হরমুজে মাইন অপসারণে ড্রোন মোতায়েনের প্রস্তুতি যুক্তরাজ্যের

সংগৃহীত ছবি
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালীতে মাইন শনাক্ত ও অপসারণে আন্ডারওয়াটার ড্রোন মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাজ্য। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে সম্ভাব্য মোতায়েনের জন্য জরুরি পরিকল্পনা করেছে লন্ডন। এ জন্য রয়্যাল ফ্লিট অক্সিলিয়ারির জাহাজ আরএফএ লাইম বেকে স্বয়ংক্রিয় ড্রোন ও মাইন অনুসন্ধানব্যবস্থা দিয়ে সজ্জিত করা হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের মন্ত্রীরা গত সপ্তাহে জানিয়েছিলেন, জিব্রাল্টারে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণে থাকা আরএফএ লাইম বেকে প্রশিক্ষণ মহড়ার জন্য ভূমধ্যসাগরে পাঠানো হবে। তবে পরে জানা যায়, ৫৮০ ফুট দীর্ঘ এই বে-শ্রেণির জাহাজকে হরমুজ প্রণালীতে পাঠানোর জন্যও জরুরি পরিকল্পনা অনুমোদন করা হয়েছে।
জিব্রাল্টারেই জাহাজটিতে স্বয়ংক্রিয় মাইন অপসারণব্যবস্থা বসানো হবে। এর মধ্যে থাকবে ডুবো ড্রোন ও মাইন অনুসন্ধানকারী নৌযান। এতে সমুদ্রতল পর্যবেক্ষণ ও মাইন নিষ্ক্রিয়করণ অভিযানে জাহাজটি ‘মাদার শিপ’ হিসেবে কাজ করতে পারবে।
যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা খাতের একটি সূত্র জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীতে সেনা মোতায়েনের বিষয়ে এখনো ‘কোনো সিদ্ধান্ত’ হয়নি। তবে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরায় চালু করতে প্রয়োজন হলে সহায়তার জন্য এই পদক্ষেপ মন্ত্রীদের হাতে বিভিন্ন বিকল্প তুলে দেবে।
এর আগে জানানো হয়েছিল, এ অঞ্চলে আগে থেকেই দায়িত্বে থাকা রয়্যাল নেভির মাইন অ্যান্ড থ্রেট এক্সপ্লয়টেশন গ্রুপের ড্রোন মোতায়েনের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই ইউনিট আরএফএ লাইম বেতে থাকা সরঞ্জাম পরিচালনায় সহায়তা করবে। জাহাজটি ৫০০ জন পর্যন্ত সেনা বহনে সক্ষম। এতে চিকিৎসাসুবিধা ও অস্ত্রব্যবস্থাও রয়েছে।
হরমুজ প্রণালীতে মাইনমুক্তির জন্য ব্যবহৃত ড্রোনগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা। শক্তিশালী সেন্সরের সাহায্যে এগুলো সমুদ্রপৃষ্ঠ ও সমুদ্রতলের মাইন শনাক্ত করে ধ্বংস করতে পারবে।
ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি জানিয়েছেন, আরএফএ লাইম বের পাশাপাশি হরমুজ ও মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমানও পাঠাচ্ছে যুক্তরাজ্য। এসবের কাজ হবে প্রণালী দিয়ে চলাচলরত বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
চলতি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্য সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাজ্যের প্রতিক্রিয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, হরমুজ প্রণালী আবার চালু করার প্রচেষ্টায় ব্রিটেনের ‘উৎসাহের সঙ্গে জড়িত হওয়া উচিত’।
শনিবার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, হাজারো অভিযাত্রী সেনা বহনকারী যুক্তরাষ্ট্রের উভচর যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ত্রিপোলি (এলএইচএ-৭) মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে। এক বিবৃতিতে তারা জানায়, ‘ইউএসএস ত্রিপোলিতে থাকা মার্কিন নাবিক ও মেরিন সেনারা গত ২৭ মার্চ সেন্টকমের দায়িত্বাধীন এলাকায় পৌঁছেছে।’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলা শুরু করার পর থেকে এ অঞ্চলে উত্তেজনা বেড়েই চলেছে। এতে তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিসহ দুই হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। জবাবে ইসরায়েল, জর্ডান, ইরাক এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে ইরান।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। মাসের শুরু থেকে প্রণালীটি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। সাধারণ সময়ে এই পথ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়। অচলাবস্থার কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে, সেই সঙ্গে বিশ্ববাজারে তেলের দামও বেড়েছে।
হরমুজ প্রণালী আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন বিশ্বে যে পরিমাণ তেল ও তরলীকৃত গ্যাসবাহী জাহাজ চলাচল করে, তার প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ ব্যবহার করে। সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরাকসহ মধ্যপ্রাচ্যের বড় তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো এই প্রণালীর মাধ্যমে জ্বালানি রপ্তানি করে।
যুদ্ধ শুরুর পর ইরান এই প্রণালীতে অবরোধ জারি করে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) বলেছে, যুদ্ধ চলা পর্যন্ত এই পথ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও তাদের মিত্রদের জাহাজ চলাচল করতে দেওয়া হবে না। ব্রিটিশ সামুদ্রিক চলাচল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে হরমুজে ইরানি হামলার শিকার হয়েছে এক ডজনের বেশি তেলবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ।

