বিজেপির ক্রীড়া শাখা বিসিসিআই, মোস্তাফিজ ইস্যু ছিল রাজনৈতিক প্রতিশোধ

ক্রিকেটে ভারতীয় প্রভাবের কঠোর সমালোচনা করেছেন উইজডেন সম্পাদক লরেন্স বুথ।
ক্রিকেটবিশ্বে ভারতের দাপট সর্বজনবিদিত। আইসিসির প্রধানের চেয়ারে যিনিই থাকুন না কেন, ভারতের ক্ষমতা কখনই খর্ব হয় না। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভারতের এই আগ্রাসনকে ‘অরওয়েলিয়ান’ বা একনায়তান্ত্রিক রূপ হিসেবে ব্যখ্যা করেছেন উইজডেন সম্পাদক লরেন্স বুথ। উইজডেন ক্রিকেটার্স অ্যালমানাক ২০২৬-এর সম্পাদকীয়তে তিনি ভারতের এই প্রভাব বিস্তারের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তার মতে, বর্তমান সময়ে ক্রিকেট আর স্রেফ মাঠের লড়াই নেই, বরং এটি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
ক্রিকেট থেকে রাজনীতিকে আলাদা করার কথা বলে থাকেন অনেকেই, কিন্তু বাস্তবে রাজনীতির সঙ্গে ক্রমেই জড়িয়ে যাচ্ছে ক্রিকেট। ২০২৫ সালের এশিয়া কাপে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার ‘হ্যান্ডশেক গেট’ বিতর্ককে রাজনৈতিক অনুপ্রবেশের এক নিকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন লরেন্স বুথ। তার মতে, যেখানে রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকার কথা ছিল স্পোর্টসম্যানশিপের, সেখানে ভারতীয় খেলোয়াড়দের পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের সঙ্গে হাত মেলাতে অস্বীকৃতি জানায়। ঘটনাটি ছিল পুরোপুরি সাজানো এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
বুথ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বিসিসিআইকে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির একটি ‘ক্রীড়া শাখা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ভারতীয় অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব যখন পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়কে সশস্ত্র বাহিনীর নামে উৎসর্গ করেন এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যখন মাঠের লড়াইকে সামরিক অভিযানের সঙ্গে তুলনা করেন, তখন ক্রিকেটের মানবিক ও ভ্রাতৃত্ববোধের দিকটি পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায়। বুথ এখানে ভারতের দ্বিচারিতাকেও সামনে এনেছেন। প্রকাশ্যে সৌজন্য বিনিময় না করলেও পর্দার আড়ালে বা অনূর্ধ্ব-২১ হকির ক্ষেত্রে ঠিকই ভারত-পাকিস্তানের বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ দেখা গেছে। এটাই প্রমাণ করে যে, ক্রিকেটে এই বৈরিতা মূলত একটি রাজনৈতিক কৌশল।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মোস্তাফিজুর রহমানের আইপিএল থেকে বাদ পড়ার বিষয়টিকেও বুথ বিষাক্ত ক্রিকেটীয় রাজনীতির একটি বড় প্রমাণ হিসেবে দেখিয়েছেন। ২০২৬ সালের আইপিএল নিলামে ৯.২ কোটি রুপিতে দল পাওয়ার পরও বিসিসিআইয়ের চাপে মোস্তাফিজকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় কেকেআর। বুথ লিখেছেন, ‘এটি ছিল বাংলাদেশে হিন্দুদের হত্যার প্রতিশোধ। সেইসঙ্গে এটা কেকেআরর বলিউড মালিক শাহরুখ খানের প্রতি একটি প্রচ্ছন্ন হুঁশিয়ারি, যিনি একজন মুসলিম এবং নিয়মিতভাবেই হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের লক্ষ্যবস্তু হয়ে থাকেন। মোস্তাফিজুরের ভাগ্য নির্ধারণের এই ঘটনাটি নিশ্চিত করল যে ক্রিকেট এখন তার রাজনৈতিক প্রভুদের হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছে, ঠিক যেমন সূর্যকুমার যাদব (রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের পথে) এর প্রতি আনুগত্যের এক মূর্ত প্রতীক হয়ে উঠেছেন।’
চ্যাম্পিয়নস ট্রফির উদাহরণ টেনে ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ভেন্যু বদলের আবেদনের বিষয়ে লরেন্স বুথ লিখেছেন, ‘২০২৫ সালেও একই ধরনের এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল যখন ভারত চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির জন্য পাকিস্তান সফরে যেতে অস্বীকৃতি জানায়। তারা তাদের সব ম্যাচ দুবাইতে খেলার জেদ করেছিল। তখন আইসিসি ভারতকে সুবিধা দিতে নিজেদের সব নিয়মকানুন জলাঞ্জলি দিয়ে তাদের আবদার মেনে নিয়েছিল। অথচ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখা গেল উল্টো চিত্র। নিজেদের ম্যাচগুলো সহ-আয়োজক শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করা সত্ত্বেও বাংলাদেশকে টুর্নামেন্ট থেকেই বের করে দেওয়া হলো! ভারতের পক্ষাবলম্বনকারীরা অবশ্য দ্রুতই এই দুই ঘটনার মধ্যে কোনো মিল নেই বলে সাফাই গাইতে শুরু করেন। তাদের যুক্তি ছিল, বিসিসিআই আইসিসিকে বাংলাদেশ বোর্ডের চেয়ে অনেক আগে নোটিশ দিয়েছিল। তাদের কথায় মনে হচ্ছে, আগেভাগে জানানোটা যেন বিরাট কোনো কৃতিত্বের কাজ এবং প্রশংসাযোগ্য।’
বুথের মতে, ক্রিকেটের এই বৈষম্যমূলক শাসনব্যবস্থা দলগুলোর মাঝে ক্ষমতার ভারসাম্যে এক ভয়াবহ ফাটল সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে বুথ ইংল্যান্ডের ‘বাজবল’ কৌশলের অন্ধ অনুকরণ এবং তাদের দম্ভের সমালোচনা করতে ছাড়েননি। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ৪-১ ব্যবধানে অ্যাশেজ হারকে তিনি দেখিয়েছেন ইংল্যান্ড দলের একগুঁয়েমি হিসেবে। সাবেক খেলোয়াড়দের গঠনমূলক সমালোচনাকে তুচ্ছজ্ঞান করা এবং পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ না খাইয়ে নিজেদের দর্শনে অন্ধ বিশ্বাস রাখাটা ব্যাজবলকে এক ধরনের অপেশাদারত্বের দিকে ঠেলে দিয়েছে। সব মিলিয়ে লরেন্স বুথের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ক্রিকেট এখন এক কঠিন সময় পার করছে—যেখানে একদিকে চলছে ভারতের নজিরবিহীন রাজনৈতিক খবরদারি আর অন্যদিকে শাসনকাঠামোর মেরুদণ্ডহীনতা এবং কিছু দলের আত্মম্ভরিতা খেলাটিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তার মতে, ক্রিকেটের এই বিষাক্ত অবস্থা যদি অচিরেই দূর না হয়, তবে এই খেলা তার আন্তর্জাতিক আবেদন ও গ্রহণযোগ্যতা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলবে।



