কোরআনের বাণী
মুমিনের চরিত্র গঠনের তিন স্তম্ভ

প্রতীকী ছবি
কোরআনুল কারিমের বার্তা
সুরা : লোকমান, আয়াত : ১৭
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে
১৭. হে আমার প্রিয় বৎস! সালাত কায়েম করো, সৎ কাজের নির্দেশ দাও এবং অসৎ কাজে নিষেধ কর, আর তোমার উপর যা আপতিত হয় তাতে ধৈৰ্য ধারণ করা। নিশ্চয় এটা অন্যতম দৃঢ় সংকল্পের কাজ।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা
পবিত্র কোরআনের সুরা লোকমানের এই আয়াতটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ উপদেশমূলক একটি আয়াত। যেখানে লোকমান (আ.) তাঁর সন্তানের প্রতি জীবন গঠনের মৌলিক নীতিগুলো তুলে ধরেছেন। এই আয়াত একজন মুমিনের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও মানসিক দায়িত্বকে একসূত্রে গেঁথেছে। আর একজন সত্যিকারের মুমিনের সাফল্যময় জীবন গঠনের তিনটি মূলনীতি ঘোষণা করেছে। এক. নিজের ইবাদত ঠিক রাখা, দুই. সমাজের কল্যাণে কাজ করা। তিন. জীবনের সকল প্রতিকূলতায় অবিচল থাকা।
আয়াতের শুরুতেই বলা হয়েছে, ‘সালাত কায়েম করো’। এখানে শুধু নামাজ পড়ার কথা বলা হয়নি; বরং ‘কায়েম’ শব্দটি ইঙ্গিত করে নামাজকে জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, নিয়মিত, খুশু-খুজু সহকারে, আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য নিয়ে সালাত আদায় করা। পবিত্র কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই সালাত অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে’ (সুরা আনকাবূত, আয়াত : ৪৫)। এতে প্রমাণিত হয় যে, সালাত একজন মানুষের চরিত্র গঠনের প্রথম ভিত্তি।
এরপর এসেছে, ‘সৎ কাজের নির্দেশ দাও এবং অসৎ কাজে নিষেধ কর’। এটিই ইসলামের সামাজিক দায়িত্ববোধের মূল। একজন মুমিন শুধু নিজে ভালো থাকলেই যথেষ্ট নয়; তাকে সমাজকেও ভালো পথে আহ্বান করতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ যদি কোনো মন্দ কাজ দেখে, তবে সে যেন তা হাত দিয়ে পরিবর্তন করে; যদি তা না পারে, তবে মুখ দিয়ে; আর যদি তাও না পারে, তবে অন্তরে ঘৃণা করে; এটাই ঈমানের দুর্বলতম স্তর’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৪৯)। অর্থাৎ, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো এবং অন্যায় প্রতিরোধ করা ঈমানের অপরিহার্য দাবি।
এরপর বলা হয়েছে, ‘তোমার উপর যা আপতিত হয়, তাতে ধৈর্য ধারণ করো’। সত্যের পথে চলতে গেলে বাধা আসবেই। সমালোচনা, কষ্ট, এমনকি নিপীড়নও হতে পারে। তাই মহান আল্লাহ ধৈর্যের নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ, সালাত কায়েম করা এবং সমাজে ভালো কাজের প্রচার ও মন্দ কাজের প্রতিরোধ করতে গেলে নানা প্রতিকূলতা আসবে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৫৩)। এই ধৈর্য শুধু সহ্য করা নয়; বরং দৃঢ়তা, স্থিরতা ও আল্লাহর উপর ভরসা রেখে অবিচল থাকার নাম।
সবশেষে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয় এটা অন্যতম দৃঢ় সংকল্পের কাজ’। অর্থাৎ, এই তিনটি বিষয়—সালাত কায়েম, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ, এবং বিপদে ধৈর্য; এগুলো এমন গুণ, যা দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি ও উচ্চ মানসিকতার পরিচায়ক। এগুলো সহজ কাজ নয়; বরং এগুলো অর্জন করতে আত্মসংযম, ত্যাগ ও আল্লাহভীতি প্রয়োজন।
মুফাসসিরগণ যেমন ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.) উল্লেখ করেছেন, এই আয়াতে একসাথে একজন মুমিনের আত্মশুদ্ধি (সালাত), সমাজসংস্কার (আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার) এবং ব্যক্তিগত দৃঢ়তা (সবর)। এই তিনটি স্তম্ভের কথা বলা হয়েছে।
মোটকথা, এই আয়াত আমাদের শেখায় যে, একজন সত্যিকারের মুমিন সে-ই, যে নিজের ইবাদত ঠিক রাখে, সমাজের কল্যাণে কাজ করে এবং জীবনের প্রতিকূলতায় অবিচল থাকে। এই তিন গুণের সমন্বয়েই গড়ে ওঠে দৃঢ় চরিত্র ও সফল জীবন।



