আগামীর সময়

সংঘাতে থমকে চীনের ‘বিশ্ব সুপারমার্কেট’, পণ্য জমছে গুদামে

সংঘাতে থমকে চীনের ‘বিশ্ব সুপারমার্কেট’, পণ্য জমছে গুদামে

চাপের মুখে চীনের বাণিজ্য

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত প্রভাব ফেলছে চীনের অর্থনীতিতে। দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় কাউন্টি শহর ইয়িউ পৃথিবীজুড়ে ‘বিশ্ব সুপারমার্কেট’ হিসেবে পরিচিত। এখন সেখানে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। বিশাল সব দোকান ও শোরুমে ঘুরলে মনে হয়, এটি আর বেচাকেনার কেন্দ্র নয়, বরং পরিণত হচ্ছে বিশাল গুদামঘরে।

শহরটিতে প্রায় ৫ কোটি বর্গফুটের বেশি এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে আছে ৮০ হাজারেরও বেশি দোকান। বিক্রি হয় ক্রিসমাস সাজসজ্জা, প্লাস্টিক খেলনা, গৃহস্থালি সামগ্রী থেকে শুরু করে উন্নতমানের ইলেকট্রনিকস। বিশ্বের বড় বড় খুচরা বিক্রেতা— যেমন আমাজন ও ওয়ালমার্ট এখান থেকেই বিপুল পণ্য সংগ্রহ করে। তাই বলা হয়, ‘বিশ্ব যা কিনে, ইয়িউ তা বিক্রি করে।’

তবে সম্প্রতি শহরটির চেনা পরিবেশ আর নেই। যেসব পণ্য এখন সমুদ্রপথে বিভিন্ন দেশে যাওয়ার কথা, সেগুলো পড়ে আছে দোকান ও গুদামে। আর এর পেছনে আছে হাজার মাইল দূরের মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত। আমেরিকা-ইসরায়েলের যৌথ অভিযান এবং ইরানের হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণের ফলে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে। যদিও এই বাজারের ঠিক কত শতাংশ বাণিজ্য মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর তার নির্দিষ্ট তথ্য নেই। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা অবশ্য বলছেন শহরটির প্রায় ৩০ শতাংশ পণ্য মধ্যপ্রাচ্যে যায়।

‘মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের অনেক ক্রেতা আছে’ বলছিলেন জুতা ব্যবসায়ী সুয়াদ ডিং। তার শো রুমে সারি সারি সাজানো জুতা ও বুটের মধ্যে প্রায় ২৫ হাজার জোড়া পণ্য রিয়াদ ও কায়রো যাওয়ার কথা ছিল। এখন সেগুলো আটকে আছে।

তিনি বলছিলেন, ‘যুদ্ধের আগে একটি কনটেইনার পাঠাতে খরচ হত প্রায় ১ হাজার ২০০ মার্কিন ডলার। বর্তমানে তা বেড়ে ৬ হাজার ডলারে দাঁড়িয়েছে। এই বাড়তি খরচের কারণে পণ্য নিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন ক্রেতারা। অনেক আমদানিকারক অপেক্ষা করছেন, কখন পরিবহন খরচ কমবে।’

এমন পরিস্থিতিতে বিকল্প বাজার খুঁজছেন ব্যবসায়ী ডিং। সম্প্রতি আর্জেন্টিনার কিছু ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে তার। ‘যুদ্ধ বড় প্রভাব ফেলবে, তবে আমরা বসে থাকব না। অন্য দেশের বাজারে ব্যবসা বাড়ানোর চেষ্টা করব’, যোগ করেন তিনি।

শুধু জুতা নয়, অন্য পণ্যও একইভাবে আটকে আছে। ইয়িউ শহরের বাইরে ব্যবসায়ী লি তেংহুইয়ের একটি গুদামে ছাদ পর্যন্ত স্তূপ করে রাখা রান্নাঘরের সরঞ্জাম। এসব পণ্য লেবাননে যাওয়ার কথা ছিল। পাশাপাশি ইরাকের জন্য তৈরি যন্ত্রাংশ এবং সৌদি আরবে পাঠানোর জন্য প্রস্তুত কাঁচের পণ্যও সেখানে পড়ে আছে।

লি জানান, পণ্য আটকে থাকার কারণ দুটি— একদিকে আমদানিকারকরা বাড়তি পরিবহন খরচ বহন করতে পারছে না। অন্যদিকে জাহাজে হামলার আশঙ্কায় অনেকে পণ্য নিতে চাইছে না। মধ্যপ্রাচ্যের ক্রেতাদের কাছ থেকে নতুন অর্ডার প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও বেড়ে যাওয়ার কথাও বলছেন তিনি। লি’র ভাষ্যমতে, প্লাস্টিক পণ্যের কাঁচামালের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে, যা পুরো পণ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলবে।

আর এই সংকট শুধু রপ্তানিতে সীমাবদ্ধ নয়; আমদানিতেও প্রভাব পড়ছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এরিকা ডাউনস জানাচ্ছেন, চীন তার প্রায় ৩০ শতাংশ তরল প্রাকৃতিক গ্যাস কাতার থেকে আমদানি করে। এই সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে কাঁচ, সিরামিকসহ বিভিন্ন শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

অন্যদিকে ইরানের তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা বেইজিং। ২০২৫ সালে ইরানের মোট তেলের প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কিনেছে তারা। বর্তমানে চীনের জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে ইরান, ফলে ক্ষুদ্র স্বাধীন রিফাইনারিগুলো কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারছে। তবে ইরান থেকে আমদানি করা তেল চীনের মোট আমদানির মাত্র ১১ থেকে ১৩ শতাংশ। অর্থাৎ চীন বিভিন্ন দেশ থেকে তেল সংগ্রহ করে, একক কোনো উৎসের ওপর নির্ভরশীল নয়।

সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে চীন আগেই কৌশলগত মজুদ হিসেবে বিপুল পরিমাণ তেল সংগ্রহ করেছে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির জনপ্রিয়তাও বেড়েছে, যা জ্বালানি নির্ভরতা কমাতে সহায়তা করছে। তবে এমন সংকটের মধ্যেও ইয়িউ শহরের ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক ধরনের আশা কাজ করছে।

স্থানীয় চেম্বার অব কমার্সের সহ-সভাপতি লি ইয়ে বলছেন, এমন যুদ্ধ পরিস্থিতি নতুন নয়। ইরাক যুদ্ধের সময়ও একই ধরনের সংকট দেখা গিয়েছিল। যুদ্ধ শেষে সেই দেশগুলো পুনর্গঠনের জন্য আবার চীনের পণ্যের ওপর নির্ভর করেছে। তিনি মনে করছেন, বর্তমান সংঘাত শেষ হলে ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এবং এমনকি ইসরায়েলও পুনর্গঠনের জন্য চীনা পণ্যের চাহিদা বাড়বে। এ কারণেই চীন সরাসরি কোনো পক্ষ নিচ্ছে না।

এই ব্যবসায়ী নেতার ভাষ্য, ‘চীন যদি আগামী ১০ থেকে ২০ বছর বড় কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়ে, তাহলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি।’ ফলে এটুকু নিশ্চিত বলা যায়, বর্তমান বাস্তবতায় ইয়িউ শহরের ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়লেও ভবিষ্যতের সম্ভাবনার দিকেই তাকিয়ে আছে দেশটির ব্যবসায়ীরা।

    শেয়ার করুন: