বিশ্বকাপের আগে
এমবাপ্পে-দেম্বেলে জাদুতেই হতে পারে দেশমের রেকর্ড

বিশ্বকাপে এমবাপ্পে-দেম্বেলে জাদুর অপেক্ষায় ফ্রান্স। ছবি- সংগৃহীত
বিদ্যুতের মতো গতিময় আক্রমণভাগ, কৌশলী মাঝমাঠ, বরফের মতো জমাট রক্ষণ। একবাক্যেই যেন পুরো ফ্রান্স দলের প্রতিচ্ছবি। ইউরোপ তো বটেই, দিদিয়ের দেশমের অধীনে ফ্রান্স যেন হয়ে উঠেছে ফুটবল বিশ্বের অন্যতম দাপুটে দল। ১৯৯৮ ও ২০১৮ সালের চ্যাম্পিয়নরা এবারও বিশ্বকাপে যাচ্ছে শিরোপা উঁচিয়ে ধরার লক্ষ্য নিয়েই।
এমবাপ্পে-দেম্বেলের ভয়ংকর ফরোয়ার্ড জুটি
দুজনের সামনেই প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা হয়ে পড়েন অসহায়। জমাট রক্ষণ চিরে বল জালে জড়ানো তাদের কাছে মামুলি ব্যাপার। সেই কিলিয়ান এমবাপ্পে ও উসমান দেম্বেলে যদি একই দলে খেলেন, ব্যাপারটা হয়ে ওঠে আরও ভয়ংকর। ফ্রান্সের এই জুটিতেই তাই বদলে যেতে পারে পুরো টুর্নামেন্টের সমীকরণ।
মাঝমাঠের একটু নিচ থেকেই বলের দখল নেন দেম্বেলে। এরপর শুরু তার গতির জাদু। কিছুটা ওপরে এসে বল দেন এমবাপ্পেকে। বাকি কাজটা কীভাবে সারতে হয়, তা ভালোভাবেই জানা মাদ্রিদ তারকার। এমবাপ্পে-দেম্বেলে জুটি তাই উপাধি পেয়েছে ‘ডেডলি ডুও’র।
ডেডলি ডুওর এমবাপ্পে ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় তারকার খ্যাতিটা পেয়েছেন ২০১৮ বিশ্বকাপেই। পেলের রেকর্ড ছুঁয়ে ফ্রান্সকে দীর্ঘ ২০ বছর পর সোনালি ট্রফি জিতিয়েছিলেন তিনি। সেই শুরু, এরপর থেকে ফ্রান্সের মূল কাণ্ডারি এই রিয়াল মাদ্রিদ তারকা।
ফ্রান্সের হয়ে এবারের বাছাইপর্বে এমবাপ্পে ছিলেন খুনে মেজাজে। ১৩ ম্যাচে করেছেন ৮ গোল, যা ফ্রান্সকে এনে দিয়েছে সরাসরি বিশ্বকাপে খেলার টিকিট।
বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ১৪ ম্যাচে ১২ গোল পেয়েছেন এমবাপ্পে। গতবার শিরোপা না জিতলেও পেয়েছিলেন গোল্ডেন বুট। এবার এমবাপ্পের সামনে লক্ষ্য সর্বকালের সেরা গোলদাতার হওয়ার রেকর্ডটা নিজের করে নিতে।
বছর জুড়ে এমবাপ্পে আছেন দুর্দান্ত ফর্মে। লা লিগায় ২৮ ম্যাচে তার গোল ২৪, এখন পর্যন্ত লিগে যা সর্বোচ্চ, অ্যাসিস্ট আছে ৪টি। চ্যাম্পিয়নস লিগেও সমানভাবে গোল পেয়েছেন এই তারকা। ১০ ম্যাচে বল জালে জড়িয়েছেন ১৫ বার। যদিও খুব সম্ভবত এই মৌসুমে কোনো শিরোপা ছাড়াই কাটাতে হবে এমবাপ্পেকে।
এমবাপ্পে যদি হন জাহাজের নাবিক, তার সবচেয়ে পরীক্ষিত সহকারী দেম্বেলে। এমবাপ্পে যেবার পিএসজি ছেড়ে রিয়ালে পাড়ি জমান, অনেকেই ফরাসি ক্লাবটির শেষ ধরে নিয়েছিলেন। সবাইকে ভুল প্রমাণ করে সেই পিএসজিই গড়েছে ইতিহাস, জিতেছে অধরা চ্যাম্পিয়নস লিগও। পিএসজির এই ইতিহাসের মূল কারিগর উসমান দেম্বেলে।
এমবাপ্পে ক্লাব ছাড়ার পর সেই দেম্বেলেই হয়ে উঠলেন পিএসজির প্রাণভোমরা। গত মৌসুমে তার অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সে প্রথমবার চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার স্বাদ পেল পিএসজি। সব রেকর্ড ভেঙে দেম্বেলের হাতে উঠেছিল ব্যালন ডি অরও।
এবারও ক্লাবের হয়ে দারুণ ফর্মে আছেন তিনি। এই মৌসুমে সব টুর্নামেন্ট মিলিয়ে ৫৫ ম্যাচে করেছেন ৪০ গোল। অ্যাসিস্ট আছে ২৫টি। তার জাদুকরী ফুটবলেই ডাবল জয়ের দ্বারপ্রান্তে পিএসজি।
