হাদিসের কথা
যে তিন গুণ মানুষকে আল্লাহর প্রিয় করে
- যাদের ভালোবাসেন আল্লাহ
- তাকওয়া ও ইখলাসের মহিমা

প্রতীকী ছবি
মানুষের জীবনে সফলতার বহু মানদণ্ড তৈরি হয়েছে। কেউ ধন-সম্পদে বড় হতে চায়, কেউ খ্যাতিতে, কেউ ক্ষমতায়। পৃথিবীর চোখে পরিচিত হওয়া, মানুষের প্রশংসা পাওয়া এবং বাহ্যিক জৌলুস অর্জন করাকেই অনেকে জীবনের সার্থকতা মনে করে। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত সফলতা অন্য জায়গায়। আল্লাহর কাছে সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যার অন্তর তাকওয়ায় পরিপূর্ণ, যার জীবন রিয়া ও লোকদেখানো থেকে মুক্ত এবং যে মানুষের মুখাপেক্ষী না হয়ে একমাত্র আল্লাহর ওপর নির্ভর করে জীবন কাটায়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষের সামনে আদর্শ মুমিনের পরিচয় তুলে ধরে বলেছেন,
حَدَّثَنِي عَامِرُ بْنُ سَعْدٍ، قَالَ كَانَ سَعْدُ بْنُ أَبِي وَقَّاصٍ فِي إِبِلِهِ فَجَاءَهُ ابْنُهُ عُمَرُ فَلَمَّا رَآهُ سَعْدٌ قَالَ أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ شَرِّ هَذَا الرَّاكِبِ فَنَزَلَ فَقَالَ لَهُ أَنَزَلْتَ فِي إِبِلِكَ وَغَنَمِكَ وَتَرَكْتَ النَّاسَ يَتَنَازَعُونَ الْمُلْكَ بَيْنَهُمْ فَضَرَبَ سَعْدٌ فِي صَدْرِهِ فَقَالَ اسْكُتْ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ " إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْعَبْدَ التَّقِيَّ الْغَنِيَّ الْخَفِيَّ " .
আমির ইবনু সা’দ (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, সা’দ ইবনু ওয়াক্কাস (রাযিঃ) একদা তার উটের পালের মাঝে উপবিষ্ট ছিলেন, এমতাবস্থায় তার পুত্র উমার এসে পৌছলেন। সা’দ (রাযিঃ) তাকে দেখামাত্রই পাঠ করলেন, “আউযু বিল্লা-হি মিন্ শাররি হা-যার র-কিব" অর্থাৎ- আমি এ আরোহীর অনিষ্ট হতে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। তারপর সে তার আরোহী হতে নেমে বলল, আপনি লোকেদেরকে ছেড়ে দিয়ে উষ্ট্রী এবং বকরীর মাঝে এসে বসে আছেন, আর এদিকে কর্তৃত্ব নিয়ে লোকেরা পরস্পর একে অপরের সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত। এ কথা শুনে সা’দ (রাযিঃ) তার বুকে আঘাত করে বললেন, চুপ থাকো। আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এ কথা বলতে শুনেছি যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মুত্তাকী, আত্মনির্ভরশীল ও লোকালয় হতে নির্জনে বাসকারী বান্দাকে আল্লাহ তা’আলা ভালোবাসেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৯৬৫)
এই হাদিসটি সেই সৌভাগ্যবান বান্দাদের পরিচয় দেয়, যাদেরকে হয়তো পৃথিবী খুব বেশি চেনে না, কিন্তু আসমানে তাদের পরিচয় অত্যন্ত উজ্জ্বল।
এই হাদিসে একজন আল্লাহভীরু মুমিনের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ তুলে ধরা হয়েছে।
প্রথম গুণ হলো “التَّقِيّ” অর্থাৎ মুত্তাকি। তাকওয়া হলো মানুষের অন্তরে আল্লাহভীতি জাগ্রত থাকা এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলা। মুত্তাকি ব্যক্তি শুধু মানুষের সামনে ভালো হওয়ার চেষ্টা করে না; বরং একাকীত্বেও আল্লাহকে ভয় করে। সে গোপনে যেমন পাপ থেকে বাঁচে, প্রকাশ্যেও তেমন সতর্ক থাকে। পবিত্র কুরআনেও মহান আল্লাহ বলেছেন—‘নিশ্চয় আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই অধিক সম্মানিত, যে অধিক মুত্তাকি।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ১৩)
