হাদিসের কথা
রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় সংযম ও আনুগত্যের প্রয়োজনীয়তা
- রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় সংযম ও আনুগত্যের ইসলামী নীতি

প্রতীকী ছবি
সমাজ যখন বিশৃঙ্খলার দিকে গড়ায়, তখন সবচেয়ে আগে ভেঙে পড়ে মানুষের পারস্পরিক আস্থা ও শৃঙ্খলা। নেতৃত্বের প্রতি অবিশ্বাস, আবেগপ্রসূত প্রতিক্রিয়া এবং দলাদলি; এসবেই একটি জাতিকে ধীরে ধীরে অস্থিতিশীল করে তোলে। ইসলাম এই বাস্তবতাকে গভীরভাবে অনুধাবন করে নেতৃত্ব, আনুগত্য এবং ধৈর্যের একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি উপস্থাপন করেছে। সেই প্রেক্ষাপটে হাদিসে নববীতে বিশেষ তাৎপর্য বহন করা অনেব বক্তব্য রয়েছে। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে-
عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ عَنْ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ مَنْ كَرِهَ مِنْ أَمِيرِهِ شَيْئًا فَلْيَصْبِرْ فَإِنَّهُ مَنْ خَرَجَ مِنْ السُّلْطَانِ شِبْرًا مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّةً.
ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: কোনো লোক যদি আমীরের কোনো কিছু অপছন্দ করে, তাহলে সে যেন ধৈর্য ধারণ করে। কেননা, যে লোক সুলতানের আনুগত্য থেকে এক বিঘতও সরে যাবে, তার মৃত্যু হবে জাহিলী যুগের মৃত্যুর মতো। (সহিহ বুখারি, হাদিস ৭০৫৩)
এই হাদিসে মূলত দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে। (১) শাসকের কোনো সিদ্ধান্ত বা আচরণ অপছন্দ হলেও তাৎক্ষণিক বিদ্রোহ বা বিচ্ছিন্নতার পথে না গিয়ে ধৈর্য অবলম্বন করা। (২) সংগঠিত নেতৃত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা।
এখানে ‘ধৈর্য ধারণ’ বলতে অন্যায়ের সমর্থন বোঝানো হয়নি; বরং বোঝানো হয়েছে, হঠকারী প্রতিক্রিয়া থেকে নিজেকে সংযত রাখা, যাতে বৃহত্তর সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি না হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে সমাজের স্থিতিশীলতা একটি বড় নিয়ামত। যদি প্রতিটি ব্যক্তি নিজের অসন্তোষের ভিত্তিতে নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, তাহলে তা দ্রুত বিশৃঙ্খলা ও সংঘাতের জন্ম দিতে পারে। যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জন্যই ক্ষতির কারণ হয়।
হাদিসে বর্ণিত ‘জাহিলী যুগের মৃত্যু’ এই বাক্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মুহাদ্দিসগণ ব্যাখ্যা করেছেন, এর অর্থ হলো এমন একটি অবস্থায় মৃত্যু, যেখানে ব্যক্তি সংগঠিত মুসলিম সমাজ ও বৈধ নেতৃত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, ঠিক যেমন জাহিলী যুগে কোনো কেন্দ্রীয় শৃঙ্খলা ছিল না। এটি ঈমানহীন মৃত্যু বোঝায় না; বরং শৃঙ্খলাহীন, বিভক্ত ও বিশৃঙ্খল অবস্থার প্রতি ইঙ্গিত করে।
ইমাম নববী (রহ.) উল্লেখ করেন, এই হাদিস মুসলিম সমাজকে ফিতনা ও গৃহদ্বন্দ্ব থেকে রক্ষা করার একটি মৌলিক নীতি শিক্ষা দেয়। শাসকের কিছু অন্যায় বা সীমাবদ্ধতা থাকলেও, যদি তা স্পষ্ট কুফরি পর্যায়ে না পৌঁছে, তাহলে তার বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহে জড়ানো থেকে বিরত থাকা উচিত; কারণ এতে ক্ষতি বেশি, উপকার কম।
আধুনিক মুসলিম স্কলারগণও এই হাদিসকে বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করে বলেন, এখানে মূল বার্তা হলো; সংগঠিত সমাজব্যবস্থা রক্ষা করা এবং পরিবর্তনের জন্য জ্ঞান, নৈতিকতা ও শান্তিপূর্ণ পন্থা অবলম্বন করা।
শাইখ ইউসুফ আল-কারযাভী (রহ.) তার লেখায় উল্লেখ করেছেন, ইসলাম অন্ধ আনুগত্য চায় না; বরং ন্যায়ভিত্তিক সমালোচনা, পরামর্শ (নসীহা) এবং গঠনমূলক সংশোধনের পথকে উৎসাহিত করে।
সৌদি আরবের প্রখ্যাত আলেম, সিনিয়র উলামা কাউন্সিলের সদস্য ও বহু ইসলামী গ্রন্থের রচয়িতা শাইখ সালিহ আল-ফাওযান বলেন, শাসকের ভুল সংশোধনের সঠিক পদ্ধতি হলো গোপনে উপদেশ দেওয়া এবং ফিতনা সৃষ্টি না করা।
সমসাময়িক চিন্তাবিদরা আরও বলেন, আজকের যুগে এই হাদিসের শিক্ষা শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রেই নয়; বরং যেকোনো সংগঠন, প্রতিষ্ঠান বা সামাজিক কাঠামোর জন্য প্রযোজ্য। নেতৃত্বের প্রতি দায়িত্বশীল আনুগত্য এবং ভুলের ক্ষেত্রে সংযত প্রতিক্রিয়া; এই ভারসাম্যই একটি সুস্থ সমাজ গঠনের ভিত্তি।
এই হাদিস আমাদের শেখায় যে, আবেগ নয়, প্রজ্ঞাই হওয়া উচিত প্রতিক্রিয়ার ভিত্তি। নেতৃত্বের ভুল থাকতে পারে, কিন্তু তা সংশোধনের পথ যেন এমন না হয়, যা পুরো সমাজকে অস্থিতিশীল করে তোলে। ধৈর্য, শৃঙ্খলা ও গঠনমূলক সমালোচনার মধ্য দিয়েই ইসলাম একটি স্থিতিশীল ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজব্যবস্থার দিকনির্দেশনা দেয়।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক
saifpas352@gmail.com



