বিশ্বকাপে স্পেন
ইয়ামালের জাদু ও ফুয়েন্তের কৌশলে ধরা দিতে পারে সোনালি ট্রফি

সংগৃহীত ছবি
অসম্ভব প্রতিভাবান একঝাঁক তরুণ। তাদের ১১ জন মাঠে নামলে খেলার মাঠ যেন হয়ে ওঠে শিল্পীর ক্যানভাস। পুরো ৯০ মিনিট যেন খেলা থেকে চোখ সরানোই দায়। হালের ফুটবল সৌন্দর্যের অন্যতম কাণ্ডারি স্পেন এই বিশ্বকাপেও থাকছে ফেভারিট হিসেবেই। স্প্যানিশ কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের বিশ্বকাপ স্বপ্নসারথি হবেন কারা?
বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি স্পেন উঁচিয়ে ধরেছে একবারই। জাভি-ইনিয়েস্তার সেই দল ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে শিরোপা জিতে গড়েছিল ইতিহাস।
২০১০-এর সেই স্বপ্নযাত্রার পর অবশ্য উড়তে থাকা স্পেন নেমে এসেছে মাটিতে। পরের তিন বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালেও পা রাখতে পারেনি তারা। টানা তিন বিশ্বকাপে এমন হতাশাজনক বিদায়ের পর দ্বিতীয় শিরোপার স্বপ্ন যেন ভুলতে বসেছিলেন সমর্থকরা।
সেই স্পেন অবশ্য ঘুরে দাঁড়িয়েছে দারুণভাবে। ২০২৪ ইউরোতে দাপটের সঙ্গে খেলেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছে লা রোহা। এবারের বিশ্বকাপের বাছাই পর্বটাও দারুণ কেটেছে স্প্যানিশদের। সব মিলিয়ে আবারও উঁকি দিচ্ছে বিশ্বকাপের স্বপ্ন।
মাঝমাঠের প্রাণ পেদ্রি
২০২০ ইউরোতে মাত্র ১৮ বছর বয়সে স্পেনের হয়ে মাঠে নামেন পেদ্রি। দুর্দান্ত পারফর্ম করে সবার নজরে এসেছিলেন এই তরুণ তুর্কি, জিতেছিলেন আসরের সেরা তরুণ ফুটবলারের খেতাবও।
প্রতি মৌসুমেই ইনজুরির সঙ্গে লড়েছেন পেদ্রি। ২০২৪ ইউরোতেও তাকে পুরো সময় পায়নি স্পেন। তবে যেটুক সময়ই মাঠে থেকেছেন, মাঝমাঠের সব আলো তিনি একাই কেড়েছেন। বিশেষ করে, শেষ ১৬-তে জর্জিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে তার পারফরম্যান্স মনে করিয়ে দিচ্ছিল জাভি-ইনিয়েস্তাদের।
২০২৪ সালে স্পেনের ইউরো জয়ের অন্যতম কারিগর ছিলেন পেদ্রি। এবারও স্পেনের মাঝমাঠের মূল ভরসা তিনিই। তবে সেই ইনজুরিই ভোগাচ্ছে তাকে। বিশ্বকাপের আগে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ফিরতে পারবেন কি না— এ নিয়েই কোচের কপালে চিন্তার ভাঁজ।
ইনজুরির সঙ্গে লড়ছেন বার্সা তারকা গাভি ও বিলবাও তারকা নিকো উইলিয়ামস। বিশ্বকাপের আগে সুস্থ হয়ে উঠলে দুজন নিশ্চিতভাবেই থাকবেন স্পেন স্কোয়াড।
তাদের সঙ্গী হতে পারেন পিএসজির ফ্যাবিয়ান রুইজ, আর্সেনালের মার্টিন জুবিমেন্দি ও মিকেল মেরিনো, লেভারকুসেনের অ্যালেক্স গারসিয়া, আতলেতিকো মাদ্রিদের পাবলো বারিওস ও অ্যালেক্স বায়েনা ও রিয়াল বেতিসের পাবলো ফোরনালস।
স্পেনকে
স্বপ্ন দেখাচ্ছেন ইয়ামাল
বার্সেলোনায় অভিষেকের পর থেকেই তার গায়ে লেগে গেছে ‘নতুন মেসির’ তকমা। মাত্র ১৬ বছর বয়সে ক্লাব ও ১৭ বছর বয়সে জাতীয় দলের হয়ে লামিনে ইয়ামাল যা করে দেখিয়েছেন, তা এক কথায় অবিশ্বাস্য। মাত্র দুই মৌসুমেই বার্সার সবচেয়ে বড় তারকা হয়ে উঠেছেন ইয়ামাল।
দে লা ফুয়েন্তে অনেক আগেই বলেছেন, জাদুর কাঠির ছোঁয়া পেয়েছেন ইয়ামাল। কেনই বা বলবেন না, প্রথমবার ইউরো খেলতে নেমেই যে দলকে এনে দিয়েছেন শিরোপা। টুর্নামেন্ট জুড়ে ইয়ামালের অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সেই সেবার ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছিল লা রোহারা।
