হাদিসের কথা
যাকে তাকে কাফির বলার ভয়াবহ পরিণতি

প্রতীকী ছবি
মানুষের জিহ্বা ছোট, কিন্তু তার প্রভাব অনেক বিস্তৃত ও গভীর। এই জিহ্বার মাধ্যমেই মানুষ ঈমানের স্বীকৃতি দেয়, আবার অসতর্ক ব্যবহারে নিজেকেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। অনেক সময় মানুষ রাগ, আবেগ কিংবা হালকা মনে করে এমন সব কথাও বলে ফেলে, যার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে; তা সে উপলব্ধিই করতে পারে না। শপথ, লা’নাত, অপবাদ কিংবা কাউকে কুফরীর সাথে সম্পৃক্ত করা; এসব বিষয় ইসলামে কেবল নৈতিক বিচ্যুতি নয়, বরং ঈমান ও আখিরাতের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত গুরুতর বিষয়।
এই প্রেক্ষাপটে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের কথার দায়িত্বশীলতা ও তার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। একটি হাদিসে আমাদের সামনে সেই বাস্তবতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে,
সাবিত ইবনে যাহহাক (রা.) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো ধর্মের মিথ্যা শপথ করে, সে যা বলে তা-ই হবে। আর যে বস্তু দিয়ে কেউ আত্মহত্যা করবে, জাহান্নামের আগুনে তাকে সেই বস্তু দিয়েই শাস্তি দেয়া হবে। ঈমানদারকে লা’নাত করা (অভিশাপ দেয়া), তাকে হত্যা করার সমতুল্য। আর কেউ কোনো ঈমানদারকে কুফরীর অপবাদ দিলে, তাও তাকে হত্যা করার সমতুল্য হবে। (বুখারি, হাদিস ৬১০৫)
হাদিসটি মানুষের জিহ্বা ও আচরণের চারটি গুরুতর বিচ্যুতি একত্রে তুলে ধরেছে। এক. মিথ্যা শপথ, দুই. আত্মহত্যা, তিন. মুমিনকে লা‘নাত করা, চার. কুফরের অপবাদ দেওয়া।
প্রতিটি বিষয়ই ঈমানের নিরাপত্তা ও সামাজিক শৃঙ্খলার সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। আলেমগণ এই হাদিসকে ‘তাহযীর’ (কঠোর সতর্কবার্তা) হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
হাদিসের প্রথমাংশে বলা হয়েছে, ‘যে কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো ধর্মের মিথ্যা শপথ করে, সে যা বলে তা-ই হবে’। ইমাম নববী (রহ.) এ প্রসঙ্গে বলেছেন, এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে কঠোরভাবে নিষেধ করা; কেউ যেন ‘আমি ইহুদি/খ্রিস্টান হয়ে যাব’; এ ধরনের শপথকে হালকাভাবে না নেয়। যদি সে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা শপথ করে, তাহলে তা গুরুতর গুনাহ; তবে অধিকাংশ আহলে সুন্নাহর মতে, এর দ্বারা সে বাস্তবে সেই ধর্মে প্রবেশ করে না, বরং এটি ভয়াবহ পাপ হিসেবে গণ্য হয়। (আন-নববী, শারহু সহিহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান)
হাদিসের দ্বিতীয়াংশে আত্মহত্যার ভয়াবহতা তুলে ধরা হয়েছে; ‘যে বস্তু দিয়ে কেউ আত্মহত্যা করবে, জাহান্নামে তাকে সেই বস্তু দিয়েই শাস্তি দেওয়া হবে’। ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) বলেন, এখানে শাস্তির ধরনকে প্রতীকীভাবে তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ যে যেভাবে নিজের জীবন নষ্ট করেছে, আখিরাতে সেই উপায়েই তার জন্য শাস্তি নির্ধারিত হবে। তবে আহলে সুন্নাহর আকীদা অনুযায়ী, আত্মহত্যাকারী মুসলিম যদি ঈমানের ওপর মৃত্যুবরণ করে, তাহলে সে চিরস্থায়ী জাহান্নামী নয়; বরং আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাকে ক্ষমা করতে পারেন, নচেৎ শাস্তি দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। (ইবনে হাজার, ফাতহুল বারী, হাদিস ৬১০৫-এর ব্যাখ্যা)
হাদিসের তৃতীয়াংশে বলা হয়েছে, ‘ঈমানদারকে লা‘নাত করা তাকে হত্যা করার সমতুল্য’। এখানে ‘সমতুল্য’ বলতে বাস্তব হত্যার সমান হুকুম বোঝানো হয়নি; বরং এর ভয়াবহতার কথা বোঝানো হয়েছে। ইমাম নববী (রহ.) বলেন, একজন মুমিনকে লা‘নাত করা মানে তাকে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হওয়ার দোয়া করা। যা ইসলামী ভ্রাতৃত্ববোধের পরিপন্থী এবং বড় গুনাহ। (ইমাম নববী, রিয়াদুস সালিহীন ও এর শারহসমূহ)
হাদিসের শেষাংশে এসেছে, ‘কোনো মুমিনকে কুফরের অপবাদ দেওয়া তাকে হত্যা করার সমতুল্য’। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) ও অন্যান্য আলেম এর ব্যাখ্যায় বলেন, কাউকে ‘কাফির’ বলা অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়; এটি শরয়ী দলিল ছাড়া করা হলে মারাত্মক অন্যায়। কারণ এতে তার ধর্মীয় পরিচয় ও সম্মান ধ্বংসের মুখে পড়ে, যা সামাজিকভাবে তাকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে। এ কারণে একে ‘হত্যার সমতুল্য’ বলা হয়েছে। অর্থাৎ তার সম্মান ও অবস্থানকে ধ্বংস করার দিক থেকে এটি অত্যন্ত ভয়াবহ। (ইবনে তাইমিয়্যাহ, আস-সারিমুল মাসলুল; ইবনে হাজার, ফাতহুল বারী)
মোটকথা, এই হাদিস মুসলিম জীবনে কথার দায়িত্বশীলতা, জীবনের মর্যাদা এবং অপরের ঈমান ও সম্মানের প্রতি সংবেদনশীলতা প্রতিষ্ঠা করে। জিহ্বার একটি অসতর্ক উচ্চারণ মানুষকে মারাত্মক গুনাহে নিমজ্জিত করতে পারে। এ হাদিস সেই সত্যকেই গভীরভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়।
মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে সঠিকত বুঝ দান করুন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক
saifpas352@gmail.com



