কোরআনের বাণী
ইসলাম অন্ধ অনুসরণকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করে

প্রতীকী ছবি
কোরআনুল কারিমের বার্তা
সুরা : লোকমান, আয়াত : ২০
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে
২১. আর তাদেরকে
যখন বলা হয়, আল্লাহ
যা নাযিল করেছেন তোমরা তা অনুসরণ কর। তারা বলে, বরং আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে যাতে পেয়েছি তারই অনুসরণ
করব। শয়তান যদি তাদেরকে জ্বলন্ত আগুনের দিকে ডাকে, তবুও কি? (তারা পিতৃ পুরুষদের অনুসরণ করবে?)
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা
পবিত্র কোরআনের সুরা লোকমানের এই আয়াতটিতে মহান আল্লাহ তাআলা মানুষের একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতা উন্মোচন করেছেন। সেটি হচ্ছে অন্ধ অনুকরণ । আয়াতের ভাষা সংক্ষিপ্ত, কিন্তু এর ভিতরে লুকিয়ে আছে সমাজ, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনা।
আয়াতে বলা হচ্ছে, যখন মানুষকে আহ্বান করা হয়—‘আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তা অনুসরণ কর’—অর্থাৎ কুরআনের নির্দেশনা, ওহীর আলো এবং সত্যের স্পষ্ট পথ গ্রহণ করতে বলা হয়, তখন অনেকেই জবাব দেয়—‘আমরা তো আমাদের পিতৃপুরুষদের যেভাবে পেয়েছি, সেভাবেই চলব’। এখানে মূল সমস্যা শুধু পূর্বপুরুষকে সম্মান করা নয়; বরং তাদেরকে সত্যের মানদণ্ড বানিয়ে ফেলা।
ইসলাম পূর্বপুরুষদের অস্বীকার করতে শেখায় না, কিন্তু তাদের অন্ধ অনুসরণকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করে। কারণ সত্য নির্ধারণের মাপকাঠি হচ্ছে আল্লাহর ওহী; মানুষের ঐতিহ্য বা পারিবারিক অভ্যাস নয়। যদি কোনো প্রথা বা বিশ্বাস আল্লাহর নির্দেশনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে সেটি পরিত্যাগ করাই প্রকৃত ঈমানের দাবি।
আয়াতের শেষাংশে এক শক্তিশালী প্রশ্ন রাখা হয়েছে—‘শয়তান যদি তাদেরকে জ্বলন্ত আগুনের দিকে ডাকে, তবুও কি (তারা পিতৃপুরুষদের অনুসরণ করবে)?’ এটি কেবল একটি প্রশ্ন নয়; বরং একটি জাগ্রত ধাক্কা। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, অন্ধ অনুসরণের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। যদি পূর্বপুরুষরা ভ্রান্ত পথে থেকেও থাকে, এবং সেই পথ শয়তানের প্ররোচনায় গড়ে ওঠে, তাহলে তাদের অনুসরণ করা মানে নিজেকেও ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া।
মুফাসসিরগণ বলেন, এই আয়াতটি মূলত মক্কার মুশরিকদের প্রেক্ষিতে নাযিল হয়েছিল। তারা নবী (সা.)-এর দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে বলত—‘আমরা আমাদের বাপ-দাদার ধর্মেই থাকব’। অথচ সেই ধর্মে ছিল শিরক, কুসংস্কার ও অসংখ্য অবৈজ্ঞানিক প্রথা। আল্লাহ তাআলা তাদের এই যুক্তিকে ভেঙে দিয়ে দেখিয়েছেন যে, শুধু ‘পুরোনো’ বলে কোনো কিছু সত্য হয়ে যায় না।
এই আয়াত আজও সমান প্রাসঙ্গিক। সমাজে আমরা প্রায়ই দেখি, অনেকেই কোনো কাজ বা বিশ্বাসকে শুধু এই কারণে আঁকড়ে ধরে রাখে যে, ‘এটা তো আমাদের পরিবার বা সমাজে বহুদিন ধরে চলে আসছে’। কিন্তু প্রশ্ন হলো—তা কি কুরআন ও সহীহ হাদিসের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ? যদি না হয়, তাহলে তা পরিবর্তন করার সাহসই হলো ঈমানের প্রকৃত পরিচয়।
ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, এই আয়াত মানুষকে চিন্তা করতে শেখায় যে, কোনো কিছু অনুসরণ করার আগে তার সত্যতা যাচাই করা জরুরি। অন্ধভাবে চলা নয়, বরং জ্ঞান, দলীল এবং আল্লাহর নির্দেশনার আলোকে পথ নির্ধারণ করাই একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ঐতিহ্য সম্মানের বিষয়, কিন্তু সত্যের বিকল্প নয়। আল্লাহর ওহীই চূড়ান্ত পথপ্রদর্শক। তাই একজন সচেতন মুসলমান কখনোই অন্ধ অনুকরণের শৃঙ্খলে নিজেকে আবদ্ধ রাখে না; বরং সে খোঁজে সত্যের আলো, যদিও তা পুরোনো পথ ছেড়ে নতুন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।