প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারকে নাজেহাল করে ফরোয়ার্ডদের বল বানিয়ে দিয়েছেন, নিজেও করেছেন গোল। উইংয়ে তার উপস্থিতি অন্যরকম এক ভরসা দিয়েছে দলকে।
বিশ্বকাপেও তাই স্পেনের সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা ইয়ামাল। বাছাই পর্বের মতো বিশ্বকাপের মূল পর্বেও দলের আক্রমণকে নেতৃত্ব দেবেন এই ১৮ বছর বয়সী তারকা— পুরো স্পেন স্বপ্ন দেখছে এমনটাই।
সমস্যা হচ্ছে, ১৮ বছর বয়সী এই তারকা লড়ছেন হ্যামস্ট্রিং ইনজুরির সঙ্গে। এই মৌসুমে আর কাতালানদের হয়ে তার মাঠে নামা হবে না। বিশ্বকাপের আগে ফিরলেও গ্রুপ পর্বে বদলি হিসেবে ইয়ামালকে খেলানো হতে পারে বলেই আভাস দিয়েছেন কোচ।
ইয়ামালকে সঙ্গ দেবেন তার ক্লাব সতীর্থ দানি ওলমো, ফিরমিন লোপেজ ও ফেরান তোরেস। থাকতে পারেন রিয়াল সোসিয়েদাদের মিকেল ওয়েরজাবাল, ক্রিস্টাল প্যালেসের ইয়েরেমি পিনো, পোর্তোর সামু আহেওয়া ও সেলতা ভিগোর বোরহা ইলেসিয়াস।
ফুয়েন্তের মধ্যেও ‘স্কালোনি ম্যাজিক’
দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন করে গড়ে তুলেছেন স্পেনকে। দে লা ফুয়েন্তের অধীনেই পেদ্রি, ওলমো, ইয়ামাল, লোপেজ, গাভি, উইলিয়ামসদের বন্ধনটা দৃঢ় হয়েছে। তরুণদের নিয়ে গড়ে ওঠা দলকে ফুয়েন্তে ম্যাজিক দিয়েছে দারুণ আত্মবিশ্বাস।
টিকিটাকার সঙ্গে আক্রমণের ধার; এই দুয়ের মিশ্রণে ফুয়েন্তের ট্যাকটিকস হয়ে উঠেছে প্রতিপক্ষের মাথাব্যথার কারণ। বল নিজেদের দখলে রাখার ব্যাপারেও বেশ মনোযোগী তার দল। গড়ে ৫৮ শতাংশ বল দখলে রেখে প্রতিপক্ষের ওপর ছড়ি ঘুরিয়েছে স্পেন।
টানা তিনবার বিশ্বকাপ থেকে খালি হাতে ফেরা স্পেনকে এ কোচই দিয়েছেন শিরোপার স্বাদ। ২০২৪ ইউরোতে তার হাই প্রেস ট্যাকটিকসে স্পেন ছিল সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে।
এই বিশ্বকাপেও ট্যাকটিশিয়ানের ওপরেই ভরসা রাখছে স্পেন। ২০২২ বিশ্বকাপে অখ্যাত লিওলেন স্কালোনির হাতে যেমন শিরোপা শোভিত হয়েছিল, এবার ফুয়েন্তের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে সেই জাদুকরী প্রভাব।
কেমন হবে স্পেন স্কোয়াড
৪৮ দলের ঐতিহাসিক বিশ্বকাপের জন্য কিছুদিনের মধ্যেই চূড়ান্ত স্কোয়াড ঘোষণা করবেন দে লা ফুয়েন্তে। দলের গোলপোস্ট সামলানোর ভার থাকবেন আথলেতিক বিলবাও কিপার উনাই সিমনের ওপর। অনেক দিন ধরেই দলের এক নম্বর কিপার হিসেবে কোচের বেশ আস্থাভাজন হয়ে উঠেছেন তিনি। দুর্দান্ত ফর্মে থাকা সিমনের সঙ্গী হিসেবে বেঞ্চে থাকবেন রিয়াল সোসিয়েদাদের অ্যালেক্স রেমিরো ও আর্সেনালের ডেভিড রায়া।
স্পেনের দুর্বলতার জায়গা যদি থাকে, সেটা রক্ষণ। বেশ কয়েক বছর ধরেই রক্ষণ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভুগছে তারা। বিশ্বকাপে দলের রক্ষণের মূল দায়িত্বটা থাকবে চেলসির মার্ক কুকুরেয়া, বার্সেলোনার পাউ কুবারসি, রিয়াল মাদ্রিদের ডিন হুইসেন ও টটেনহামের পেদ্রো পোরোর ওপর।
তারা ঠিকঠাক রক্ষণ সামলাতে পারলে নতুন ইতিহাসের দিকেই যাত্রা করবেন স্পেন। আফ্রিকায় গিয়ে ঐতিহাসিক ২০১০ বিশ্বকাপে শিরোপা জিতে নিজেদের জার্সিতে প্রথম তারা লাগিয়েছিল স্পেন। ৪৮ দলের এই বিশ্বকাপেও পেদ্রি-ইয়ামালদের পায়ে রচিত হতে পারে নতুন ইতিহাস।





