মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত যুদ্ধে জড়াবে না যুক্তরাজ্য: ট্রাম্পকে জবাব স্টারমারের

মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া বিস্তৃত যুদ্ধে যুক্তরাজ্য জড়াবে না বলে জানিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। তিনি বলেছেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে কাজ করছে তার সরকার, তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বিস্তৃত ইরান যুদ্ধের’ অংশে যুক্তরাজ্য জড়াবে না।
তিনি জানান, তেল ও গ্যাস পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথটি খোলা রাখতে সামরিক সম্পৃক্ততা নিয়ে ইউরোপীয় মিত্রসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে। প্রণালিটি বন্ধ থাকায় যুক্তরাজ্যে জ্বালানির দাম বাড়া এবং রেশনিংয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
তবে স্টারমার স্পষ্ট করে বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাজ্য অংশ নেবে না। একই সঙ্গে সপ্তাহান্তে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন, সে বিষয়েও তিনি এখনই কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি। তার মতে, এমন পদক্ষেপ সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
লন্ডনের ডাউনিং স্ট্রিটে এক সংবাদ সম্মেলনে স্টারমার বলেন, তিনি দ্রুত যুদ্ধের অবসান চান। তার ভাষায়, যুক্তরাজ্য ও তার মিত্ররা গুরুত্বপূর্ণ এই তেল ও গ্যাস পরিবহনপথে আরোপিত অবরোধ তুলে নেওয়ার জন্য একটি ‘বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা’ তৈরিতে ‘কঠোর পরিশ্রম’ করছে।
স্টারমার উল্লেখ করেছেন, ‘নিজেদের এবং আমাদের মিত্রদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে, কিন্তু আমরা এই বৃহত্তর যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ব না।’
‘আমি চাই যত দ্রুত সম্ভব এই যুদ্ধের অবসান হোক। কারণ যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, পরিস্থিতি তত বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠবে এবং দেশের ভেতরে জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপরও তার প্রভাব তত বাড়বে’, বলেছেন তিনি।
এর আগে যুক্তরাজ্যসহ অন্যান্য দেশকে হরমুজ প্রণালি নিরাপদ রাখতে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, সদস্য রাষ্ট্রগুলো যদি সহায়তায় এগিয়ে না আসে, তবে ন্যাটোর ভবিষ্যৎ ‘খুবই খারাপ’ হতে পারে।
তবে প্রণালি বন্ধ থাকার ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা বাড়লেও বেশ কয়েকটি দেশ এখন পর্যন্ত ট্রাম্পের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে।
যুক্তরাজ্যের মন্ত্রীরা এ ক্ষেত্রে বিকল্প পরিকল্পনা হিসেবে প্রণালিতে মাইন অপসারণকারী ড্রোন পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করছেন বলে জানা গেছে।
স্টারমার বলেছেন, ‘অবশেষে আমাদের হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দিতে হবে, যাতে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে। এটি সহজ কাজ নয়। এ বিষয়ে একটি কার্যকর পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে। আমরা চাই এতে যত বেশি সম্ভব অংশীদার যুক্ত থাকুক। বিশেষ করে ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে কথা বলছি, একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও আলোচনা হচ্ছে। কারণ একটি বিশ্বাসযোগ্য ও কার্যকর পরিকল্পনা প্রয়োজন।’
তিনি যোগ করেন, ‘এটি মোটেই সহজ নয়, সরলও নয়। তাই আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে একটি বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা প্রস্তুত আছে।’
প্রণালিতে যুদ্ধজাহাজ পাঠানো হবে কি না, এ প্রশ্নে স্টারমার জানান, এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তার ভাষ্যে, ‘বিভিন্ন বিকল্প খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আলোচনা চলছে। এখনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর্যায়ে পৌঁছাইনি।’
এমন এক সময়ে স্টারমার এই বক্তব্য দিলেন, যখন তিনি ঘোষণা করেন গৃহস্থালি পর্যায়ে যারা ঘর গরম রাখতে হিটিং অয়েলের ওপর নির্ভর করেন, তাদের জন্য পাঁচ কোটি ৩০ লাখ পাউন্ডের সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত দাম নেওয়ার অভিযোগে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।
জ্বালানি বিল বাড়তে থাকলে আরও বিস্তৃত সহায়তা দেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি স্টারমার। তবে জুনে মূল্যসীমা শেষ হওয়ার পর তেলের দাম কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা এখনই নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এর আগে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আবারও হরমুজ প্রণালিতে মিত্রদের সহায়তার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘যারা এই প্রণালির সুবিধাভোগী, তাদেরই নিশ্চিত করতে হবে যাতে সেখানে কোনো খারাপ কিছু না ঘটে।’ এর আগে তিনি যুক্তরাজ্য, চীন, ফ্রান্স, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকে এই পথ নিরাপদ রাখতে জাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন।
ট্রাম্প আরও সমালোচনা করেন, ইরানের বিরুদ্ধে প্রথম দফার হামলার সময় যুক্তরাষ্ট্রকে যুক্তরাজ্যের ঘাঁটি ব্যবহার করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল স্টারমারের সরকার। ট্রাম্প বলেছেন, ‘যুক্তরাজ্যকে অনেক সময় সবচেয়ে বড় মিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু যখন আমি তাদের অংশ নিতে বলেছিলাম, তারা আসতে চায়নি।’
ট্রাম্পের ভাষ্য, ‘আমরা যখন মূলত ইরানের বিপজ্জনক সক্ষমতা ধ্বংস করে ফেললাম, তখন তারা (যুক্তরাজ্য) বলল ‘ঠিক আছে, আমরা দুইটি জাহাজ পাঠাব।’ আমি বলেছিলাম, আমাদের এই জাহাজগুলো দরকার ছিল জয়ের আগে, পরে নয়।’
স্টারমার জানান, সপ্তাহান্তে এ বিষয়ে তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গেও কথা বলেছেন। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী স্বীকার করেন, তেল ও গ্যাসের দাম বাড়ার ফলে যুক্তরাজ্যের পরিবারগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে। তিনি জানান, ইতিমধ্যে ঘোষিত সরকারি নীতির ফলে যে আর্থিক সাশ্রয় হচ্ছে, তা গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দিতে জ্বালানি কোম্পানিগুলোকে ‘আইনি নির্দেশনা’ দেওয়া হয়েছে।

