হাদিসের কথা
আল্লাহর দৃষ্টিতে নিন্দিত চার শ্রেণির মানুষ
- আল্লাহর কাছে নিকৃষ্ট চার মানবচরিত্র
- আল্লাহর ঘৃণার তালিকায় চার চরিত্র

প্রতীকী ছবি
মানুষের জীবনে কিছু গুনাহ আছে, যা শুধু পাপই নয়; বরং আল্লাহর বিশেষ অপছন্দের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এমন কিছু চরিত্র ও আচরণ আছে, যা মানুষের ভেতরের নৈতিক পতনকে প্রকাশ করে এবং সমাজে অশান্তি ছড়িয়ে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজ উম্মতকে এসব বিপজ্জনক চরিত্র থেকে সতর্ক করতে গিয়ে কখনো কোমল ভাষায়, আবার কখনো কঠোর সতর্কবার্তার মাধ্যমে পথ দেখিয়েছেন। এই হাদিসটি তেমনই এক সতর্কবাণী, যেখানে চার ধরনের মানুষের প্রতি আল্লাহর ঘৃণার কথা স্পষ্টভাবে উচ্চারিত হয়েছে। যা একজন মুমিনের জন্য গভীর চিন্তার বিষয়। হাদিসে বলা হয়েছে—
আবু হুরাইরা (রা.) কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘চার ব্যক্তিকে আল্লাহতায়ালা ঘৃণা করেন; (এক) অত্যধিক কসম খেয়ে পণ্য বিক্রয়কারী ব্যবসায়ী, (দুই) অহংকারী গরিব, (তিন) ব্যভিচারী বৃদ্ধ, (চার) অত্যাচারী শাসক। (সুনানে নাসায়ী, হাদিস: ২৫৭৫)
এই হাদিসে উল্লিখিত চার শ্রেণির মানুষ আসলে চারটি ভয়াবহ নৈতিক বিকৃতির প্রতীক।
প্রথমত, ‘অত্যধিক কসম খেয়ে পণ্য বিক্রয়কারী ব্যবসায়ী’। ইমাম নববী (রহ.) বলেছেন, ব্যবসায় মিথ্যা কসম খাওয়া শুধু ব্যক্তিগত পাপ নয়; এটি মানুষের আস্থা নষ্ট করে, সমাজে প্রতারণার সংস্কৃতি তৈরি করে। পবিত্র কোরআনেও সতর্ক করে বলা হয়েছে, ‘তোমরা আল্লাহর অঙ্গীকারকে তুচ্ছ মূল্যে বিক্রি করো না’ (সুরা নাহল, আয়াত : ৯৫)। এখানে বারবার কসম খাওয়া ব্যবসায়ীর ভেতরের লোভ ও অসততাকে প্রকাশ করে।
দ্বিতীয়ত, ‘অহংকারী গরিব’। ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেছেন, দরিদ্র মানুষের জন্য বিনয়ই হওয়া উচিত স্বাভাবিক গুণ। তার কাছে দুনিয়ার অহংকারের উপকরণ নেই, তবুও যদি সে অহংকার করে, তবে তা তার অন্তরের বিকৃতির প্রমাণ। এটি এমন এক আত্মিক রোগ, যা বাস্তবতার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
তৃতীয়ত, ‘ব্যভিচারী বৃদ্ধ’। আলেমরা বলেছেন, যৌবনে প্রবৃত্তির তাড়না বেশি থাকে, কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে যখন কামনা অনেকটাই ক্ষীণ হয়ে যায়, তখনো যদি কেউ এ পাপে লিপ্ত হয়, তবে তা তার নৈতিক অধঃপতনের চরম দৃষ্টান্ত। ইমাম কুরতুবী (রহ.) উল্লেখ করেন, এই পাপ তখন আর শুধু প্রবৃত্তির কারণে নয়; বরং অভ্যাসগত পাপপ্রবণতার কারণে ঘটে, যা আরও নিন্দনীয়।
চতুর্থত, ‘অত্যাচারী শাসক’। ইমাম ইবনু তাইমিয়্যা (রহ.) বলেছেন, শাসকের হাতে থাকে ক্ষমতা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব। কিন্তু সে যদি এই ক্ষমতাকে জুলুমের হাতিয়ারে পরিণত করে, তবে তার অন্যায় শুধু ব্যক্তিগত নয়; বরং তা পুরো সমাজকে বিপর্যস্ত করে। এজন্যই এই শ্রেণির মানুষের অপরাধের পরিণতি সবচেয়ে ভয়াবহ।
এ হাদিস আমাদের সামনে একটি মৌলিক শিক্ষা তুলে ধরে। আল্লাহর কাছে শুধু কাজের বাহ্যিক রূপ নয়, বরং কাজের পেছনের মানসিকতা ও চরিত্রও গুরুত্বপূর্ণ। কিছু গুনাহ আছে, যা পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপট অনুযায়ী আরও গুরুতর হয়ে ওঠে। তাই একজন মুমিনের উচিত শুধু গুনাহ থেকে দূরে থাকা নয়; বরং নিজের চরিত্রকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে সে আল্লাহর অপছন্দের তালিকায় কখনোই না পড়ে।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে নিজ অবস্থানে থেকে সব ধরনের পাপাচার মুক্ত জীবন গড়ে তোলার তওফিক দান করুন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক
saifpas352@gmail.com