এমবাপ্পে-দেম্বেলে ছাড়াও প্রতিপক্ষকে ভাবতে হবে ইন্টার মিলানের মার্কাস থুরাম, বায়ার্নের মিকেল ওলিসে, পিএসজির ব্র্যাডলি বারকোলা, টটেনহামের র্যান্ডাল মুনাই, চেলসির ক্রিস্টোফার এনকুকু ও ম্যানচেস্টার সিটির রায়ান চেরকিদের নিয়ে। নিজেদের ক্লাবে সবাই আছেন ভালো ফর্মে। বিশেষ নজর থাকবে ওলিসে, বারকোলা ও চেরকির দিকে। এমবাপ্পে-দেম্বেলের সহযোগী হয়ে তারাও পাবেন গোল, কোচের ভাবনা এমনটিই।
মধ্যমাঠে তিন কাণ্ডারিতে ফ্রান্সের বলের দখল
ইতিহাস বলে, ফ্রান্সের মাঝমাঠেই নাকি নির্ধারণ হয় ম্যাচের ফলাফল। ঐতিহ্যকে বজায় রেখে এবারও কিন্তু শক্তিশালী মিডফিল্ড নিয়ে বিশ্বকাপে যাচ্ছে দেশমের দল।
পিএসজির ডেজায়ার দুয়ে ও দুই রিয়াল মাদ্রিদ সতীর্থ অরিলিয়েন চুয়ামেনি, এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গার দিকেই থাকবে সবার নজর। আক্রমণভাগে দেম্বেলে-এমবাপ্পেদের বল বানিয়ে দেওয়ার মূল কারিগর হবেন এই তিন তারকা।
এই মৌসুমে দুয়ে আছেন দারুণ ফর্মে। পিএসজির হয়ে মাঠ মাতানো ২০ বছর বয়সী এই তরুণ নিজের প্রথম বিশ্বকাপটা রাঙাতে চাইবেন শিরোপা দিয়েই। চুয়ামেনি-কামাভিঙ্গা জুটি বছর জুড়েই খেলেছে রিয়াল। দুজনের সেই বোঝাপড়া ফ্রান্সকে নিশ্চিতভাবেই বাড়তি সুবিধা দেবে মাঠে।
প্রতিপক্ষের চিন্তার কারণ হতে পারেন এসি মিলানের আদ্রিয়ান রাবিও ও ফেনেরবাচের এনগোলো কান্তে। বেঞ্চও কিন্তু বেশ শক্ত এই স্কোয়াডের। জুভেন্তাসের কেফেরেন থুরাম ও পিএসজির জাইরি এমেরিরা বদলি হিসেবে নেমে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন একটি জাদুকরী পাসে।
রক্ষণেও আছে বড় নাম
কাগজ-কলমে ফ্রান্সের সবচেয়ে দুর্বল বিভাগ ধরা হচ্ছে ডিফেন্সকেই। রক্ষণের পুরো দায়িত্বটা থাকবে আর্সেনালের উইলিয়াম সালিবা, বায়ার্ন মিউনিখের দায়োত উপামেকানো, বার্সেলোনার জুলস কুন্দে ও পিএসজির লুকাস হার্নান্দেজের ওপর। ক্লাব ফুটবলে ভালো ফর্মে থাকলেও জাতীয় দলের হয়ে সবার বোঝাপড়া কতটা ভালো হয়, সে নিয়ে চিন্তার অবকাশ থেকেই যায়।
এই চার তারকা ফুটবলার ব্যর্থ হলে দেশমের হাতে আছে আরও কয়েকজন। স্কোয়াডে জায়গা করে নিতে পারেন আল হিলালের থিও হার্নান্দেজ, লিভারপুলের কোনাতে ও চেলসির মালো গুস্তো।
হুগো লরিসের অবসরের পর থেকেই ফ্রান্স দলের প্রধান কিপার মাইক ম্যাগনান। এসি মিলানের এ গোলরক্ষককেই এবার বিশ্বকাপে ফ্রান্সের গোলপোস্ট সামলাতে দেখা যাবে। কিছু ইনজুরি সমস্যাও আছে, তবে প্রকট নয়।
ইতিহাস গড়েই কি বিদায় বলবেন দেশম
অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বকাপ জিতেছেন, জিতেছেন কোচ হিসেবেও। ইতিহাসের পাতায় আগেই নাম লেখানো দেশমের সামনে হাতছানি দিচ্ছে আরেকটি অনন্য রেকর্ডের। ফুটবলার হিসেবে একবার ও কোচ হিসেবে দুবার সোনালি ট্রফি ছোঁয়ার অপেক্ষায় দেশম।
গুঞ্জন উঠেছে, এই বিশ্বকাপ শেষেই ফ্রান্সকে বিদায় বলবেন তিনি। যোগ দিতে পারেন রিয়াল মাদ্রিদে। ফ্রান্সের হয়ে শেষটা তাই ইতিহাস গড়েই করতে চাইবেন দেশম।
২০১৮ সালে প্রবল প্রতাপের সঙ্গে বিশ্বকাপ জিতেছিল ফ্রান্স। এবার সেই ফ্রান্স আরও শক্তিশালী স্কোয়াড নিয়েই পা রাখছে যুক্তরাষ্ট্রে। মায়ামির ফাইনালে কি শেষ হাসি হাসবেন এমবাপ্পে-দেম্বেলেরা?






