চেয়ারও গেল মানও গেল

বিসিবি সভাপতির চেয়ার ছাড়তে বাধ্য হলেন আমিনুল ইসলাম বুলবুল। ছবি: বিসিবি
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গোটা দেশের মতোই ছন্নছাড়া অবস্থায় পড়েছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নাজমুল হাসান পাপনের বোর্ড ভেঙে যায়। বিসিবি প্রধানের চেয়ারে বসেন ফারুক আহমেদ। কিন্তু তিনিও ৯ মাসের বেশি টিকতে পারেননি। তার জায়গায় বিসিবি সভাপতির চেয়ারে বসেন আমিনুল ইসলাম বুলবুল।
দেশের সাবেক একজন অধিনায়ককে ঘিরে অনেক প্রত্যাশা ছিল ক্রিকেটার এবং ক্রিকেটপ্রেমীদের। কিন্তু তার ছিটেফোঁটাও তিনি পূরণে ব্যর্থ হন। ছয় মাসের মধ্যেই দেশের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিয়ানকে বিদায় নিতে হলো বেশ অপমানজনকভাবেই।
আজ মঙ্গলবার বিসিবির বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়েছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি)। জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালকে প্রধান করে গঠিত হয়েছে ১১ সদস্যের অ্যাডহক কমিটি। এর মাধ্যমেই বাংলাদেশের ক্রিকেটে বুলবুলের যাত্রার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটল। যদিও এ বিচ্ছেদটা আগেই ঘটতে পারত সুন্দরভাবে। ফারুকের বিদায়ের পর বিসিবির দায়িত্বে এসে প্রথম দিনই বুলবুল বলেছিলেন, তিনি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলতে এসেছেন। একটি নির্বাচন আয়োজন করেই তিনি ফিরে যাবেন আইসিসির পুরনো চাকরিতে।কিন্তু না, কয়েক দিন যেতে না যেতেই বিসিবির চেয়ারের মায়ায় পড়ে যান বুলবুল। অংশ নেন গত ৬ অক্টোবরের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে। অন্তর্বর্তী সরকারের তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার প্রত্যক্ষ মদদে অনুষ্ঠিত ‘অনিয়মে ভরা’ সেই নির্বাচন বর্জন করে দেশের অধিকাংশ ক্লাব। বিসিবির সেই নির্বাচনে এই সাবেক উপদেষ্টার স্পষ্ট হস্তক্ষেপের প্রমাণ পেয়েছে এনএসসির তদন্ত কমিটি। আসিফ মাহমুদের পেশিশক্তির জোরে আবারও বিসিবির মসনদে বসেন বুলবুল। শুরু হয় একটি ক্রিকেটপাগল জাতির উল্টো পথে হাঁটা।
স্থায়ী দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাসেও ঢাকার ক্লাবগুলোর সঙ্গে সমস্যার সমাধান করতে পারেননি বুলবুল। স্থবির হয়ে পড়ে ঘরোয়া ক্রিকেট। ক্রিকেটারদের রুটি-রুজির সবচেয়ে বড় উৎস ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ মাঠেই গড়ায়নি! তার ওপর ক্রিকেটারদের বিরুদ্ধে বুলবুলের বোর্ডের একাধিক পরিচালক নানারকমের কটূক্তি করতে থাকেন। এমনকি তামিম ইকবালকে ‘দালাল’ বলতেও ছাড়েননি পরিচালক এম. নাজমুল ইসলাম। এসব অপকর্ম নিয়ে বুলবুল সবসময়ই নমনীয় ছিলেন। বরং বিতর্কিত কর্মকাণ্ড থেকে সবার নজর ঘোরাতে মাঝেমধ্যেই সাকিব আল হাসানকে দেশে ফেরানোর ইস্যু সামনে তুলে আনে বুলবুলের বোর্ড। যদিও গত দেড় বছরে সাকিবের দেশে ফেরার ন্যূনতম সম্ভাবনাও উঁকি দেয়নি।
নিজের বোর্ডের অপকর্ম ঢাকতে নানা ধরনের নাটক করতেন বুলবুল। যেমন বাইকে করে যাতায়াত কিংবা ১২ হাজার টাকা ভাড়ার বাসায় থাকার গল্প তিনি মিডিয়ায় শোনাতেন। বিসিবি থেকে কোনো পারিশ্রমিক গ্রহণ না করার গল্প তিনি ফলাও করে বলতেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার এসব ‘ত্যাগ-তিতিক্ষার’ কাহিনি আবেগঘন ভাষায় প্রচার করত স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার অ্যাপ্লিকেশন (বট), যা বটবাহিনী নামে বহুল পরিচিত।
