আগামীর সময়

সেটপিসে এমন গোল ২০-২৫ বছরে হয়নি!

সেটপিসে এমন গোল ২০-২৫ বছরে হয়নি!

বাংলাদেশের জার্সিতে অভিষেকেই হইচই ফেলে দিয়েছেন রোনান সুলিভান। ছবি: বাফুফে

নিজেকে প্রমাণের একটা সুযোগ যেন খুঁজছিলেন রোনান সুলিভান। সে সুযোগটা এলো ম্যাচের ৫৪ মিনিটে। বক্সের প্রায় ২৫ গজ দূরে মিললো ফ্রি-কিক। বলটা দ্রুত কুড়িয়ে নিয়ে সতীর্থদের বোঝালেন সেটপিসটা নিজেই নিতে চান। শট নিতে এগিয়েছিলেন নুরুল হুদা ফয়সালও। রোনানের আগ্রহ দেখে তিনি সরে দাঁড়ালেন।

রোনানের দৃষ্টি তখন সামনের মানবদেয়াল ভেদ করে দূরের পোস্টে। একটু সময় নিয়ে মেপে ফেললেন সামনের বাধাগুলো। এরপর ডান পায়ের শটে হাওয়ায় ভাসালেন বল। যা পাকিস্তান কিপারকে সুযোগ না দিয়ে বাঁক খেয়ে পৌঁছে গেল পোস্টে। তাতেই শুরু বুনো উল্লাস। এর ১০ মিনিট পর আরেকটি নিখুঁত হেডে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ দলের জয় নিশ্চিত করেন রোনান। মালে ন্যাশনাল স্টেডিয়ামে সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপের ‘বি’ গ্রুপে প্রথম ম্যাচেই বাংলাদেশের সেমিফাইনাল অনেকটাই নিশ্চিত বলা যায়।

মঙ্গলবার ওই ম্যাচের পর থেকেই রোনানের সেটপিসে মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়েছে চারিদিকে। সোশ্যাল মিডিয়ায় সেই মুহূর্ত শেয়ার হচ্ছে হাজার-হাজার। ফুটবল-পণ্ডিতরাও তার মাঝে খুঁজে নিচ্ছেন আগামীর আশা। তাদেরই একজন জুলফিকার মাহমুদ মিন্টু।

বিশেষজ্ঞের ব্যাখ্যা

অভিজ্ঞ এই কোচ বলেই দিয়েছেন দেশের ফুটবলে বিগত ২০-২৫ বছরে সেটপিসে এমন গোল করতে দেখেননি। আগামীর সময়ের কাছে মুগ্ধতার কথাটা বলেছেন এভাবে, ‘যতদূর মনে পড়ে আমি এই ধরনের, এতদূর থেকে, এত টপ ক্লাস সেটপিসে গোল আর দেখিনি বাংলাদেশের। আমার মনে পড়ে না গত ২০-২৫ বছরে দেখেছি।’

মিন্টুর চোখে রোনান একজন অসাধারণ খেলোয়াড়। জাতীয় দলে সত্যিকারের নাম্বার নাইনের সংকট দীর্ঘদিনের। আগামীতে রোনানে এই সংকট ঘুঁচে যেতে পারে বিশ্বাস তার, ‘ওদের (সুলিভান ব্রাদার্স) নিয়ে আলোচনা অনেকদিন থেকেই ছিল এবং তারা এখন খেলছে যেকোনো প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই। আমি শুধু বলবো সে (রোনান) একজন অসাধারণ খেলোয়াড়। ওর গোলগুলো দেখছি এবং বিশেষ করে যদি বলি যে ফ্রি-কিকটা, এটা অসাধারণ গোল। এটাই একটা প্লেয়ারের ইন্ডিভিজুয়াল কোয়ালিটি। ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো কিংবা লিওনেল মেসিরা নিয়মিত ট্রেনিংয়ের বাইরেও কিন্তু শুধুমাত্র ফ্রি-কিক স্পেশালিস্ট হওয়ার জন্য আলাদা ট্রেনিং করে। আমার মনে হয়েছে রোনান ইন্ডিভিজুয়াল কোয়ালিটি দিয়ে দলকে জিতিয়েছে।’

বাংলাদেশের অভিজ্ঞ কোচ জুলফিকার মাহমুদ মিন্টু। ছবি: সংগৃহীত

রোনানের হেড থেকে করা দ্বিতীয় গোলটাও মিন্টুর চোখে অসাধারণ। যার মধ্য দিয়ে নিজের সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার প্রমাণ রেখেছেন তিনি। মিন্টুর ব্যাখ্যায়, ‘ওর দ্বিতীয় গোলটিও দেখেন, ওর মধ্যে ন্যাচারাল নাম্বার নাইন হওয়ার সামর্থ্য আছে। গোলের ধরনের কথা বলি। মার্কারকে কিভাবে ফাঁকি দিতে হয়, আবার মার্কারকে কিভাবে ব্যবহার করতে হয়, সেটা সে জানে। একজন নাম্বার নাইনের নিজের ইচ্ছেটা লুকিয়ে রাখার দক্ষতা থাকতে হয়। মার্কারকে বুঝতে না দেওয়া, তার মনের ভিতরে কী আছে। দ্বিতীয় গোলটা সে করার আগে ডিফেন্ডারকে ধোঁকা দিয়েছে। অফ দ্য বল মুভমেন্টে পজিশন তৈরি করে ঠাণ্ডা মাথায় ফিনিশ করেছে।’

