পবিত্র হজ ২০২৬
হজ কি শুধু সফর না আত্মার পুনর্জন্ম
- হজের প্রকৃত অর্জন কোন পথে
- হজের সফরকে অর্থবহ করতে যেসব বিষয় মানা জরুরি

ফাইল ছবি
হজ এমন এক আমল যা মানুষকে নতুন করে জন্ম দেয়। পৃথিবীর অসংখ্য সফরের ভিড়ে এটি এমন একটি সফর ও আমল, যা মানুষের মধ্যে নিয়ে আসে বিরাপ এক রূপান্তর। হজের সফরে মানুষ শুধু স্থান পরিবর্তন করে না; হৃদয়ের গতিপথও বদলে ফেলে। এ সফরে কষ্টার্জিত সম্মপদ ব্যয় হয়, শরীর ক্লান্ত হয়, হরেক রকম ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। তারপরও ব্যক্তির মধ্যে পলিক্ষিত হয় এক কোমল সতেজতা। যা ভেতর থেকে আত্মাকে ধুয়ে দেয়, ঈমানকে সতেজ করে।
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহা মানব রাসুলুল্লাহ (সা.) এর স্মৃতি বিজরিত মক্কা ও মদীনার পথে পথে বিচরণ কেবল ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখা নয়, বরং নিজেকে নতুনভাবে খুঁজে পাওয়া। আরাফার ময়দান, মুযদালিফার রাত; এসব কোনো পর্যটন কেন্দ্র নয়; এগুলো আত্মসমর্পণের ক্ষেত্র, যেখানে বান্দা তার রবের সামনে নিজেকে নিঃস্ব করে দেয়।
এই সফরের প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই প্রকাশ পায়, যখন একজন হাজী তার ভেতরে তাকওয়া, ইখলাছ ও সুন্নাহর অনুসরণকে সঙ্গী করে নেয়। তখনই এই সফর ‘হজ্জে মাবরূর’ হিসেবে কবুল হয়। যার প্রতিদান একমাত্র জান্নাত (বুখারি, হাদিস : ১৭৭৩)।
এই মহা পুরষ্কার শুনে খুশি হওয়ার আগে আমাদের জানতে হবে যে, সব হজই কি এই মর্যাদা অর্জন করবে?
যদি হজ শেষে মানুষ আগের মতোই থেকে যায়, তার আচরণে পরিবর্তন না আসে, আল্লাহর সাথে সম্পর্ক দৃঢ় না হয়; তাহলে সেই সফর কেবল একটি স্মৃতি হয়ে থাকে, ইবাদত হয়ে ওঠে না।
এই বাস্তবতা সামনে রেখে, হজের সফরকে অর্থবহ করতে কিছু বিষয়ের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া জরুরি।
নিয়ত বিশুদ্ধ করে নেয়া
সবকিছুর শুরু অন্তর থেকে। তাই ইসলামেও প্রতিটি আমলের ভিত্তি নিয়ত। হজের মতো বড় ইবাদতে এটি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) হজের সফরে বারবার উচ্চারণ করতেন-
“اللهم هذه حجة لا رياء فيها ولا سمعة”
অর্থ: হে আল্লাহ, এই হজ্বে যেন প্রদর্শন বা খ্যাতির কোনো উদ্দেশ্য না থাকে। (মুসনাদ আহমাদ, হাদিস: ১৪৮৬১)
এ সফরে কে কী দেখলো, কে প্রশংসা করলো; এসব চিন্তা যতক্ষণ থাকবে, ততক্ষণ ইখলাছ পূর্ণতা পাবে না। হজ শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য করতে হবে।
হজের সফরের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করা
অজ্ঞতা নিয়ে ইবাদত পূর্ণ হয় না। হজ এমন একটি ইবাদত, যা সময়, স্থান ও নির্দিষ্ট বিধানের উপর নির্ভরশীল। কোথায় কখন কী করতে হবে? কখন করতে হবে? কীভাবে করতে হবে? এ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না থাকলে ভুল হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
অনেকেই শুধু গাইড বা মুয়াল্লিমের উপর নির্ভর করে যান। কিন্তু ভিড়ের মধ্যে যদি তাকে না পাওয়া যায়? তখন নিজের জ্ঞানই একমাত্র ভরসা। তাই হজে যাওয়ার আগে এর মাসআলা, নিয়ম, ধাপ; সবকিছু ভালোভাবে শিখে নেওয়া প্রয়োজন। কারণ, ইলম ছাড়া আমল অপূর্ণই থেকে যায়।
হজের সফরে বেশি বেশি দোয়া করা
হজ মানেই আবেদনময় এক জীবন। তাওয়াফ, সায়ী, আরাফা; প্রতিটি ধাপে দোয়া রয়েছে। এগুলো শুধু মুখস্থ কিছু বাক্য নয়; এগুলো বান্দার অন্তরের আর্তি। নির্দিষ্ট দোয়াগুলো শিখে নেওয়া ভালো, তবে এর পাশাপাশি নিজের ভাষায় আল্লাহর কাছে চাওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দোয়ার আসল শক্তি শব্দে নয়, আন্তরিকতায়। কাজেই আরবী দোয়া যতোটুকু জানেন পাঠ করতে পারেন। তবে নিজ ভাষায় সারা জীবনের সকল কিছুর জন্য মহান আল্লাহর দরবারে মিনতি ভরে দোয়া করুন। ভুল-ভ্রান্তিগুলো থেকে স্থায়ীভাবে ফিরে আসার ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে দোয়অ করতে পারেন।
