সুইস স্পোর্টস ম্যাজিকের সঙ্গে অর্থের রাজযোটক

সুইজারল্যান্ডের লুজানে ফিফা সদর দপ্তর। ছবি: সংগৃহীত
ক্রীড়া জাতি হিসেবে সুইসদের খুব সুনাম বা ঐতিহ্য নেই। তবে তাদের যা আছে, তা আর কারো নেই। সমগ্র বিশ্বের খেলাধুলার নিয়ন্ত্রক হয়ে বসে আছে সুইজারল্যান্ড। আইওসি, ফিফা, উয়েফা, ভলিবল, হকি, সাঁতার, বাস্কেটবলসহ প্রায় ৩০টি খেলার অভিভাবক সংস্থার অফিস এই দেশে। মানে বৈশ্বিক খেলাগুলোর সব প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হয় এখানে।
প্রশ্নটা হচ্ছে, ইউরোপে জ্ঞানে-গুনে, অর্থনীতিতে অনেক সমৃদ্ধ দেশ থাকতে খেলাগুলো কেন ছুটছে সুইজারল্যান্ডের দিকে? সুইস স্পোর্টস ম্যাজিকটা আসলে কী?
বেইন স্পোর্টসের সাংবাদিক সাফোয়ান আবু শানাবের অভিজ্ঞতা আছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কাজ করার। তিনি এটিকে শুধু ‘সুইস স্পোর্টস ম্যাজিক’-এর মধ্যে রাখতে চান না, ‘শুধু স্পোর্টস ফেডারেশনগুলো সুইজারল্যান্ডের দিকে দৌড়াচ্ছে না। এখানে জাতিসংঘ, হু (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা) আইএলওর (আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা) মতো অনেক বিশ্ব সংস্থার হেডকোয়ার্টার আছে। সুইজারল্যান্ড একটি নিরপেক্ষ দেশ বলে হয়তো ওই সংস্থাগুলো এখানে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তাদের যুদ্ধের ইতিহাস নেই, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তারা অংশ নেয়নি। ফলে এখানে বসে কাজ করার সুবিধা হলো, নিজস্ব সিদ্ধান্তের বেলায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বিভিন্ন পক্ষ এড়াতে পারে।’
আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির সদর দপ্তরও সুইজারল্যান্ডে। ছবি: সংগৃহীত
১৮১৫ সালের ভিয়েনা কংগ্রেসের পর থেকে সুইজারল্যান্ড একটি নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃত। তারা যুদ্ধ চায় না, বরং যুদ্ধে রেড ক্রসের মাধ্যমে মানবিক সাহায্য নিয়ে মানুষের পাশে থাকে। তারা ন্যাটোরও সদস্য নয়। তাই সুইজারল্যান্ডে আন্তর্জাতিক স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কাজ করা সহজ হয় বলে অনেকের যুক্তি।
এটা গ্রাহ্য করার মতোই যুক্তি। তবে অন্য আলোচনাও আছে বাজারে। গত ১০ এপ্রিল এআইপিএসের (আন্তর্জাতিক স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশন) ক্রীড়া সাংবাদিকদের সামনে ফিফার ইতিহাস তুলে ধরেন তাদের এক মিডিয়া কর্মকর্তা। তিনি বলছিলেন, ১৯০৪ সালে প্যারিসে শুরু ফিফা ১৯৩২ সালে স্থানান্তরিত হয় সুইজারল্যান্ডে। শুনেই এক ক্রীড়া সাংবাদিক প্রকাশ্যে ফোড়ন কাটেন, ‘ট্যাক্সের সুবিধা নেওয়ার জন্যই ফিফার স্থানান্তর হয়েছিল।’
ওই সাংবাদিকের নাম মার্ক ভেঁটুইলাখ; ফ্রান্সের বিখ্যাত ক্রীড়া দৈনিক ‘লেকিপ’-এ দীর্ঘ ক্যারিয়ার শেষ করে সদ্য অবসরে গেছেন। ফ্রান্সের এই ক্রীড়া সাংবাদিক বিশ্ব ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর সুইসমুখী মিছিলের পেছনে বড় কারণ হিসেবে দেখেন ট্যাক্স সুবিধা ও আইওসির অবস্থান, ‘সুইজারল্যান্ডে আসার পেছনে বড় কারণ হলো ট্যাক্স। এখানে তেমন ট্যাক্স দিতে হয় না, অত আর্থিক বিধিনিষেধও নেই। এখানকার মানুষের জীবনমানও ভালো। আরেকটা ব্যাপার হলো, স্পোর্টস অর্থনীতির বড় জায়গা এশিয়া হলেও পলিটিক্যাল সেন্টার এখানো ইউরোপ। আইওসি (আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি) সুইজারল্যান্ডে না হলে এত স্পোর্টস ফেডারেশন এখানে আসত না। আইওসির আকর্ষণে অন্তত ৩০টি ক্রীড়া ফেডারেশন এসেছে এবং তার মধ্যে ২০টি আছে অলিম্পিক গেম ডিসিপ্লিন।’
