কেন মলিন হচ্ছে ব্রিটেনের নাইটলাইফের জেল্লা?
- ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে যুক্তরাজ্যের এক-চতুর্থাংশ নাইটক্লাব ও বার। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শহর বার্মিংহাম। সেখানে যেসব ক্লাব ও বার টিকে আছে, সেগুলোও হিমশিম খাচ্ছে গ্রাহক টানতে।

বার্মিংহামে একটি পাবের সামনে দুজন। ছবি: সংগৃহীত
মলিন হয়ে যাচ্ছে ব্রিটেনের রাতের জীবন। কিন্তু কেন? এর উত্তর খুঁজে বের করতে হলে আপনাকে বার্মিংহামে কাটাতে হবে এক রাত। তাই বেরিয়ে পড়লাম।
৫ পাউন্ডের প্রবেশমূল্য নিয়ে শুরু করলাম যাত্রা। একটি পাবের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই কানে ভেসে এলো গান। তবে পাবের ভেতরের চিত্র হতাশাজনক, কারণ নাচের ফ্লোর পুরোটাই ফাঁকা।
ঝলমলে আলোয় জোরেশোরে পপগান বাজলেও ভেতরে তেমন মানুষ নেই। কেবল কয়েকজন বারটেন্ডার যত্রতত্র ছিল দাঁড়িয়ে।
এটি কোনো নিরস মঙ্গলবার রাতের দৃশ্য নয়। আমি বেরিয়েছি শনিবার রাতে, যখন শহরের বার আর ক্লাবগুলো জমজমাট থাকার কথা। অথচ বার্মিংহাম একেবারেই নির্জন। এ শহরের জন্য যা একেবারেই অপ্রত্যাশিত।
নাইট টাইম ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে যুক্তরাজ্যের এক-চতুর্থাংশ নাইটক্লাব ও বার বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শহর বার্মিংহাম। যেগুলো টিকে আছে, গ্রাহক টানতে হিমশিম খাচ্ছে সেগুলোও। বাড়তি খরচ, কভিড-পরবর্তী অভ্যাসের পরিবর্তন, গেন্ট্রিফিকেশন— সব মিলিয়ে ব্রিটেনের নাইটলাইফ যেন ধীরে ধীরে যাচ্ছে নিভে।
এ প্রবণতায় বার্মিংহাম সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। এই সময়ে শহরের বার, ক্লাব ও অন্যান্য রাতের আড্ডার জায়গা কমে গেছে ২৮%, বড় শহরগুলোর মধ্যে যা সর্বোচ্চ।
এই আড্ডার জায়গা কমে যাওয়ার জন্য রয়েছে নানাবিধ কারণ। এগুলোর মধ্যে রয়েছে— ভাড়া, ব্যবসার ট্যাক্স আর কর্মচারীর খরচ বেড়ে যাওয়া। পাশাপাশি ক্রমেই মদপান এড়িয়ে চলছে মানুষ।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের এক জরিপে দেখা গেছে, ইংল্যান্ডের প্রতি চারজনের মধ্যে একজন মদ পান করেন না। ওয়েস্ট মিডল্যান্ডস আর লন্ডনে এই সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
বার্মিংহামে রাত বাড়তে থাকলেও ব্রড স্ট্রিটের বারগুলো প্রায় অর্ধেক খালি। একসময় এখানে প্রিজম নাইটক্লাব চেইন ছিল তুমুল জনপ্রিয়, কিন্তু ২০২৪ সালেই এর সব শাখা হয়ে যায় বন্ধ।
রাত ১টার পর আমরা পৌঁছাই গে ভিলেজে। নাইটিঙ্গেলস ক্লাবটিও ফাঁকা, তবে ভিলেজ ইন ভেন্যুতে ঢুকে অবশেষে দেখা পাওয়া যায় জমজমাট ভিড়ের। ভেতরে দুই রুমে আলাদা গান বাজছে— একটিতে পপ ক্ল্যাসিক, অন্যটিতে আর অ্যান্ড বি। পানীয়ও তুলনামূলক সস্তা। ভোর ৫টায় ক্লাব বন্ধ হওয়ার পর এক ক্যাফেতে বার্গার আর চিপস খেয়ে শেষ হলো রাতটা।
বার্মিংহামের সোনালি যুগ ছিল ৮০–৯০ দশকে। তখন রাম রানার, কিউ ক্লাব, জেবিসের মতো ভেন্যু শহরটিকে করে তুলেছিল আকর্ষণীয়। এখন সেগুলো বন্ধ। শহরে জনসংখ্যার ঘনত্ব কম হওয়ায় মূল শহরের ভেন্যুগুলোতেও ভিড় হয় না। লন্ডন ও ম্যানচেস্টারের তুলনায় অনেক কম মানুষ বাস করেন এখানে। রাত শেষে তাদের বাড়ি ফেরাও হয়ে যায় ব্যয়বহুল।
প্রমোটার অ্যান্ডি মিলফোর্ড বলেছেন, এখানে মূলত ছাত্ররা থাকে, তাই দীর্ঘমেয়াদি কমিউনিটি গড়ে ওঠে না।’
‘সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনা, কভিড লকডাউন আর বাড়ি থেকে কাজ করার প্রবণতা শহরকে আরও ফাঁকা করে দিয়েছে।’
নাইট টাইম শিল্প সমিতির প্রধান মাইকেল কিল জানান, ২০২০ থেকে পাব পরিচালন ব্যয় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়ে গেছে। জাতীয় বীমা, ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, ইরান যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকট— সব মিলিয়ে অনেক ভেন্যুই নামমাত্র টিকে আছে।
শহরগুলো ক্রমেই উচ্চবিত্তকেন্দ্রিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা একটি বড় সমস্যা। পুরনো নাইটক্লাব ও মিউজিক ভেন্যুর জায়গায় এখন উঠেছে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। নতুন বাসিন্দারা উচ্চ শব্দ নিয়েও করছেন অভিযোগ। ম্যানচেস্টারের নাইট অ্যান্ড ডে ক্যাফে তিন বছরের আইনি লড়াইয়ের পর বাধ্য হয়েছে রাতে পাবের শব্দ কমাতে।
লন্ডনের সোহোতেও চলছে একই দ্বন্দ্ব। তবে সরকার এখন গুরুত্ব দিয়ে দেখছে বিষয়টিকে। লন্ডনের মেয়র সাদিক খানকে ক্ষমতা দেওয়া হতে পারে, যেন তিনি স্থানীয় কাউন্সিলের বাধা অতিক্রম করেও খোলা রাখতে পারেন পাব ও ক্লাবগুলো।
কাউন্সিলগুলোর প্রতি মাইকেল কিল বলেছেন, ‘আমাদের ক্লাব, ইভেন্ট, উৎসব বিশ্ব জুড়ে পরিচিত। এগুলো সৃজনশীলদের ক্যারিয়ার শুরু করার জায়গাও। এটা স্বীকার করতে হবে।’
সবশেষে বলা যায়, বার্মিংহামের নাইটলাইফ আর আগের মতো নেই। তবে সঠিক জায়গা খুঁজে পেলে এখনো কাটানো যায় ভালো সময়। সূত্র: গার্ডিয়ান





