হরমুজ সংকট
৩৫ দেশের ভার্চুয়াল বৈঠক ডেকেছে যুক্তরাজ্য
- ইইউর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতায় জোর স্টারমারের

সংগৃহীত ছবি
ইরান যুদ্ধ ঘিরে সৃষ্ট বৈশ্বিক উত্তেজনার মধ্যে হরমুজ প্রণালির সংকট নিরসনে বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) ৩৫ দেশের অংশগ্রহণে একটি ভার্চুয়াল বৈঠক আয়োজন করতে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও জোরদারের কথাও জানিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার।
বুধবার লন্ডনের ডাউনিং স্ট্রিটে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্টারমার জানান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার গত মাসে দেওয়া যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোকে এই বৈঠকে একত্র করবেন। ওই বিবৃতিতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছিল যখন ইরানি বাহিনী কার্যত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি বন্ধ করে দেয়।
বৈঠকে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা পুনঃস্থাপন, আটকে পড়া জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জরুরি পণ্যের পরিবহন পুনরায় চালুর জন্য সম্ভাব্য সব ধরনের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হবে বলে জানালেন স্টারমার।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বৈঠকটি সরাসরি নয়, ভার্চুয়ালভাবেই অনুষ্ঠিত হবে।
যুদ্ধ শেষে কীভাবে প্রণালিটি নিরাপদ ও চলাচলের উপযোগী করা যায়, তা খতিয়ে দেখতে সামরিক পরিকল্পনাকারীদেরও একত্র করা হবে। তারা আমাদের সক্ষমতাকে কীভাবে সমন্বিত করে এটি নিরাপদ ও ব্যবহারযোগ্য করা যায় তা বিবেচনা করবেন, যোগ করলেন স্টারমার।
যৌথ বিবৃতিতে অংশ নেওয়া দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও নেদারল্যান্ডস। বৃহস্পতিবারের বৈঠকে ইউরোপ ও উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো অংশ নেবে।
ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে গেছে, যা যুক্তরাজ্যে জ্বালানি সরবরাহ ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলছে। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এই নৌপথ বন্ধ থাকলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। যার ফলে জুলাইয়ে মূল্যসীমা পুনর্নির্ধারণের সময় যুক্তরাজ্যে গৃহস্থালি জ্বালানি বিল বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে জনগণকে আশ্বস্ত করলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। তার সরকার জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যেমন জ্বালানি বিল থেকে কিছু সবুজ কর প্রত্যাহার এবং জাতীয় ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি।
‘আমরা ব্রিটিশ জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে যাব। এই ঝড়ের মধ্যে দেশকে শান্তভাবে পথ দেখাতে যা করা প্রয়োজন তা করে যাব।’
‘এটি সহজ হবে না। পরিস্থিতি কতদিন স্থায়ী হয় এবং হরমুজ প্রণালি কত দ্রুত খুলে দেওয়া যায়, তার ওপর ভবিষ্যৎ সহায়তার পরিমাণ নির্ভর করবে,’ বলছিলেন স্টারমার।
সেপ্টেম্বরে নির্ধারিত জ্বালানি শুল্ক বাড়ানো হবে কি না, এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্টারমার জানান, আপাতত সেই সিদ্ধান্ত অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।
জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলায় সরকার আগেই উদ্যোগী ছিল বলে দাবি করেন তিনি। তবে বিরোধী দলগুলো এখনই আরও সহায়তার ঘোষণা চাচ্ছে। কনজারভেটিভ ও রিফর্ম ইউকে গৃহস্থালি জ্বালানি বিল থেকে ভ্যাট প্রত্যাহার এবং জ্বালানি শুল্ক বৃদ্ধি বাতিলের দাবি জানিয়েছে।
লিবারেল ডেমোক্র্যাটরাও শুল্ক বৃদ্ধির বিরোধিতা করছে। গ্রিন পার্টি জুলাই থেকেই জ্বালানি বিল ভর্তুকিতে কয়েক বিলিয়ন পাউন্ড বরাদ্দের আহ্বান জানিয়েছে। প্লেইড কাম্রি সম্ভাব্য সহায়তার রূপরেখা জানতে চেয়েছে, আর স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি বলছে, জ্বালানি নীতির নিয়ন্ত্রণ স্কটল্যান্ডের হাতে থাকা উচিত।
স্টারমারের ভাষ্য, ঝড় যতই তীব্র হোক না কেন, আমরা তা মোকাবিলায় প্রস্তুত এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে, যার মাধ্যমে আমরা আরও শক্তিশালী ও নিরাপদ রাষ্ট্র হিসেবে বেরিয়ে আসব। বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতা প্রমাণ করছে ইউরোপের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করা জরুরি।
তার মতে, ‘বিশ্ব যতই অস্থির হয়ে উঠছে, আমাদের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ ইউরোপের মিত্রদের সঙ্গে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ অংশীদারিত্বের দাবি জানাচ্ছে।’
আগামী গ্রীষ্মে অনুষ্ঠিতব্য যুক্তরাজ্য-ইইউ শীর্ষ সম্মেলনে তিনি অর্থনীতি ও নিরাপত্তা খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করবেন বলে জানান। ‘এই সম্মেলন গত বছরের প্রতিশ্রুতিগুলো শুধু অনুমোদন করবে না, বরং আরও উচ্চাভিলাষী হবে।’
গত বছরের মে মাসে যুক্তরাজ্য ও ইইউর মধ্যে মৎস্য, বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি খাতে একটি চুক্তি হয়। তবে নতুন বৈশ্বিক সংকট এই সম্পর্ক আরও জোরদারের প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়েছে বলে দাবি স্টারমারের।
ব্রেক্সিট ব্রিটিশ অর্থনীতির বড় ক্ষতি করেছে। নিরাপত্তা জোরদার ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর সুযোগগুলো উপেক্ষা করার মতো নয় বলেও মন্তব্য করলেন তিনি।
যুক্তরাজ্য আবার ইইউর একক বাজারে ফিরছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে স্টারমার জানান, ‘প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, জ্বালানি, নির্গমন ও অর্থনীতিতে সহযোগিতা জোরদার করা উচিত। একক বাজার নিয়ে আমরা আরও কিছু করতে পারি বলে আমি আশাবাদী, কারণ এটি আমাদের অর্থনৈতিক স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ।’
তবে তিনি স্পষ্ট করলেন, লেবার পার্টির নির্বাচনী অঙ্গীকার অপরিবর্তিত রয়েছে— একক বাজার, শুল্ক ইউনিয়ন বা অবাধ যাতায়াতে ফেরার কোনো পরিকল্পনা নেই।
এদিকে, ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কেও টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। স্টারমারের ভাষ্য, এটি আমাদের যুদ্ধ নয়। যুক্তরাজ্য সরাসরি এতে জড়াবে না। আমি কোনো পক্ষ বেছে নেব না, কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ– উভয়ের সঙ্গেই শক্তিশালী সম্পর্ক রাখা আমাদের স্বার্থ।’

