অবুঝ সন্তান রেখে দেশের দায়িত্বে আর্চার নাসরিন

নাসরিন আক্তার। ছবি : সংগৃহীত
দেশের টানে আত্মত্যাগের নজির অতীতেও গড়েছেন আর্চার নাসরিন আক্তার। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই আর্চার ক্যারিয়ারের শিখরে থাকাবস্থায় চলে যান জাতিসংঘ মিশনে। কঙ্গোতে শান্তি মিশনে থাকাবস্থায় অবশ্য প্রিয় আর্চারি অঙ্গনকে ভুলতে পারেননি। তাই তো দায়িত্ব শেষে দেশে ফিরেই তীর-ধনুক হাতে শুরু করেন নতুন পথচলা। নিজের রূপে ফিরতে খুব বেশি সময় নেননি। অল্প সময়েই প্রমাণ দিয়ে ফিরেছেন জাতীয় দলে।
আগামীকাল রবিবার দলের হয়ে চীন যাচ্ছেন বিশ্বকাপে অংশ নিতে। এই যাত্রায়ও আত্মত্যাগের নতুন দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করতে যাচ্ছেন নাসরিন। এবার দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন ১৩ মাসের অবুঝ সন্তানকে দেশে রেখে।
সাংহাইয়ে ৫ মে শুরু হবে বিশ্বকাপ। ১০ ইভেন্টেই থাকবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব। মেয়েদের তিন সদস্যের রিকার্ভ দলে নাসরিন জায়গা পেয়েছেন নিজ যোগ্যতায়। ২০২২ সালে এশীয় পর্যায়ে তিনটি স্বর্ণপদক জিতে হইচই ফেলে দেওয়া নাসরিনের ফেরাটা ছিল চ্যালেঞ্জিং। কঙ্গো যাওয়ার আগে বাবা সমতুল্য কোচ মার্টিন ফ্রেডরিখ কাছে ডেকে বলেছিলেন, “তোমার জন্য আমরা অপেক্ষায় থাকব। দায়িত্ব শেষে ফিরে এসো।”
নাসরিন ফেরার লড়াইয়ে নেমেছিলেন বছর দেড়েক আগে। এর মাঝেই জন্ম দিয়েছেন ফুটফুটে এক কন্যাসন্তান। মা হওয়ার পর আর দেশের বাইরে খেলতে যাওয়া হয়নি। তবে ঘরোয়া আসরে অংশ নিয়েছেন, নিয়মিত ক্যাম্পও করেছেন।
সন্তান রেখে প্রথম বিদেশে খেলতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়াটা সহজ ছিল না তার জন্য, ‘বিষয়টি মা হিসেবে একটু কঠিনই। আমার সন্তান এখনো অবুঝ। মাকে খুঁজবে কিছুক্ষণ পরপর। এরপরও দেশের জন্য খেলতে যাচ্ছি।' এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া তার জন্য সহজ হয়েছে পরিবারের বাকি সদস্য, বিশেষ করে স্বামীর সমর্থন ছিল বলেই, ‘পরিবারের সমর্থন না পেলে আমার পক্ষে দেশের বাইরে খেলতে যাওয়া সম্ভব ছিল না। পরিবারের সবাই বাবুকে দেখাশোনা করতে পারবে। এরপরও তো মাকে খুঁজবে, কান্নাও করবে। তারপরও দেশ তো সবার উপরে।'
প্রিয় শিষ্যের প্রশংসা করলেন কোচ মার্টিন ফ্রেডরিখও, ‘কঙ্গোতে মিশনে থাকায় অনেকদিন নাসরিন খেলার বাইরে ছিল। সেখান থেকে ফিরে আর্চারি শুরু করেছে। এর মধ্যে মা-ও হয়েছে। তবে মা হওয়ার পরও তার পারফরম্যান্স আগের পর্যায়েই আছে।’
অভিজ্ঞ নাসরিন সাংহাইগামী পুরো দলের অনেক বড় অনুপ্রেরণা। তার আত্মত্যাগ, সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ হয়ে বাকিরাও জ্বলে উঠবেন, দেশের জন্য বয়ে আনবেন সম্মান— এমনটাই প্রত্যাশা কোচ ফ্রেডরিখের, ‘এই আসরটি আমাদের জন্য এশিয়ান গেমসের প্রস্তুতির মঞ্চ। অবশ্যই পদক জয়ের লক্ষ্য নিয়ে যাচ্ছি। কম্পাউন্ড আগামী অলিম্পিক গেমসে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কম্পাউন্ড আর্চাররাও বেশ ভালো করছে। তাছাড়া রিকার্ভেও আছেন বেশ ক’জন প্রতিশ্রুতিশীল আর্চার। আশা করছি, আমরা দ্রুত বিশ্বমানে পৌঁছাতে পারব।’
সাংহাই যাত্রার আগে এশিয়া কাপে সোনাজয়ী বাংলাদেশ কম্পাউন্ড দলের তিন সদস্যের হাতে দেওয়া হয়েছে উৎসাহবর্ধক অর্থ পুরস্কার। ওয়ার্ল্ড আর্চারি এশিয়ার সভাপতি কাজী রাজিব উদ্দিন আহমেদ চপল পূর্বঘোষিত অর্থ পুরস্কার তুলে দেন হিমু বাছাড়, ঐশ্বর্য রহমান ও নেওয়াজ আহমেদ রাকিবের হাতে। প্রত্যেককে দেন ৪০০ মার্কিন ডলার করে। কোচ মার্টিন ফ্রেডরিখ ও তার দুই সহকারী নূরে আলম এবং ইমদাদুল হক মিলনও পেয়েছেন চপলের বোনাস। আর্চারির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক প্রতিশ্রুতি রক্ষা করলেও ফেডারেশন তাদের প্রতিশ্রুত বোনাস তুলে দেয়নি আর্চারদের হাতে। এ মাসেই সবাইকে পুরস্কৃত করা হবে জানিয়েছেন ফেডারেশন সভাপতি মোখলেসুর রহমান।
সম্প্রতি আর্চারি ফেডারেশনের অ্যাডহক কমিটিতে বিভেদ দেখা দিয়েছিল। সংবাদমাধ্যমে আপত্তিকর বক্তব্য দেওয়ায় সাধারণ সম্পাদক তানভীর আহমেদের ওপর অনাস্থা এনেছিলেন সভাপতিসহ কমিটির ১০ সদস্য। তবে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে সে দূরত্ব অনেকটাই ঘুচেছে, ভুল বোঝাবুঝি দাবি করে সমস্যার সমাধানের কথা বলেছেন সভাপতি।




