স্টারমারের হুঁশিয়ারি
সহিংসতা উসকে দিলে বরদাশত করা হবে না

সংগৃহীত ছবি
যুক্তরাজ্যে সহিংসতা, ঘৃণা বা বিভাজন উসকে দেওয়ার চেষ্টা করলে ইরান বা অন্য কোনো বিদেশি শক্তিকে পরিণতি ভোগ করতে হবে বলে সতর্ক করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার।
সাম্প্রতিক 'ইহুদিবিদ্বেষী' হামলাগুলোর পেছনে বিদেশি রাষ্ট্রের ভূমিকা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে যুক্তরাজ্য সরকার। লন্ডনের ডাউনিং স্ট্রিটে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে মন্ত্রী, পুলিশপ্রধান ও কমিউনিটি নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে স্টারমার জানালেন, গোল্ডার্স গ্রিনে সাম্প্রতিক ছুরিকাঘাতের মতো হামলার পেছনে বিদেশি রাষ্ট্রগুলো ঘৃণা উসকে দিয়েছে কি না, তা তদন্ত করছেন কর্মকর্তারা।
স্টারমারের ভাষ্য, ‘ইরান বা অন্য কোনো দেশ যদি আমাদের সমাজে সহিংসতা, ঘৃণা বা বিভাজন ছড়ানোর চেষ্টা করে, তাদের প্রতি আমাদের বার্তা হলো— এটি বরদাশত করা হবে না। যদি এমন কিছু প্রমাণিত হয়, তাহলে এসব কর্মকাণ্ডের পরিণতি থাকবে— এ বিষয়ে আমরা পরিষ্কার।’
ব্রিটেনে ইহুদি সম্প্রদায়ের ওপর একের পর এক হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবিলায় নতুন পদক্ষেপ ও অতিরিক্ত অর্থায়নের ঘোষণা দেন স্টারমার।
গত সপ্তাহে লন্ডনের গোল্ডার্স গ্রিনে ছুরিকাঘাতের ঘটনা ছিল ব্রিটেনের ইহুদি সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে সাম্প্রতিক একাধিক ঘটনার সর্বশেষ উদাহরণ। স্টারমার এ পরিস্থিতিকে ‘সংকট’ হিসেবে বর্ণনা দেন। ‘ক্ষতিকর হুমকি’ মোকাবিলায় নতুন আইন দ্রুত পাস করা হবে, উল্লেখ করেন তিনি।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসকে নিষিদ্ধ করার দাবির মধ্যেই ব্রিটিশ সরকার রাষ্ট্রসমর্থিত গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নতুন আইনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
পুলিশ, শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গন, উচ্চশিক্ষা, ট্রেড ইউনিয়ন ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে গোলটেবিল বৈঠকে স্টারমার বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এবং শিল্পাঙ্গনে ইহুদিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির প্রতিশ্রুতি দেন।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবিলায় ‘বাস্তব পদক্ষেপ’ দেখাতে হবে। আর্টস কাউন্সিলকেও বলা হবে, কেউ ইহুদিবিদ্বেষ প্রচার করলে তার অনুদান প্রত্যাহার বা ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থা করতে।
‘আমরা এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাছ থেকে আশা করি, তারা ইহুদিবিদ্বেষের জন্য স্পষ্ট শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নির্ধারণ করবে এবং তা কার্যকর করবে। এ বিষয়ে আমরা তাদের জবাবদিহির আওতায় আনব।’, মন্তব্য স্টারমারের।
তিনি যোগ করেন, ‘আজ আমি ঘোষণা করছি, আমরা মানদণ্ড আরও উঁচুতে তুলব। কোনো অনিয়ম ঘটলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পদক্ষেপ দেখাতে হবে। এখন থেকে আশা করব, তারা নিজেদের ক্যাম্পাসে সমস্যার ব্যাপ্তি প্রকাশ করবে, পাশাপাশি তা দমনে কী সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিয়েছে, সেটিও জানাবে। নিষ্ক্রিয়তার ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।’
স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবিলায় সরকার এরই মধ্যে ৭ মিলিয়ন পাউন্ড বরাদ্দ দিয়েছে। স্টারমার বললেন, ’সরকার চায় সব স্কুলে হলোকাস্ট শিক্ষা নিশ্চিত করা হোক।’