এরপর ফ্রান্সের এই ক্রীড়া সাংবাদিক ২০১৫ সালে ফিফার ঘুষ কেলেঙ্কারির প্রসঙ্গ টেনে আনেন, ‘আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে ফিফার ব্যাপক দুর্নীতি ও ঘুষ কেলেঙ্কারির কথা। প্রতারণা, অর্থ পাচার এবং ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপের বিডিংয়ে ঘুষ নেওয়ার অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় ফিফার ১৪ ফুটবল কর্মকর্তাকে জেলে যেতে হয়েছিল। পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সেপ ব্লাটার। সুইজারল্যান্ড না হলে হয়তো এতবড় কেলেঙ্কারি ঘটত না ফিফায়।’
সুইজারল্যান্ডের নিয়নে অবস্থিত উয়েফার অফিস। ছবি: সংগৃহীত
ফিফায় দুই দশক ধরে ১৫০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগে ১৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেছিল মার্কিন বিচার বিভাগ। সুইজারল্যান্ডের আর্থিক ব্যবস্থায় এত ছাড় ও জবাবদিহি না থাকাটাই হয়তো বড় কেলেঙ্কারির পথ খুলে দিয়েছিল ফিফায়।
সুইজারল্যান্ডেও ট্যাক্স দিতে হয়, তবে করপোরেট ট্যাক্স অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের তুলনায় বেশ কম। তা ছাড়া ফিফা, উয়েফা, আইওসির মতো সংস্থাগুলো এখানে থাকার অন্যতম কারণ হলো সুইজারল্যান্ডের ‘অ্যাসোসিয়েশন ল’। এই সংস্থাগুলোকে অলাভজনক সংস্থা হিসেবে নিবন্ধন করা যায়, ফলে বড় অঙ্কের কর ছাড় এবং আইনি স্বায়ত্তশাসন ভোগ করে তারা।
আরেকটা মজার বিষয় হলো, এখানে ধনী ব্যক্তিদের আয়ের ওপর ট্যাক্স দিতে হয় না। তাদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর ট্যাক্স নির্ধারণ করা হয়। এটা উচ্চ আয়ের মানুষের জন্য খুব সাশ্রয়ী হয়। শিক্ষা, চিকিৎসা ও জীবনযাত্রার মান উন্নত বলে খেলোয়াড় ব্যবসায়ী এবং বড় অফিসিয়ালদেরও গন্তব্যের তালিকায় ওপরে থাকে এই দেশ।
এর সঙ্গে এসে পড়ে সুইস ব্যাংকের ম্যাজিকের ব্যাপারটাও। পত্রপত্রিকার সুবাদে সুইস সবাই কমবেশি জানে, এটা হলো কালো টাকা রাখার নিরাপদ জায়গা। গ্রাহকের পরিচয় গোপন রেখে এখানে অ্যাকাউন্ট খোলা যায় এবং অ্যাকাউন্টের অর্থের উৎস জানতে চায় না ব্যাংক। তাতে করে অবৈধ আয় জমানোর স্বর্গরাজ্য হয়ে ওঠে এই দেশ।
ফিফা সদর দপ্তরে প্রতিবেদক। ছবি: আগামীর সময়
সমালোচনা ও চাপের মুখে এখন যদিও তাদের ব্যাংকিং নীতি অনেক বদলে গেছে। অনেক দেশের সরকারের সঙ্গে তারা আর্থিক তথ্য বিনিমিয় করে। তাই আগের মতো ঢালাওভাবে কালো টাকা লুকানো এখন অনেক কঠিন।
অপূর্ব প্রাকৃতিক আয়োজনে সুইজারল্যান্ড ভীষণ সুন্দর। শুধুই সৌন্দর্যের টানে সুইসমুখী মিছিল হয়নি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর। এর সঙ্গে অর্থের রাজযোটক আছে। হারাম টাকা হালাল করার অবারিত সুযোগ এখানে। এটিই আসল সুইস স্পোর্টস ম্যাজিক।







