ জনের, আর সড়ক দুর্ঘটনার হিসাব ঈদের ৭ দিনে ২০৪ । সর্বশেষ গোয়ালন্দে বাস ডুবে প্রাণ হারিয়েছেন ২৩ জন। এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়, প্রতিটি সংখ্যা একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন, একটি জীবনের করুণ পরিসমাপ্তি।
প্রশ্ন জাগে—তাহলে ঈদ কোথায়? ঈদযাত্রা মানেই কি প্রাণ হাতে নিয়ে চলা? যে ঈদ আনন্দের কথা বলে, তা কি এই কান্নার ভেতর সজীব থাকতে পারে? নাকি আমরা ধীরে ধীরে এমন এক বাস্তবতার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি, যেখানে উৎসব মানেই ঝুঁকি, যাত্রা মানেই অনিশ্চয়তা?
প্রতি বছরই ঈদকে কেন্দ্র করে ঘরমুখো মানুষের ঢল নামে। রাজধানীসহ বড় শহরগুলো ফাঁকা হয়ে যায়, আর গ্রামমুখী সড়ক, রেলপথ ও নৌপথে তৈরি হয় তীব্র চাপ। কিন্তু এই চাপ সামাল দেওয়ার মতো শতভাগ প্রস্তুতি কি আমাদের থাকে? বাস্তবতা বলছে—না। অতিরিক্ত যাত্রী বহন, অদক্ষ চালক, ক্লান্তিহীন ড্রাইভিং, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং নিয়ন্ত্রণহীন প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে যাত্রাপথ হয়ে ওঠে এক বিপজ্জনক ফাঁদ।
সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম বড় কারণ হলো বেপরোয়া গতি এবং নিয়ম না মানার প্রবণতা। অনেক চালক সময় বাঁচাতে গিয়ে ঝুঁকি নেন, যা শেষ পর্যন্ত প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। অন্যদিকে রেলপথে নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং সচেতনতার অভাবও বড় ভূমিকা রাখে। নৌপথে অতিরিক্ত যাত্রী ও নিরাপত্তা অবহেলা প্রায়ই দুর্ঘটনার কারণ হয়।
তাহলে সমাধান কোথায়?
অর্ধলক্ষ কিংবা তারও অধিক মানুষের একসঙ্গে ঢাকা ত্যাগের এই বিশাল চাপ হয়তো পুরোপুরি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু তারপরও সবার আগে দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। সরকারকে ঈদের এক মাস আগে থেকে ‘অপারেশন সেফ জার্নি’ ঘোষণা করতে হবে। বিআরটিএ ও পুলিশকে কঠোর নির্দেশ দিতে হবে—কোনো ওভারলোড গাড়ি রাস্তায় নামবে না। গতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মহাসড়কে চলবে না কোনো নসিমন-করিমন।
চালকদের জন্য বাধ্যতামূলক রেস্ট পয়েন্ট ও ড্রাগ টেস্ট চালু করতে হবে। সড়কগুলোর মেরামত নিশ্চিত করতে হবে। মহাসড়কে মোতায়েন করতে হবে অতিরিক্ত পুলিশ।
নৌপথে সদরঘাটসহ সব ঘাটে যাত্রী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করা। লঞ্চের ক্যাপাসিটি অনুসারে টিকিট বিক্রি, অতিরিক্ত যাত্রী উঠলে জরিমানা ও লাইসেন্স বাতিল। রেলপথে অতিরিক্ত ট্রেন চালু, রেলক্রসিং গেটগুলো শতভাগ নিরাপদ রাখা এবং অনলাইন টিকিট ব্যবস্থা আরও সহজ করার পথ খুঁজতে হবে।
প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ানো যেতে পারে। সিসিটিভির নজরদারি, ডিজিটাল টিকিটিং এবং যানবাহনের ফিটনেস মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করলে নিয়ন্ত্রণ আরও কার্যকর হতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। জীবন যে সবচেয়ে মূল্যবান—এই উপলব্ধি যদি ব্যক্তি, চালক, মালিক ও কর্তৃপক্ষ- সবার মধ্যে সমানভাবে কাজ করে, তবেই পরিবর্তন সম্ভব।
ঈদ আনন্দের, কিন্তু সেই আনন্দ যেন কারও জীবনের বিনিময়ে না আসে। কান্না নয়, হাসিই হোক ঈদের প্রকৃত ভাষা।