তাকওয়া মানুষকে আত্মশুদ্ধি শেখায়। এটি কেবল পোশাক, দাড়ি বা বাহ্যিক পরিচয়ের নাম নয়; বরং হৃদয়ের এমন এক জাগরণ, যা মানুষকে অন্যায় থেকে ফিরিয়ে আনে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করে।
দ্বিতীয় গুণ হলো “الْغَنِيّ” অর্থাৎ অমুখাপেক্ষী বা আত্মমর্যাদাসম্পন্ন। এখানে ধনী বলতে কেবল সম্পদের প্রাচুর্য বোঝানো হয়নি। বরং সেই ব্যক্তি বোঝানো হয়েছে, যে মানুষের কাছে হাত পাতে না এবং নিজের অন্তরকে আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল রাখে। ইবনে উসাইমিন (রহ.) ব্যাখ্যা করেছেন, ‘গনি’ হলো সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহর মাধ্যমে মানুষের মুখাপেক্ষিতা থেকে মুক্ত থাকে।
ইসলাম মানুষকে আত্মমর্যাদা শেখায়। মুমিনের হৃদয় আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাই সে মানুষের প্রশংসা, দান বা স্বীকৃতির জন্য নিজেকে ছোট করে না। আজকের সমাজে অনেক মানুষ সামাজিক মর্যাদা বা জনপ্রিয়তার জন্য নিজের নীতি বিসর্জন দেয়। কেউ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ধর্মীয় কাজও প্রদর্শন করে। অথচ প্রকৃত মুমিনের সম্মান আল্লাহর কাছে, মানুষের করতালিতে নয়।
তৃতীয় গুণ হলো “الْخَفِيّ” অর্থাৎ নির্জনপ্রিয় বা প্রচারবিমুখ। এর অর্থ এই নয় যে, মানুষ সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে; বরং সে এমন ব্যক্তি, যে নিজের আমল প্রচার করতে পছন্দ করে না। সে চায় না মানুষ তাকে নিয়ে আলোচনা করুক, আঙুল তুলে দেখাক কিংবা প্রশংসায় ভাসাক। তার লক্ষ্য মানুষের চোখ নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি।
বর্তমান যুগে এই গুণটি সবচেয়ে বেশি বিরল হয়ে পড়েছে। এখন অনেক মানুষ ইবাদত, দান-সদকা কিংবা ভালো কাজও প্রচারের মাধ্যমে প্রকাশ করতে আগ্রহী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের অন্তরে আত্মপ্রদর্শনের প্রবণতা বাড়িয়ে দিয়েছে। কেউ হয়তো কুরআন তিলাওয়াত করছে, দান করছে বা তাহাজ্জুদ পড়ছে; কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সেটি মানুষের সামনে তুলে ধরার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে। এতে ইখলাস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ভয় থাকে।
এই হাদিস আমাদের শেখায়, আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের পথ বাহ্যিক জৌলুসে নয়; বরং অন্তরের বিশুদ্ধতায়। একজন মানুষ হয়তো দুনিয়ায় খুব পরিচিত নয়, তার অনুসারী নেই, সামাজিক মর্যাদাও কম; কিন্তু যদি তার অন্তর তাকওয়ায় পূর্ণ হয়, সে মানুষের মুখাপেক্ষী না হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করে এবং ইখলাসের সঙ্গে নীরবে আমল করে, তাহলে সে আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
আজকের কোলাহলপূর্ণ পৃথিবীতে এই হাদিস মুমিনকে আত্মসমালোচনার আহ্বান জানায়। আমরা কি মানুষের প্রশংসার জন্য আমল করছি, নাকি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য? আমরা কি বাহ্যিক পরিচিতি চাইছি, নাকি আখিরাতের সফলতা? কারণ আসমানের দরবারে মূল্যায়ন হবে না কে কত বিখ্যাত ছিল; বরং কে কতটা আন্তরিক ছিল।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক
saifpas352@gmail.com