ইউনিয়ন অব জিউইশ স্টুডেন্টসের সভাপতি লুইস ড্যাঙ্কার ডাউনিং স্ট্রিটের বৈঠকে জানালেন, ’ব্রিটেনে ইহুদিবিদ্বেষের সংকট চলছে’ এবং ’অনেক তরুণ ইহুদি এখন নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ।’
এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই স্নাতক মন্তব্য করেন, ’বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি সৌভাগ্যবান ছিলাম যে, আমার অ-ইহুদি বন্ধুরা আমাকে সমর্থন করেছে।’
তিনি আরও জানালেন, ’আমি সৌভাগ্যবান বলছি, কারণ ইউনিয়ন অব জিউইশ স্টুডেন্টসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রতি পাঁচ শিক্ষার্থীর একজন ইহুদির সঙ্গে বাসা ভাগাভাগি করতে অনিচ্ছুক বা দ্বিধাগ্রস্ত। পুরনো কুসংস্কার-পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে গেড়ে বসছে।’
বৈঠকের আগে ইহুদি সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা প্রকল্পে সহায়তা এবং ইহুদিবিদ্বেষী প্রচারণা মোকাবিলায় সরকার আরও ১ মিলিয়ন পাউন্ড অর্থায়ন ঘোষণা করে। গোল্ডার্স গ্রিন হামলার পর নিরাপত্তা বাড়াতে ঘোষিত অতিরিক্ত ২৫ মিলিয়ন পাউন্ডের সঙ্গে এটি যুক্ত হবে। এতে মূলত লন্ডন ও ম্যানচেস্টারে ইহুদি সম্প্রদায়ের নিরাপত্তায় এ বছর মোট অর্থায়ন দাঁড়াবে ৫৮ মিলিয়ন পাউন্ডে।
স্টারমারের ঘোষণার কিছুক্ষণ আগে মেট্রোপলিটন পুলিশ জানায়, পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটসে একটি সাবেক সিনাগগে অগ্নিসংযোগের ঘটনা সন্ত্রাসবিরোধী পুলিশ তদন্ত করছে। এর আগে গোল্ডার্স গ্রিনের একটি স্মৃতিদেয়ালে অগ্নিসংযোগ, দুটি হাতজোলা অ্যাম্বুলেন্সে আগুন এবং গত বছর ম্যানচেস্টারের হিটন পার্ক সিনাগগে হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় নিহত হন দুজন।
ইরানকে স্টারমারের সতর্কবার্তা এসেছে লন্ডনে ইরানি দূতাবাসের টেলিগ্রাম পোস্ট নিয়ে ইরানের রাষ্ট্রদূতকে পররাষ্ট্র দপ্তরে তলব করার পর। ’স্যাক্রিফাইস ফর দ্য হোমল্যান্ড ক্যাম্পেইন’-এর সঙ্গে যুক্ত ওই পোস্টে লেখা ছিল, ’দেশকে শত্রুর হাতে তুলে দেওয়ার চেয়ে আমরা সবাই হত্যার কাছে আত্মসমর্পণ করি।’
তখন ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস বলেছিল, ’মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক মন্ত্রী হামিশ ফ্যালকনার যুক্তরাজ্যে ইরান দূতাবাসের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অগ্রহণযোগ্য ও উসকানিমূলক মন্তব্যের জবাবে ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছেন।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ’মন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন, এসব কর্মকাণ্ড ও মন্তব্য সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। দূতাবাসকে এমন যেকোনো যোগাযোগ বন্ধ করতে হবে, যা যুক্তরাজ্য বা আন্তর্জাতিকভাবে সহিংসতা উৎসাহিত করা হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।’
ইরানি দূতাবাসের এক মুখপাত্র অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে জানান, ’বিশ্ব জুড়ে ইরানিরা সব সময় তাদের মাতৃভূমি এবং এর ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার বিষয়ে গভীরভাবে যত্নশীল ছিলেন, এখনো আছেন।’
‘জান ফাদা’ প্ল্যাটফর্ম তাদের জন্য, যেসব ইরানি নিজেদের দেশকে সমর্থন ও রক্ষা করতে চান। এটি কোনো ধরনের বৈরিতা প্রচার করে না’, যোগ করেন তিনি।
‘এর বিপরীত কোনো দাবি বা ধারণা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এ ধরনের পক্ষপাতদুষ্ট মূল্যায়ন তড়িঘড়ি করে এবং যথাযথ বোঝাপড়া ছাড়াই করা হচ্ছে’, মুখপাত্র আরও জানান।