সবকিছুই চলছিল, শুধু ক্রিকেটটাই ঠিকঠাক চলছিল না। রাজনৈতিক টানাপড়েনে গত বছর বাংলাদেশ সফর স্থগিত করে ভারত। বুলবুলের এসব নাটকীয় কর্মকাণ্ড আর ধোপে টেকেনি ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বর্জনের পর।রাজনৈতিক কারণে মোস্তাফিজুর রহমানকে চলতি আইপিএলের স্কোয়াড থেকে বাদ দিয়েছিল কলকাতা নাইট রাইডার্স। সেই অজুহাতে ভারতের মাটিতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে না খেলার সিদ্ধান্ত নেন তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। ক্রিকেটাররা এ সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ছিলেন। এক দিন আগে বিসিবির পরিচালকরাও বলে গেছেন, সব পরিচালকই নাকি বিশ্বকাপে না খেলার বিরুদ্ধে ছিলেন। এটা হয়েছে সরকারের সিদ্ধান্তে।
অন্যদিকে ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল দাবি করেন, ক্রিকেটারদের মতামত নিয়েই নাকি বিশ্বকাপ বর্জনের সিদ্ধান্ত হয়েছে! এরই একপর্যায়ে খ্যাতিমান কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন প্রকাশ্যে আসিফ নজরুলকে ‘মিথ্যাবাদী’ বলতেও দ্বিধা করেননি। মজার ব্যাপার হলো, বাংলাদেশের ভেন্যু পরিবর্তনের দাবির পক্ষে আইসিসিতে একমাত্র পাকিস্তান ছাড়া কোনো দলই অবস্থান নেয়নি।
বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়ে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বর্জনের ঘোষণা দেয় পাকিস্তান। পরে বুলবুল হঠাৎ লাহোরে এক বৈঠকে করে এসে ফলাও করে প্রচার করেন, তিনিই পাকিস্তানকে ভারতের বিপক্ষে খেলতে রাজি করিয়েছেন! অথচ, নিজ দেশের ক্রিকেট দলকে তিনি বিশ্বকাপে নিতে পারেননি।
বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক তথা প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিয়ানের আমলে বিশ্বকাপ খেলতে না পারা বুলবুলকে ব্যাকফুটে ঠেলে দেয়। গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে বিষয়টি সামনে চলে আসে।গত বছর ৬ অক্টোবরের বিতর্কিত বিসিবি নির্বাচনের অনিয়মের বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। একই সঙ্গে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার বিষয়েও তদন্তের ঘোষণা দেন। বিসিবি নির্বাচন নিয়ে দুদিন আগে জমা দেওয়া তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বুলবুলের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ। আজ ক্রীড়া পরিষদের উপসচিব আমিনুল এহসান বলেছেন, ‘আমিনুল ইসলাম বুলবুল একটা পক্ষ হিসেবে ১০ ক্রিকেটারকে মনোনয়ন দিয়ে সুবিধা নিয়েছেন, এ প্রমাণও পাওয়া গেছে। এ নির্বাচন অসম্পূর্ণ ও অনিয়মে ভরা হিসেবে দেখছে কমিটি।’
তদন্ত চলাকালে এবং পরবর্তীকালে সাতজন বিসিবি পরিচালক পদত্যাগ করেন। তাই বুলবুলের বিসিবি সভাপতির পদ থেকে অপসারণ সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। তবুও চেয়ার আগলে রাখতে চেষ্টার কোনো কমতি করেননি তিনি। তদন্ত চলাকালে অস্ট্রেলিয়া থেকে মাঝেমধ্যেই নানা বিবৃতি প্রদান করতেন। আইসিসির আইন-কানুনের ভয় দেখাতেন।
দেশে ফিরে গত ৪ এপ্রিল একটি টেলিভিশন চ্যানেলে বলেছিলেন, ‘সবাই যদি বিসিবি থেকে পদত্যাগও করে, আমি শেষ পর্যন্ত একটা চেয়ার নিয়ে একা বসে থাকব।’ তবে সেই আশা আর পূরণ হয়নি বুলবুলের। অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাকে চেয়ারের মায়া ছেড়ে দিয়ে বিদায় নিতে হলো। খেলোয়াড় জীবন থেকে বাংলাদেশের ক্রিকেটে তার যে মর্যাদা ছিল, সেটার সমাপ্তি হলো লজ্জাজনকভাবে।



