বিয়ের উদ্দেশ্যে ছেলে-মেয়ে একে অপরকে দেখার শরয়ী রূপরেখা
- বিবাহপূর্ব দেখা ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ নির্দেশনা
- বিয়ের আগে দেখা কেন কীভাবে এবং কতটুকু

প্রতীকী ছবি
বিয়ে মানুষের জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এটি কেবল সামাজিক বন্ধন নয়, বরং দ্বীনের অর্ধেক পূর্ণ করার একটি মহান ইবাদত। কিন্তু এই সম্পর্কের সূচনালগ্ন অর্থাৎ ছেলে-মেয়ে একে অপরকে দেখার বিষয়টি নিয়ে আজকের সমাজে চরম বিশৃঙ্খলা, অজ্ঞতা ও অতিরঞ্জন দেখা যায়। ইসলাম এ বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট, ভারসাম্যপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ রূপরেখা দিয়েছে, যা একদিকে মানবিক প্রয়োজনকে স্বীকৃতি দেয়, অন্যদিকে নৈতিকতা ও লজ্জাশীলতার সুরক্ষা নিশ্চিত করে।
প্রথমেই বুঝতে হবে, বিয়ের উদ্দেশ্যে দেখা শরীয়তে বৈধ, বরং অনেক ক্ষেত্রে শরীয়ত উৎসাহিত করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের এ বিষয়ে সরাসরি দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। মুগীরা ইবনে শু‘বা (রাযি.) বর্ণনা করেন, তিনি এক নারীর কাছে বিয়ের প্রস্তাব দেন। তখন নবী (সা.) তাকে বলেন,
انْظُرْ إِلَيْهَا فَإِنَّهُ أَحْرَى أَنْ يُؤْدَمَ بَيْنَكُمَا
অর্থাৎ, ‘তুমি তাকে দেখে নাও; এতে তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও স্থায়িত্ব সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি’। (তিরমিযি, হাদিস ১০৮৭)
এই হাদিস স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, বিয়ের পূর্বে দেখা কোনো অনৈতিক কাজ নয়; বরং বিবাহ-পরবর্তী জীবনের স্থায়িত্ব ও মানসিক সামঞ্জস্যের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ।
তবে ইসলামের অনুমোদন এখানে সীমাহীন নয়। এর কিছু শর্ত ও সীমারেখা রয়েছে, যা অমান্য করলে এই বৈধ কাজটিও গুনাহে পরিণত হতে পারে।
প্রথমত, নিয়ত হতে হবে একান্তই বিয়ের জন্য। কেবল কৌতূহল, বিনোদন বা সম্পর্ক গড়ার উদ্দেশ্যে দেখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ইমাম নববী (রহ.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি বিয়ের ইচ্ছা রাখে না, তার জন্য কোনো নারীর দিকে তাকানো বৈধ নয়’। (শরহ সহীহ মুসলিম)
দ্বিতীয়ত, দেখার পরিমাণ সীমিত। অধিকাংশ ফকীহদের মতে, মুখমণ্ডল ও হাত পর্যন্ত দেখা বৈধ, কারণ এর মাধ্যমেই সৌন্দর্য ও স্বাভাবিক গঠন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ইমাম ইবনু কুদামাহ (রহ.) ‘আল-মুগনী’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘মুখমণ্ডল সৌন্দর্যের কেন্দ্র এবং হাত শরীরের গঠনের ইঙ্গিত বহন করে; তাই এগুলো দেখা বৈধ।’
তৃতীয়ত, একান্ত নির্জনে (খালওয়া) দেখা যাবে না। ইসলামে গায়রে মাহরাম নারী-পুরুষের নির্জন অবস্থান কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রাসুল (সা.) বলেছেন,
«لا يخلون رجل بامرأة إلا مع ذي محرم»
‘মাহরামের উপস্থিতি ছাড়া কোনো পুরুষ কোনো নারীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে না।’ (বুখারি, হাদিস : ৫২৩৩)
অতএব, দেখা হতে হবে পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে বা এমন পরিবেশে, যেখানে শালীনতা বজায় থাকে এবং কোনো প্রকার ফিতনার আশঙ্কা না থাকে।
চতুর্থত, বারবার দেখা বা অপ্রয়োজনীয় আলাপচারিতা থেকে বিরত থাকতে হবে। প্রয়োজনীয় পরিমাণে, সংক্ষিপ্ত ও উদ্দেশ্যমূলক কথোপকথন হতে পারে; যাতে একে অপরের চিন্তাভাবনা, ধর্মীয় অনুশীলন, জীবন পরিকল্পনা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। কিন্তু এটি যেন কখনোই প্রেমালাপ বা আবেগী সম্পর্কের রূপ না নেয়।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর মত অনুযায়ী, যদি প্রথমবার দেখে সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব না হয়, তবে প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিকবার দেখার অনুমতি রয়েছে, তবে শর্ত একই; শালীনতা ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা।
আধুনিক যুগে প্রযুক্তির ব্যবহারের কারণে এই বিষয়টি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ভিডিও কল, ছবি আদান-প্রদান ইত্যাদি এখন সাধারণ হয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে মূল নীতি হলো; যে কোনো মাধ্যমেই হোক, তা যেন শালীনতা, সীমাবদ্ধতা ও প্রয়োজনের মধ্যে থাকে। অপ্রয়োজনীয় ছবি আদান-প্রদান বা ব্যক্তিগত আলাপচারিতা ইসলামের দৃষ্টিতে অনুচিত।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্যের দিকও রয়েছে। ইসলাম যেমন না দেখে না বুঝে অন্ধভাবে বিয়ে সম্পন্ন করতে বলে না, তেমনি পশ্চিমা ধাঁচের অবাধ মেলামেশাকেও সমর্থন করে না। বরং এটি একটি মধ্যপন্থা; যেখানে বিবাহ-পূর্ব পর্যায়ে প্রয়োজনীয় পরিচিতি ও বোঝাপড়ার সুযোগ রয়েছে, কিন্তু তা নিয়ন্ত্রিত, মর্যাদাপূর্ণ ও আল্লাহভীতির আবরণে আবদ্ধ।
পরিশেষে বলা যায়, বিয়ের উদ্দেশ্যে ছেলে-মেয়ের দেখা ইসলামে একটি সুন্নাহসম্মত ও বাস্তবধর্মী ব্যবস্থা। কিন্তু এর সৌন্দর্য তখনই ফুটে ওঠে, যখন তা শরীয়তের সীমারেখার মধ্যে থেকে সম্পন্ন হয়। আজকের সমাজে এই ভারসাম্য হারিয়ে যাওয়ার কারণেই অনেক সম্পর্ক শুরুতেই ভেঙে পড়ে বা গুনাহের দিকে গড়িয়ে যায়। তাই প্রয়োজন সচেতনতা, আল্লাহভীতি এবং সুন্নাহর প্রতি আন্তরিক অনুসরণ।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাঁর নির্ধারিত সীমারেখার মধ্যে থেকে পবিত্র ও কল্যাণময় বৈবাহিক জীবন গড়ে তোলার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক
saifpas352@gmail.com



