কোরআনের বাণী
দাওয়াতের পথে মুমিনের করণীয়

প্রতীকী ছবি
কোরআনুল কারিমের বার্তা
সুরা : লোকমান, আয়াত : ২৩
بِسْمِ ٱللَّٰهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে
وَ مَنۡ كَفَرَ فَلَا یَحۡزُنۡكَ كُفۡرُهٗ ؕ اِلَیۡنَا مَرۡجِعُهُمۡ فَنُنَبِّئُهُمۡ بِمَا عَمِلُوۡا ؕ اِنَّ اللّٰهَ عَلِیۡمٌۢ بِذَاتِ الصُّدُوۡرِ ﴿۲۳﴾
২৩. আর কেউ কুফরী করলে তার কুফরী যেন আপনাকে কষ্ট না দেয় আমাদেরই কাছে তাদের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর আমরা তাদেরকে তারা যা করত সে সম্পর্কে অবহিত করব। নিশ্চয় আল্লাহ অন্তরসমূহে যা রয়েছে সে সম্পর্কে সম্যক অবগত।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা
পবিত্র কোরআনের সুরা লোকমানের এই আয়াতটিতে মহান আল্লাহ তাআলা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সান্ত্বনা দিচ্ছেন এবং একই সঙ্গে দাওয়াতের পথে চলা প্রত্যেক মুমিনকে একটি গভীর শিক্ষা দিচ্ছেন। আয়াতের ভাষা সংক্ষিপ্ত হলেও এর ভেতরে রয়েছে দাওয়াত, ধৈর্য, মানবস্বাধীনতা, জবাবদিহি এবং আল্লাহর সর্বজ্ঞতার এক অনন্য সমন্বয়।
এই আয়াত নাজিল হয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন রাসুল (সা.) মানুষের হেদায়েতের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করছিলেন। তিনি চাইতেন মানুষ সত্য গ্রহণ করুক, জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাক। কিন্তু অনেক মানুষ স্পষ্ট সত্য দেখার পরও অহংকার, স্বার্থ কিংবা পূর্বপুরুষের অন্ধ অনুসরণের কারণে ঈমান আনতে অস্বীকৃতি জানায়। তাদের এই অবাধ্যতা ও কুফর রাসুল (সা.)-কে গভীরভাবে ব্যথিত করত। তিনি মানুষের জন্য এতটাই দরদী ছিলেন যে, পবিত্র কুরআনের অন্য জায়গায় মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন— ‘তারা ঈমান আনছে না বলে মনে হয় আপনি দুঃখে নিজেকেই ধ্বংস করে ফেলবেন।’ (সুরা আশ-শু‘আরা, আয়াত : ৩)
এখানে আল্লাহ তাআলা প্রিয় নবীকে বলছেন, মানুষের কুফর আপনাকে ভেঙে দেবে না। আপনার দায়িত্ব সত্য পৌঁছে দেওয়া, হেদায়েত দেওয়া নয়। কারণ হেদায়েতের মালিক একমাত্র আল্লাহ।
সুরা লোকমানের এ আয়াতটিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি রয়েছে। ইসলামে দাওয়াতের দায়িত্ব আছে, কিন্তু কারো হৃদয় জোর করে পরিবর্তন করার দায়িত্ব নেই। একজন দাঈ, আলেম বা অভিভাবক অনেক চেষ্টা করেও যদি কাউকে সত্যের পথে আনতে না পারেন, তাহলে তাকে হতাশ হওয়া যাবে না। নূহ (আ.)-এর মতো মহান নবীর সন্তানও ঈমান আনেনি, ইবরাহীম (আ.)-এর পিতা মুশরিক ছিলেন, লূত (আ.)-এর স্ত্রী অবাধ্য ছিল। এতে নবীদের মর্যাদা কমেনি; বরং বোঝা যায় হেদায়েত সম্পূর্ণ আল্লাহর হাতে।
আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন— ‘আমাদেরই কাছে তাদের প্রত্যাবর্তন।’ মানুষ দুনিয়ায় স্বাধীনভাবে চলাফেরা করলেও শেষ পর্যন্ত সবাইকে আল্লাহর কাছেই ফিরে যেতে হবে। কেউ ক্ষমতা, সম্পদ, জনপ্রিয়তা বা যুক্তির আড়ালে নিজেকে লুকাতে পারবে না। মৃত্যুর পর সব পর্দা সরে যাবে। তখন মানুষ বুঝতে পারবে, যে সত্যকে সে অস্বীকার করেছিল সেটিই ছিল চূড়ান্ত বাস্তবতা।
এরপর বলা হয়েছে— ‘অতঃপর আমরা তাদেরকে তারা যা করত সে সম্পর্কে অবহিত করব।’ এখানে ‘অবহিত করব’ বলতে শুধু জানিয়ে দেওয়া বোঝানো হয়নি; বরং তাদের প্রতিটি কাজের পূর্ণ হিসাব সামনে তুলে ধরা হবে। দুনিয়ায় মানুষ অনেক কিছু ভুলে যায়, গোপন করে, অস্বীকার করে; কিন্তু আল্লাহর কাছে কিছুই হারিয়ে যায় না।
আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে- ‘নিশ্চয় আল্লাহ অন্তরসমূহে যা রয়েছে সে সম্পর্কে সম্যক অবগত।’ মানুষ বাহ্যিক আমল দেখে বিচার করে, কিন্তু আল্লাহ মানুষের অন্তরের গোপন নিয়ত, অহংকার, ঈর্ষা, সন্দেহ, কপটতা এবং সত্য গ্রহণ না করার আসল কারণ সবই জানেন। অনেক মানুষ মুখে যুক্তির কথা বললেও অন্তরে থাকে অহংকার কিংবা দুনিয়াবি স্বার্থ। আবার কোনো মানুষ বাইরে দুর্বল হলেও অন্তরে সত্যের প্রতি আন্তরিক হতে পারে। আল্লাহ সেই অন্তরের খবর জানেন।
তাই একজন মুমিনের কাজ হলো আন্তরিকভাবে সত্যের পথে থাকা, মানুষকে সুন্দরভাবে আহ্বান করা এবং ফলাফল আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া। কারণ মানুষের চোখকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হলেও আল্লাহর জ্ঞান থেকে কিছুই গোপন নয়।