এরপর মিন্টু যোগ করেন, ‘সে দূর্দান্ত প্লেয়ার, বাংলাদেশ জাতীয় দলের জন্য ভবিষ্যতে একটা সম্পদ হবে। আমি বর্তমানের কথা বলছি না। কারণ এখনও ও বড় প্রতিপক্ষের সঙ্গে খেলেনি। তারপরও সকালের সূর্য অনেক কিছু বুঝিয়ে দেয়। তাই আবারও বলছি ও আগামীর জন্য ভালো অপশন হয়ে উঠতে পারে।’

আমেরিকান সুলিভান ব্রাদার্স যেভাবে বাংলাদেশ দলে

যুক্তরাষ্ট্রে সাবেক ফুটবল দম্পতি ব্র্যান্ডন সুলিভান ও হাইক সুলিভানের চার ছেলে। চারজনই ফুটবলকে ক্যারিয়ার হিসেবে নিয়েছেন। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক তাদের নানী সুলতানা আলমের সুবাদে। দুই ভাই কুইন সুলিভান ও কাভান সুলিভান খেলছেন মেজর সকার লিগের ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের মূল দলে। এর মধ্যে ২১ বছরের অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার কুইন যুক্তরাষ্ট অনূর্ধ্ব-২০ দলের হয়ে ১৯ ম্যাচ খেলার পর গত বছর যুক্তরাষ্ট জাতীয় দলের ক্যাম্পেও ডাক পান এবং খেলেছেন তিনটি প্রীতি ম্যাচ।

১৬ বছরের কাভানও একই ক্লাবে খেলছেন দু'বছর ধরে। চার ভাইয়ের মধ্যে সবচেয়ে ছোট কাভান যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বয়সভিত্তিক জাতীয় দলে নিয়মিত খেলছেন। রোনান ও ডেক্লান সুলিভান জমজ। তাদেরও বেড়ে ওঠা ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়ন একাডেমিতে।

১৮ বছরের দুই ভাই অবশ্য অন্য ভাইদের মতো যুক্তরাষ্ট্রকে ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নেননি। তারা লাল-সবুজ জার্সিতে চেয়েছেন নিজেদের চেনাতে। বাংলাদেশের হয়ে খেলার প্রক্রিয়াটা শুরু হয় গত বছর থেকে।

তাদের আগ্রহ জানতে পেরে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন রোনান ও ডেক্লানের বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে। অবশেষে এই সাফের আসরের জন্য তাদের উড়িয়ে আনা হয়। আর অভিষেকেই রোনান নিজের জাত চিনিয়েছেন। ডেক্লানের অবশ্য পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলার সুযোগ হয়নি। তবে অচিরেই হয়তো তাকে দেখা যাবে মাঠে।

এই গোল মনে করিয়ে দেয় মিরাজুলকে

২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট নেপালের ললিতপুরে আনফা একাডেমির বিকেলের একটা মুহূর্ত মনে পড়ে গেছে রোনানের সেটপিস গোল দেখে। সেই বিকেলে সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে স্বাগতিক নেপালের মুখোমুখি হয়েছিল বাংলাদেশ। মিরাজুল ইসলামের জোড়া গোলে সেই ফাইনাল বাংলাদেশ জিতেছিল ৪-১ ব্যবধানে।

২০২৪ সালে সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপে ফ্রি-কিক থেকে গোল করেছিলেন মিরাজুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে বক্সের বেশ বাইরে ফ্রি-কিক পায় বাংলাদেশ। তখনও নেপালের গোল দরজা খোলা হয়নি বাংলাদেশের। সেটপিস নিতে গিয়েছিলেন রাব্বি হাসান রাহুল ও মিরাজুল। রাহুল শট নিতে গিয়েও নিলেন না। ডামি করে চাইলেন প্রতিপক্ষের মানবদেয়ালকে বিভ্রান্ত করতে। সুযোগে ডান পায়ের শটটা ভাসিয়ে দিলেন মিরাজুল। বাঁক খেয়ে যা জায়গা করে নেয় পোস্টে।

সেই আসরে ৪ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়া মিরাজুল এখন আছেন ভিয়েতনামে জাতীয় দলের সঙ্গে। বয়সভিত্তিক দলে নিজেকে প্রমাণ করেই শীর্ষ দলে সুযোগ পেয়েছেন। যেভাবে শুরু করেছেন, হয়তো কিছুদিনের মধ্যে রোনানকেও দেখা যাবে হামজাদের সঙ্গে একই ড্রেসিং রুমে।

    শেয়ার করুন: