ফুটবল প্রগতির সিদ্ধান্ত হয় মাটির নিচে!

সুইজারল্যান্ডে আসব শুনে একজন বলে দিয়েছিল, ‘খুব সুন্দর দেশে যাচ্ছ,শুধু ছবি তুলবে।’ কিন্তু ছবি তুলতে গিয়ে বিপত্তিটা বাধল। এক জায়গায় ছবি তুলে মনে হয়, এর চেয়ে সুন্দর লোকেশন আর হয় না। এই ছবির ওপরেও কিছু হয় না। কিন্তু পরক্ষণে যে দৃশ্যটা সামনে আসে, এটি যে তার চেয়েও অপূর্ব। জুরিখ থেকে লুসানে আসার পথে এমন ধাঁধায় পড়তে হয়েছে বহুবার। শেষমেশ ছবির কথা ভুলে গিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে মিতালি করে নিলাম দুই চোখ দিয়ে। তুষার শুভ্র আল্পস পর্বতমালা আর প্রকৃতির অপরূপ শোভায় এ যেন এক স্বর্গভূমি।
এটা তো আমার সাধারণ চোখের মায়া। কিন্তু কবির মায়াবী চোখ তার চেয়েও অনেক অনুভূতিপ্রবণ, তাই প্রকৃত সৌন্দর্য ফুটেছে তার ছন্দে—
‘নীলিমার কোলে রূপোলি পাহাড়, বরফে মাখানো কায়া,
জেনেভা হ্রদের স্বচ্ছ দর্পনে পড়ে মেঘেদের ছায়া।
সবুজ উপত্যকা, পাইন বনানী, দূরে ঘণ্টার ধ্বনি
মেঘপালকের বাঁশির সুরে সাজানো এ এক খানি।
অল্পস চূড়ায় রোদের ঝিলিক, যেন হীরের মুকুট পরা,
শান্তির দেশে সময় থমকে, মায়াবী এই ধারা।`
কবির নামটা ঠিক মনে নেই, তবে একটুও বাড়িয়ে বলেননি তিনি। আসতে আসতে দেখছিলাম অনেক দূরে বরফ মাখানো আল্পস পর্বতমালায় যখন রোদ ঝিলিক দেয়, তার সঙ্গে হীরের মুকুটের তুলনা ছাড়া আর কী মনোমুগ্ধকর উপমা হতে পারত।
একটা জায়গায় যেন বাংলাদেশকে খুঁজে পেয়েছি খানিকটা। আমাদের ওখানে মাঝেমধ্যে দেখা গেলেও এখানে রাস্তার দুই পাশে পাহাড়ের কোলে বিছানো আছে সোনালি গালিচা। বলছি, হলুদ সরষে ফুলের কথা, ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে এ দৃশ্য দেখা যায় কিছু জায়গায়। এখানে অবশ্য তার অন্য নাম, রেপসিড বা ক্যানোলা, এর চাষ হয় বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে। ইউরোপের বসন্তে (এপ্রিল-মে) রাস্তার দুই ধারে তারা তৈরি করে হলুদ রঙের মায়া, তবে জুন আসতেই মায়া কাটিয়ে ঝরতে শুরু করে ফুলগুলো। এ ছাড়া পাইন বনের ফাঁকে ফাঁকে রোদ ঝিলিক মারলে চমৎকার হয় ছবিটা। রোদ আসে মাঝেমধ্যে, তাই বেশি চোখে পড়ে মেঘেদের নীল ছায়াটা। চারটা ঘণ্টা রূপের জোয়ারে ভাসতে ভাসতেই ঢুকেছি লুসানে।
সেখানে অভ্যর্থনা জানাতে অপেক্ষা করছিল জেনেভা হ্রদ। স্বচ্ছ ও গাঢ় নীল রঙের পানি, সূর্যের আলোয় হীরার ঝিলিক দিয়ে যায়। হ্রদের ওপারে আল্পসের বিশাল সব চূড়া, তুষারাবৃত পাহাড় বেয়ে নেমে আসা জলরাশিতেই হ্রদের সৃষ্টি। পাহাড় ও জলধারার অপূর্ব মিতালিতে তৈরি হয়েছে এক অলৌকিক দৃশ্য।