সুন্নাহসম্মত উপায়ে প্রতিটি কাজ করার চেষ্ঠা করা
সফল হজ্বের একমাত্র পথ। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হজই আমাদের জন্য আদর্শ। রাসুলের দেখানো পথ অনুসরণ ছাড়া হজেরর সৌন্দর্য পূর্ণতা পেতে পারে না।
যেমন মিনায় অবস্থানকে অনেকেই হালকা ভাবে নেন, অথচ এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমল। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মত অনুযায়ী এটি সুন্নত হলেও তা ‘সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ’, অবহেলার বিষয় নয়। তেমনি তাওয়াফ, সায়ী, কংখর নিক্ষেপ সব ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ সুন্নাহের অনুসরণ করে হজের কাজগুলো সম্পাদন করা উচিত।
হজের সফরে ছবি তোলা না তোলা
আজকাল হজের সফরেও সেলফী বা নানান ধরনের ছবি তোলা মহামারির রূপ ধারণ করেছে। হজেও ক্যামেরা যেন অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী হয়ে গেছে। ইহরাম থেকে শুরু করে প্রতিটি মুহূর্ত বন্দি করার প্রবণতা অনেকের মধ্যে দেখা যায়। কিন্তু এখানে একটি সূক্ষ্ম বিপদ আছে। সেটি হচ্ছে রিয়া বা প্রদর্শনের প্রবণতা। এটি ইবাদতের গ্রহণযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এ ছাড়া আলেমগণ তে সাধারণ সময় ও ক্ষেত্রেই বিনা প্রয়োজনে ছবি তুলতে নিষেধ করেন। সেখানে হজের মতো বড় আমলে কি করে এটা করতে পারেন আপনি?
শায়খ সালেহ আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন— ‘অপ্রয়োজনীয় ছবি তোলা হজ কবুল না হওয়ার একটি কারণ হতে পারে, কারণ এতে রিয়ার আশঙ্কা থাকে।’
হজের সফরে ইবাদতের অগ্রাধিকার
হজের সময় কোথায় ব্যয় হচ্ছে? এটি খুবই গুরুত্বের সহিত বিবেচনায় নিতে হবে। হজের সফর সীমিত সময়ের। এই সময়টুকু যদি বাজার, শপিংমল বা অপ্রয়োজনীয় কাজে চলে যায়, তাহলে মূল উদ্দেশ্য আড়াল হয়ে যায়। মক্কায় তাওয়াফ, কুরআন তিলাওয়াত; মদীনায় সালাত ও দরূদ; এসবের মধ্যেই সময়গুলো অতিবাহিত করা উচিত।
হারামাইনে নামাজ
হারামাইনে বেশি বেশি সময় অবস্থান করে সুযোগের সঠিক ব্যবহার করা উচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— ‘যদি মানুষ জানত প্রথম কাতারের ফজিলত, তবে তারা লটারির মাধ্যমেও তা অর্জন করতে চাইত।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৩৭) সাধারণ মসজিদের ব্যাপারে এতো বড় ঘোষনা হলে মসজিদে হারাম আর মসজিদে নববীতে অবস্থান করে প্রথম কাতারে নামাজের বিষয়টি আপনিই কল্পনা করুন। এই সুযোগ হজে এসে সহজেই পাওয়া যায়। তবুও অনেকেই তা অবহেলা করেন; এটি দুঃখজনক।
হজ-পরবর্তী জীবন
আসল পরীক্ষা এখানেই। হজ শেষ হওয়া মানেই সব শেষ নয়; বরং এখান থেকেই নতুন জীবন শুরু। একজন হাজী যদি ফিরে এসে আগের মতোই জীবন যাপন করেন, তাহলে হজেরর প্রভাব স্পষ্ট হয় না।
বরং হজের পর তার চরিত্র, আমল, চিন্তা; সবকিছুতে পরিবর্তন আসা উচিত। দ্বীনের পথে স্থির থাকার জন্য আলেমদের সোহবত গ্রহণ করা জরুরি।
মোটকথা, হজ এমন একটি সফর, যা মানুষকে বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু সেই পরিবর্তন নির্ভর করে প্রস্তুতি, নিয়ত ও অনুসরণের উপর।
তাই হজে যাওয়ার আগে নিজেকে প্রস্তুত করুন, হজের সময় নিজেকে সংযত রাখুন, আর ফিরে এসে সেই আলোকে জীবন গড়ে তুলুন।
তবেই আপনি সত্যিকার অর্থে হবেন— বায়তুল্লাহর মুসাফির। যার সফর শেষ হয় না, বরং শুরু হয় নতুন এক পথে।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে হজ্জে মাবরূর নসীব করুন। আমীন।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
saifpas352@gmail.com