স্বর্গে অনেক হুর-পরীর গল্প শুনেছি, তবে সেখানে এমন `সুইস শান্তিনিকেতন’-এর ছবির কথা কেউ বলেনি। হয়তোবা পৃথিবীর বুকে এমন স্বর্গভূমি আছে বলেই কেউ আর বলার ঝুঁকি নেয়নি। আরেকটা ব্যাপার দেখুন, ফুটবলের পুণ্যধামটাও এই সুইজারল্যান্ডে। এই দেশ কিন্তু ফুটবলে বড় কোনো শক্তি নয়, এরপরও বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা ফিফার অফিসটা কেন এখানে, তা নিয়ে নাকি রহস্য আছে।
এই গল্প পরে হবে। আগে বলি, ফিফা অফিস দর্শনের গল্প। জুরিখে তার অবস্থানটা বাংলাদেশের মতো কোনো নামিদামি জায়গায় নয়। অভিজাত কিছু করতে গেলেই বেছে আমরা চলে যাই গুলশান-বারিধারার মতো দামি জায়গা। এখানে বরং সরু পথ ধরে খানিকটা নির্জনতাই বেছে নিয়েছে `হোম অব ফিফা’। এখানে বরং জুরিখ শহরের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে। শহর ছাড়িয়ে যেতে যেতে সঙ্গী আরেক ক্রীড়া সাংবাদিক রেজওয়ান উজ জামান বলছিলেন, `ফিফা অফিসও দেখছি বনের মধ্যে।’ সত্যি তাই, উঁচু টিলা পেরিয়ে গাছ-গাছালির ভেতর দিয়ে যাওয়ার পরই দেখা মিলেছে ফিফা সদর দপ্তরের।
পাহাড়ের কোল ঘেঁষে তৈরি ফিফা ভবনটি বাইরে থেকে দেখলে বোঝা যাবে না এর মাহাত্ম্য। বলা হয় আধুনিক স্থাপত্যের একটি নিদর্শন এটি। ভবনটির চারদিকে ফুটবলের ভাস্কর্য আপনাকে স্বাগত জানাবে। বাইরে থেকে মনে হবে দোতলা বা তিনতলা ভবন। এটি আসলে আটতলা, মাটির নিচেই আছে পাঁচতলা। বড় অংশ থাকে সূর্যালোক-বর্জিত, ওখানে বিশ্ব ফুটবল নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সব আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হয়। ফিফা কর্মকর্তারা মনে করেন, `যেখানে বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় সেখানে আলো মানুষের ভেতর থেকে আসা উচিত।‘
ভবনের বাইরে আছে মাঠ। তারা মূল মাঠের নাম রেখেছে `এস্তাদিও পেলে’। হালের মেসি-রোনালদো-এমবাপ্পে নিয়ে এত মাতামাতি হলেও ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ভোলেননি ফুটবল সম্রাটের কথা। তার ফুটবল শ্রেষ্ঠত্বের ইতিহাস। ২০২২ সালে পেলের মৃত্যুর পর ফুটবলের এই `বিশ্বস্ত দূত’কে বিশেষ শ্রদ্ধা জানাতে ইনফান্তিনো নিয়েছিলেন এ উদ্যোগ। এটি টার্ফের মাঠ, যার পাশে সারি করে সাজানো আছে ২১১টি সদস্য দেশের জাতীয় পতাকা।
বলা হয়, জাতিসংঘের চেয়েও শক্তিশালী ফিফা। শুধু সদস্য সংখ্যা বেশি বলেই কি শক্তি! না, ফুটবলের আবেদন বিশ্বজনীন। ফুটবলানুরাগী না হলে তার জাদু ও আবেগ আপনাকে ছুঁয়ে যাবেই। তেমনি সুইজারল্যান্ডের দিগন্তজোড়া সবুজ উপত্যকা আর তার নীল হ্রদ আপনার চোখে এঁকে দেবে এক অদ্ভুত প্রশান্তির ছবি।



